বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সব কেন্দ্র থেকে একযোগে প্রচার

আপডেট: মার্চ ৮, ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



৮ মার্চ, ১৯৭১ : এদিন থেকে বাঙালি জাতির সংগ্রামে সুনির্দিষ্টভাবে নতুন মাত্রার যোগ হল: প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে ধ্বনিত হতে লাগলো একই শব্দ, একই সুর-মহাসঙ্গীত, মহাকাব্যের অনুসরণ-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত কর্মসূচির প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থেকে বাংলার লক্ষ কোটি জনতা নবপর্যায়ের আন্দোলনের ৮ম দিন অতিবাহিত করে। ঢাকা নগরীর সর্বত্র গৃহশীর্ষে উড্ডীন ছিল কালো পতাকা। সর্বাত্মক সংগ্রামের প্রস্তুতি ছিল সমাজের সর্বস্তরে। এত ব্যাপক ও সর্বাত্মক প্রস্তুতি এই উপ-মহাদেশে এর আগে আর কখনই দেখা যায়নি।
এদিন থেকে শুরু হল সপ্তাহব্যাপি কর্মসূচি। সচিবালয়, সরকারি-আধাসরকারি অফিস, হাইকোর্ট ও বাংলাদেশের অন্যান্য আদালত বন্ধ থাকলো। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক কাতারে সামিল হল।
পৃথিবী অবাক। চেয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। বাংলাদেশের ঘটনা প্রবাহ তখনকার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। দলে দলে বিদেশি সাংবাদিকরা ঢাকায় আসতে শুরু করলো অভূতপূর্ব ঘটনাপুঞ্জিকে অবলোকন ও তার রিপোর্ট করতে। অকুতভয় বাঙালিদের সংগ্রামের রিপোর্ট, তাদের প্রাণ পুরুষ-যার কথাই ছিল অমোঘ বিধানের মত, সেই শতাব্দীর মহানায়ক বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের খবর পৃথিবীর দেশে দেশে সরবরাহ করতে শুরু করলেন।
আগের দিন বিকেলে সেনাবাহিনীর হঠকারিতায় ঢাকা বেতার বন্ধ হয়ে গেলে বিভিন্ন সেনানিবাস ও পশ্চিম পাকিস্তানে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, বাঙালিদের বিপ্লব সফল হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্য ও আমলারা বাঙালিদের হাতে জিম্মি। সারা পাকিস্তান জুড়ে শুরু হল মাতম। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ঢাকার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বেতারই ছিল পাকিস্তানের দু’খণ্ডের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন। বাঙালিদের অসহযোগিতার কারণে ঢাকা বেতারের কার্যক্রম শুরু করা কোন মতেই সম্ভব হচ্ছিল না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বেতারকর্মীদের শর্ত : ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশের সব কেন্দ্র থেকে একযোগে প্রচারের শর্ত মেনে নিলে বেতার কর্মীরা নিজ নিজ কাজে যোগ দিতে শুরু করবেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় কর্মীর অভাবে সেদিন বেতারের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এদনি অর্থাৎ ৮ মার্চ সকাল ৮-৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের সব কেন্দ্র থেকে একযোগে প্রচারিত হয়। ২৫ মার্চ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদের নির্দেশমত বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। বস্তুতঃ মার্চের গোড়াতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার সময় থেকে ২৫ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়া অবধি বাংলাদেশের সমস্ত সংবাদপত্র, বেতার ও টেলিভিশন অসহযোগ আন্দোলনের শক্তিশালী ও কার্যকর মাধ্যমরূপে কাজ করে। বেতার ও টেলিভিশনে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত প্রচার এবং টেলিভিশনে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। তারা রেডিও পাকিস্তান ঢাকা এবং পাকিস্তান টেলিভিশন ঢাকা-এর পরিবর্তে ‘ঢাকা বেতার’ ও ‘ঢাকা টেলিভিশন’ এই নামে অনুষ্ঠান প্রচার করতে থাকে। ২৫ মার্চ সামরিক অভিযান আরম্ভের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কোথাও আর পাকিস্তানের পতাকা দেখা যায়নি। প্রতিটি বাঙালি পুলিশ, ইপিআর ও সৈন্য তাদের হৃদয়ের যোগাযোগ ইতোমধ্যেই ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ হৃদয় উদ্বেলিত এই ঘোষণার সাথে যুক্ত করে ফেলেছিলেন। পাকিস্তানিরা ক্যান্টনমেন্ট আর ব্যারাকে নিজেদের মধ্যে গুজগুজ ফুঁস ফুঁস করে চলছিল। তারা ভিতরে ভিতরে একটা প্রচণ্ড আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শুধামাত্র আঘাতের নীল-নকশা সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিল না। নীল নকশাটাও হচ্ছিল রাওয়ালপিন্ডিতে।
বাঙালিদের ওপর গুলিবর্ষণ সম্পর্কে সেনা কর্তৃপক্ষের এক প্রেসনোটে বলা হল : “হাজার হাজার সৈন্যদের গুলিতে নিহত হয়েছে বলে প্রচারিত বক্তৃতা-বিবৃতি ও রিপোর্ট জঘন্য মিথ্যা। সেনাবাহিনীর গুলিতে এ কয়েকদিন মাত্র ১৭২ জন নিহত ও ৩৪৮ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম দাঙ্গাকারীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে ৭৮ জন নিহত ও ২০৫ জন আহত হয়।”
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ সেনাবাহিনীর এই প্রেসনোটকে জঘন্য মিথ্যাচার বলে বাতিল করে দেন। তিনি এক বিবৃতিতে ইতিহাস সৃষ্টিকারী বাংলাদেশের মানুষকে সালাম জানান।
এদিন বেশ কিছু ব্রিটিশ নাগরিক ও ১২৮ জন পশ্চিম জার্মান নাগরিক বিশেষ বিমানে করে ঢাকা ত্যাগ করেন। পাকিস্তানের ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রধান নূরুল আমিন ঢাকায় প্রদত্ত এক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি বাস্তব পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য ইয়াহিয়াকে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘যেন বেশি দেরি হয়ে না যায়, এর আগেই দেশকে রক্ষা করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।’
এদিন রাজশাহীতে কার্ফু জারি করা হয়।