বঙ্গবন্ধু ও কবি জসীম উদদীন : কিছু কথা

আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০২১, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী


বঙ্গবন্ধু ও কবি জসীম উদদীন দু’জনই বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার মানুষ। দু’জনেই তাঁরা ভালবেসেছেন এদেশের সাধারণ মানুষ জেলা, চাষি, মাঝিসহ সব পেশার খেটে খাওয়া মানুষদের।
মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ছিল দুর্বার ভালবাসা ছিল অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার এই মানুষ দুটির মধ্যে। ৫২’ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় শেখ মুজিব কারাবন্দি, তখন ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণ করে জসীম উদদীন লিখেন:
ঘুমাও ঘুমাও ভাইয়া মোদের
ঘুমাও মাটির ঘরে,
তোমাদের কথা লিখিয়াছি মোরা
রক্ত আখড় গড়ে।
(একুশের গান)
ষাটের দশকের শেষের দিকে রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের পদক্ষেপ পাকিস্তান সরকার গ্রহণ করেছিল তাঁর বিরুদ্ধে শেখ মুজিব প্রতিবাদ জানান। তিনি বেতার-টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি প্রদর্শন করেন। ১৯৬৭ সালের শেষ সপ্তাহে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায়, পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র বিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন শেখ মুজিব। এই ভাষণে রবীন্দ্রনাথের প্রতি যে তাঁর কতটা শ্রদ্ধা-ভালবাসা ছিল তা প্রকাশিত হয়েছে।

‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপিয়ার, এরিস্টটল, দান্তে, লেলিন, মাও সেতুং পড়ি জ্ঞান লাভের জন্য আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখিয়া যিনি বিশ্বকবি হইয়াছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানি না আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এদেশে গীত হইবেই।’ কবি জসীম উদদীনও রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারে বাঁধা দেয়ার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সমসাময়িক সময়ের সকল পত্রিকায়ই তা প্রকাশিত হয়েছিল।

জসীম উদদীন ১৯৬৬-১৯৭১ এ বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনেও পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত বীর শহিদদের নিয়ে জসীম উদদীন লিখেছিলেন:

মতিউর গেছে আসাদ গিয়াছে
জহিরুল গেছে আর,
রক্ত জবায় … সাজায়েছে তারা
চরণ যে দেশ মার।

সুগভীর ভালোবাসায় কবি জসীম উদদীন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন একজন সুদক্ষ কলম সৈনিক হিসেবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাঁর ওই চেতনার প্রতিবিম্ব দেখতে পাওয়া যায় ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’ কাব্যে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে তিনি ‘তুজম্বর আলি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে কবিতা রচনা করেছিলেন। ওই কবিতা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে প্রকাশ করেছেন কবি-কন্যা ‘হাসনা মওদুদ জসীম উদদীন।
‘কবির নিবেদন’ শীর্ষক এই কবিতাটি ‘A poet’s Appeal’ শিরোনামে সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের নানা প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতা নিষ্ঠুরতার ছবি কবির ওই কবিতায় পাওয়া যায়। কবিতাটি উদ্বৃত হলো :

Golden Bengal burns today like a flamed garland

It’s fire spread fearsome tongues all over

Soldiers of shame kill our sons

And transform golden Bengal into a graveyard

In the forest robbed men and women wall

Where will they find home and shelter

Worse than flood, worse than epedemic

Are the killers that Yeyia sends

Everyday the depict such pictures of horror

That would send Taimurlong and Nadirshah to shame.

কবি জসীম উদদীনের মনে হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু একটি মাত্র নাম নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে এদেশের আপামর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনার কথা। ঠিক এই উপলব্ধি থেকে ওই সুহৃদ নিয়ে লিখেন, ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে বৃহৎ কবিতা। কবিতায় কবি বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞা, আদর্শ ও অকুতোভয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। শত শত বছর ধরে শৃঙ্খলিত জাতির মুক্তিযুদ্ধে আহ্বান করে, যে সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, সে জন্য বঙ্গবন্ধুকে তিনি বলেছেন ‘মুকুটহীন রাজা’। জসীম উদদীন ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক কবিতার একখানে লিখেছেন:
‘মুজিবর রহমান / ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উদগারী বাণ।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে/ জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞ্ঝা-অশনি বেয়ে।
বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা-মার/হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যে অঙ্গার।’
বঙ্গবন্ধু ও কবি জসীম উদদীনকে কত ভালবাসতেন তার এক প্রমাণ পাওয়া যায়, ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমিতে স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের সময়।
ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি করার প্রস্তাব নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যান, বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক ড. মযহারুল ইসলাম, শামসুজ্জামান খান প্রমুখ। বঙ্গবন্ধু প্রথমে সম্মেলনে উপস্থিত হতে চান নি। একথা বলে যে, তিনি সাহিত্যের কি বুঝেন? একজন প্রবীণ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় কোনো সাহিত্যিক বা পন্ডিতকে দিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠান উদ্বোধন ও প্রধান অতিথি নির্বাচিত করার প্রস্তাব করেন। ড. ইসলাম অনুরোধ করে বলেন, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সম্মেলন। তিনি এই সম্মেলনের উদ্বোধন করলে তা আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করবে। তাছাড়া গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তার নিজের এবং বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন ঘটবে। তখন বঙ্গবন্ধু সম্মত হন।
এখানেই বঙ্গবন্ধুর সুহৃদ কবি জসীম উদদীনের প্রসঙ্গ আসে। বঙ্গবন্ধু ড. মযহারুল ইসলামকে বলেন, ‘ঠিক আছে, যাবো। আমার বন্ধু জসীম উদদীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকেও বিশেষ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানাবেন।’ উল্লেখ্য, ওই অনুষ্ঠানে কবি জসীম উদদীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে বিশেষ অতিথি করে সম্মানিত করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে, কবি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অত্যন্ত দুঃখ পান। কবি-পুত্র জামাল আনোয়ার তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন:
‘বঙ্গবন্ধুকে যে দিন হত্যা করা হলো, দেখি ঠিক ভেঙ্গে পড়া যাকে বলে তা-ই, কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো আব্বা। কিছুদিন পর, দেশের গণ্যমান্যদের আমন্ত্রণ জানালেন খোন্দকার মোশতাক। জানানো হলো আব্বাকেও। বললেন তিনি, ‘আমি খুনিদের সঙ্গে বসে চা খাব না।’ তিনি যান নি, সে অনুষ্ঠানে।
বঙ্গবন্ধুর প্রয়াত হবার পরের বছর ’৭৬ এর ১৪ মার্চ তারিখে কবি জসীম উদদীনও না ফেরার দেশে চলে যান।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক