বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার: ফিরে দেখা

আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০২০, ৯:০৮ অপরাহ্ণ

-ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান


১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্টের বিভীষিকাময় কালরাত বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। ওই রাতে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল শিশু, নারী, অন্তঃসত্তাসহ তাঁর নিকট আত্মীয় স্বজনদের। মায়ের চোখের সামনে নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে হত্যা, সন্তানের সামনে নিরপরাধ মাকে খুন করা, সদ্য বিবাহিত নির্দোষ দুই পুত্রবধুর প্রাণহরণ এরূপ অবিশ্বাস্য নির্বিকার হত্যালিপ্সার করুণতম ঘটনার সাক্ষী হয়ে ইতিহাসও শোকার্ত। পনেরই আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন একটি কালরাত যা আমাদের দীর্ঘদিনের বীরত্ব, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে মুছে দিয়েছে, জাতি হিসেবে আমরা ভেসে গেছি কলঙ্কের স্রোতে। পনেরই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র ছিল না, এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খুনিরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যম অর্জিত পবিত্র সংবিধানের চার মূলনীতি গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আদলে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। খুনিরা ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করেই ক্ষান্ত হন নি। এ বর্বর হত্যাকাণ্ডের যেন কোনোদিন বিচার না হতে পারে সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদেরকে বিচারের আওতামুক্ত করে। বেআইনিভাবে আইনের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে আইনের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ইনডেমনিটি নামক একটি কালা কানুনের মাধ্যমে দীর্ঘ ২১ বছর পনেরোই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশে যে কোনো নাগরিকের হত্যাই বিচারযোগ্য এবং এ বিচারের ক্ষেত্রে আইনের চোখে সকলেই সমান। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির যে, দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর স্বজনদের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আইনকে শৃঙ্খলিত করে, আইনের শাসন প্রক্রিয়া বানচাল করে, ন্যায় বিচারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে সভ্য জগত থেকে দেশকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। যেদেশে দীর্ঘ ২১ বছর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যার বিচার বন্ধ ছিল অবশ্যই ধরে নিতে হবে সেদেশে ২১ বছর আইনের শাসন ছিল না। পনেরই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে না পারায় এক বিরাট কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ’৭৫ থেকে ’৯৬ এ দীর্ঘ একুশ বছর আমরা অন্ধকারে ডুবে ছিলাম। সৌভাগ্যের বিষয় ৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে দীর্ঘদিনের নির্বাসিত বিচার ব্যবস্থাকে অবশেষে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের আদালতে ’৭৫-এর পনেরই আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার যথারীতি সম্পন্ন করে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঘোষিত বিচারের রায়ে প্রকাশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডে ১৫ জন ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে ংঁঢ়ৎবসধপু ড়ভ ষধি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির কলঙ্ক মোচন হয়েছে, বাঙালি সকল গ্লানি মুছে এক বন্য অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে শামিল হয়েছে আলোকিত অভিযাত্রায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে বিচারক শুধু ঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নি, রায়ে এমন সব সাহসী সত্য উচ্চারণ করেছেন যা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট প্রথম ফার্ডিনেন্ড বলেছিলেন- ‘খবঃ ঔঁংঃরপব নব ফড়হব, ঃযড়ঁময ঃযব ড়িৎষফ ঢ়বৎরংয’ অর্থাৎ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও বিচার হতেই হবে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা দেখলাম ’৭৫-এর পনেরই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এদেশে সরকারি ঘোষণা ছিল এসব হত্যার বিচার হবে না। পনেরই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথকে চিরতরে বন্ধ করার মানসেই ঘাতকচক্র ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে আইনের শাসনের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল। পরবর্তীতে জেনারেল জিয়ার সরকার উক্ত কালো অধ্যাদেশকে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইন হিসেবে বৈধতা প্রদান করে আমাদের সংবিধানকে ভূলুণ্ঠিত করে। এভাবেই আমাদের দেশে দীর্ঘ ২১ বছর ইনডেমনিটি নামক একটি কালো আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। ১২ই জুন ৯৬ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নিরপেক্ষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় লাভের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে সারাদেশে পনেরই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি উঠে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে শেখ হাসিনা সরকার ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন বাতিল করলে ’৭৫-এর পনেরই আগস্টের কালিমালিপ্ত হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ সুগম হয়। কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে খুনিদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণে এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অংশ নাখোশ হয়েছিল। ইনডেমনিটির মতো একটি জংলি অধ্যাদেশ বাতিল করার মধ্য দিয়ে সত্য, ন্যায় ও আইনের শাসনের পতাকাকে উর্ধে তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়।
৯৬’র শেখ হাসিনা সরকারের গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ। আমাদের এ উপমহাদেশে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হবার পর রাজনীতির নানা সমীকরণের কারণে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হবার পরও জিয়া হত্যার কোনো বিচারের উদ্যোগ নেন নি। খালেদা জিয়া ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে সেনাবাহিনী কিংবা সামাজিক কোনো গ্রুপ শক্তিকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চান নি। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার চেয়ে আইনের শাসনের বিষয়টিকে প্রাধ্যন্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন। রাজনৈতিকভাবে নানা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার যে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের ব্যাপারে অনমনীয়তা দেখাতে পেরেছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে সরকার ধীরে ধীরে যেভাবে দেশের প্রচলিত আইনে এই বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তাতে শেখ হাসিনাকে একজন দক্ষ শাসক হিসেবে সহজেই আখ্যায়িত করা যায়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি আর আইনের শাসনের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল শেখ হাসিনা সরকার খুনিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিয়ে অন্য দশটি খুনের মামলার মতোই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের নির্মম হত্যার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিচারের পথ অনুসরণ করেন। পনেরই আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার বাঙালির হৃদয়ের অন্তঃস্থলে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় জাতির ভবিষ্যত দিক নির্দেশনায় একটি ঐতিহাসিক দলিল। এ হত্যা মামলার রায়ে বিচারক শুধু প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে ঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন নি। এ নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি মামলার রায়েও কোনো কোনো অংশে সামরিক বাহিনী ও দেশের রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রের উপর আলোকপাত করে বিচারক যে সাহসী মন্তব্য করেছেন তা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। রায়ের এক অংশে (ঙনরঃবৎ উরপঃধ) মাননীয় বিচারক কাজী গোলাম রসুল তৎকালীন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নীরব ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন ১৫ আগস্টের ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিচারক রায়ে একথাও উল্লেখ করেন যে, ঘটনার পর কোনো কোনো আসামী দেশে-বিদেশে নিজেদেরকে আত্মস্বীকৃত খুনি হিসেবেও পরিচয় দিয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে। আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের গতানুগতিক বৈশিষ্ট স্মরণ করিয়ে দিয়ে রায়ের এক অংশে বিচারক বলেন যে, ‘এখানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তাহা এই যে অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পূর্বে ও পরে নেতার অনুসারীগণের ব্যবহারে অনেক পার্থক্য। ইহা কিছুটা বোধগম্য আমাদের দেশে নেতাভিত্তিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে যেমন নেতা আছেন তো সব আছে, নেতা নাই তো কেউ নাই।’ বঙ্গবন্ধু হত্যার ফলে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের যে বিরাট ক্ষতি হয়েছে সেটাও বিচারক রায়ে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন। তিনি রায়ে উল্লেখ করেন, ‘আসামীদের এই অপরাধ এমন একটি ক্ষতির কার্য যাহা শুধু ব্যক্তি বিশেষের জন্যই ক্ষতিকর নয় বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষেও ইহা একটি মারাত্মক ক্ষতি।’ রায়ে বিচারকের এসব সত্য উচ্চারণ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় নেতা-নেত্রীদেরকে ভবিষ্যতে প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে রায়ে সামরিক বাহিনী সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে তা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যার বিচার কোনো স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল নয়, ক্যামেরা ট্রায়াল নয়, দেশের প্রচলিত আইনে সাধারণ ফৌজদারি আদালতে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। দীর্ঘ সতের মাসব্যাপি পরিচালিত এ মামলায় আসামীদেরকে তাদের পছন্দের আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করা হয়েছে এবং যারা পলাতক আসামী ছিলেন তাদের জন্য রাষ্ট্র থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল। আসামী পক্ষের আইনজীবীদেরকে মামলার সাক্ষীদের জেরা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকেও মামলাটিতে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়। মামলায় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খুনিদের সাক্ষাতকার ও বিভিন্ন সাংবাদিকদের কাছে দেয়া ভিডিও টেপ সাক্ষাতকারসহ এমন গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হয় তাতে সহজেই অনুমান করা যায় যে খুনিরা ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল। ৯৬’র শেখ হাসিনা সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বিধায় রায় এর বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিলসহ অন্যান্য যে সকল আইনি সুযোগ আসামী পক্ষের পাবার কথা সে ব্যাপারেও সর্বদা সচেষ্ট ছিল ।
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের নির্মম হত্যার বিচার ও রায় এদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এক মাইল ফলকই শুধু নয়, আইনকে চ্যালেঞ্জকারী কিছু দাম্ভিক বন্যশক্তির দর্পকে চূর্ণ করার বিচার বিভাগীয় পরিক্রমাও বটে। এ বিচারের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে ইতিহাসের অমোঘ বিধান থেকে কেউ রক্ষা পেতে পারে না। বস্তুত বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে অসত্যের বিপরীতে সত্যের চিরভাস্বরতা, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর স্থায়িত্বের অমোঘতা, অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়ের অনিবার্যতা বিঘোষিত হয়েছে। ৯৬’র আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রায় ঘোষিত হলেও সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করায় সেখানে আইন অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকায় রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালে নিম্ন আদালতের রায় হলেও হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতি মামলাটি শুনানি করতে বিব্রতবোধ করার কারণে বিচার প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হয়। অবশেষে ২০০০ সালের ২৮ জুন বিচারপতি মো. রুহুল আমীন এবং এবিএম খায়রুল হকের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ দ্বিধাবিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি খায়রুল হক নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে ১৫ জনকেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে বিচারপতি মো. রুহুল আমীন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ৫ জনকে খালাস দেন। ফয়সালার জন্য বিচারপতি ফজলুল করিমের সমন্বয়ে তৃতীয় একটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। ৩০ এপ্রিল ২০০১ এই বেঞ্চ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ৩ জনকে খালাস প্রদানের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করে। পরে মহিউদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আনার পর সেও জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের বাঁচাবার পাঁয়তারা শুরু হয়, সেজন্য উচ্চ আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয় এবং বিচার কাজ বন্ধ থাকে। লিভ টু আপিল দায়েরের দীর্ঘ ছয় বছর পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামিকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। এরপর আপিল বিভাগে মামলাটি আবারও দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করলে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে মামলাটি শুনানি করার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রধান বিচারপতি মামলাটির শুনানির জন্য ৭ আগস্ট ২০০৯ বিচারপতি মো. তোফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বিচারকেদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ গঠন করে দেন। ২৯ দিনের শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর এই বেঞ্চ মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন এবং আপিল বিভাগের রায়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। অবশেষে আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দীর্ঘ ৩৪ বছরের পথপরিক্রমা। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ শে জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আটককৃত খুনি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, মুহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারি) ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার) এর ফাঁসি কার্যকর করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়। পলাতক ৭ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে অন্যতম ক্যাপ্টেন (বরখাস্তকৃত) আব্দুল মাজেদকে ১২ এপ্রিল ২০২০ দিবাগত রাতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এখনও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামরার বেশ কয়েকজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বিদেশে পলাতক থাকার কারণে তাদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে তা বলতে পারি না। সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামীদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। পালিয়ে থেকে ঘাতকরা যেন প্রাণে রক্ষা না পায় সেজন্য সম্ভাব্য আশ্রয় গ্রহণকারী দেশগুলোর সাথে প্রয়োজনে ঊীঃৎধফরঃরড়হ ঞৎবধঃুসহ ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।
আমাদের অগ্রযাত্রার পথে, আমাদের স্বদেশ ভূমির উন্নয়ন অভিযাত্রায়, আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে থাকবে। জাতির পিতার হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে আমরা গ্লানিমুক্ত হয়েছি, বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পেয়েছি, আইনের অনুশাসনের শ্বাশ্বত চেতনায় বলীয়ান হয়ে জাতি হিসেবে আলোকিত সভ্যতার অভিযাত্রায় শামিল হয়েছি। আমাদের বিশ্বাস জাতির পিতার হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খুনিদেরও বিচারের রায় বাংলার মাটিতে একদিন কার্যকর হবেই। আর এ রায় যেদিন পুরোপুরি কার্যকর হবে বাংলার মানুষ সেদিন সত্যিকার অর্থে পুরোপুরি জাতির পিতার হত্যার দায় থেকে মুক্তি পাবে।
লেখক পরিচিতি: প্রফেসর, আইন বিভাগ ও পরিচালক, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।
যঢ়ৎড়ফযধহ@ুধযড়ড়.পড়স