বঙ্গবন্ধু হত্যা ও কিছু কথা

আপডেট: আগস্ট ২৬, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মীর্জা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাবরনামায় লিখে গেছেন বাংলাদেশের একটু অদ্ভুত রীতি হচ্ছে এই যে, এখানে উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসন দাবি করার সুযোগ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের মানুষ এই সিংহাসনকে শ্রদ্ধা করে চলে। তারা রাজাকে হত্যা করে। আবার যে কোনো ব্যক্তিই ওই সিংহাসনে বসুক না কেন তাকেই রাজা বলে স্বীকার করে নেয়। আনুগত্য দেয়, শ্রদ্ধা দেয় যেমন নিহত রাজাকে দিত। বাংলার লোক বলে আমরা সিংহাসন মান্য করি। যিনি এখানে বসবেন তিনিই আমাদের আনুগত্য পাবেন। প্রায় ৫শ’ বছর আগে বাংলা সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন। জানিনা ওই সময়ে বাংলায় এমন ধরনের ঘটনা ঘটেছিল কিনা। কিন্তু বর্তমান কালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ঘটনাগুলোর সাথে বাবরের ৫শ’ বছরের আগের মন্তব্যের মিল পাওয়া যায়।
প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকান্ড একটা পরিণতি পেয়ে থাকে। সেটা তাৎক্ষণিকভাবেও হতে পারে আবার দীর্ঘ সময় পরেও হতে পারে। তবে পরিণতি একটা হয়ই। সেই পরিণতি ইতিবাচক হতে পারে আবার নেতিবাচকও হতে পারে। আমাদের দেশের জাতীয় রাজনীতিতে এমন অসংখ্য ঘটনায় ভরা। নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে তার সঠিক চিত্র পাওয়া যায়। ঘটনার সাথে জড়িত কুশিলবদের শ্রেণি চরিত্র এবং তৎকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল বিচার করলে সত্যটা খুঁজে পেতে কষ্ট হবেনা। প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। বিজ্ঞানী নিউটনের এই তৃতীয় সূত্রটি যেমন বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
এ সব কথা অবতারণা করার কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও টকশোতে রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন বক্তব্য। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য। বঙ্গবন্ধুর ৪৬ তম শাহাদাত বার্ষিকী ও শোক দিবস উপলক্ষে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সামনে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার যে ব্যর্থতা এটার কারণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অনুসারীদের জানতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। কোনোকিছুতেই তাদের অন্ধকারে রাখা যাবেনা। আওয়ামিলীগ কেন প্রতিরোধ গড়তে পারলো না তার দায় আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। এর কারণ খুঁজতে হবে। এই চরম ব্যর্থতার কথা ও তার কারণ বের করার কথা ইতোপুর্বে কেউই তেমন করে কোনাদিন বলেননি। এ ঘটনায় অনেকের প্রচন্ড দীর্ঘশ্বাস আছে। যে মানুষটি নিজের জীবন বিপন্ন করে একটি জাতিকে স্বাধীন করার জন্য জীবনভর আন্দোলন করলেন, জেল খাটলেন, জাতিকে বিজাতীয় শোষণ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পথ দেখালেন, যার নেতৃত্ব ও নির্দেশ ছিল গোটা জাতির কাছে শিরোধার্য্য, আত্মবলিদানে অকুন্ঠ সেই মানুষটিকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর কেউ প্রতিবাদ করলোনা, কেউ কাঁদলোনা, কেউ প্রতিরোধ গড়ে তুললো না। এ এক অস্বাভাবিক বেঈমানী ও নেমকহারামের মত আচরণ ও পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হলো। এ যেন রবার্ট ব্রাউনিং এর লেখা প্যাট্রিয়ট কবিতার অবিকল প্রতিচ্ছবি। ১৯৬৪ সালে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে ওই কবিতাটি আমাদের পড়তে হয়েছিল। কবিতাটির প্রথম তিন স্তবকে বর্ণিত হয়েছে একজন দেশ প্রেমিক ব্যক্তির অনুভূতি ও অর্জনের বর্ণনা। যে ভাবে তার জীবনকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। আর পরবর্তী তিন স্তবকে বর্ণিত হয়েছে তার দুর্ভার্গ্যজনক সাজা ও মৃত্যুর বর্ণনা। কবিতায় দেশ প্রেমিক জাতীয় বীরদের প্রতি সাধারণ জনগণের পরিবর্তনশীলতা ফুটে উঠেছে। সাধারণ জনগণ যেমন দেশপ্রেমিকদের সর্বোচ্চ শিখরে স্থান দিতে পারে তেমনি মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে। যে দেশপ্রেমিককে মাত্র একবছর পূর্বে রঙ্গিন ফুলের মালা দিয়ে তার আগমনকে বরণ করা হয়েছিল, যাকে একনজর দেখার জন্য ছাদে উঠেছিল, বাঁশী বাজিয়ে যার আগমন ঘোষণা করা হয়েছিল, যখন মানুষের মধ্যে কি উন্মাদনা ছিল, তখন তার জন্য যে কোনো কিছু করার জন্য প্রস্তুত ছিল। আর একবছর পরে দেশের অবস্থা পরবর্তিত হওয়ার ফলে সেই দেশপ্রেমিকের পেছনে হাত বেঁধে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হচ্ছে। কেউ আজ তাকে স্বাগত জানাতে আসছে না বরং পাথর ছুঁড়ে রক্তাক্ত করছে । একবছর আগে যে ছিল নায়ক, একবছর পরে সে অপরাধীতে পরিণত হলোÑ তেমনটাই হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে। তবে সেটা একবছর পরে নয়। সাড়ে তিন বছর পরে। যেন বাবরনামার সেই বাঙালি চরিত্রের প্রকাশ।
অনেকেই বলেন, সেসময় পরস্থিতি এমনই ছিল যে, কেউ প্রতিবাদের জন্য রাস্তায় বের হতে পারেনি। এটা একটা অজুহাত মাত্র। কারণ পাকিস্তান সরকার বাঙালির স্বাধীনতাকে প্রতিহত করার জন্য হাজারো রকমের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, ভয়ঙ্কর সেনাবাহিনী নামিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি জাতি জীবনবাজি রেখে সকল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিল। বিজয় অর্জন করেছিল। তারও আগে এই শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে হরতাল, মিটিং, মিছিল করেছে, অসহযোগ আন্দোলন করেছে, ১৪৪ধারা, কারফিউ উপেক্ষা করেছে, বীরদর্পে জয়বাংলা শ্লোগান দিয়েছে, অকাতরে বহু বাঙালি জীবন দিয়েছে। অথচ মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে সেই সংগ্রামের ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো এবং সেটাও অবিসংবাদিত ও ঈর্ষনীয় জনপ্রিয় একজন নিবিদিত দেশপ্রেমিককে হত্যার পরেও। এ এক অবিশ্বাস্য ও অবাক করা কাহিনী। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে এই দেশপ্রেমিকের মৃত্যুর সাথে সাথে তার রক্তের উপর দিয়ে তারই দলের মানুষদের সরকার গঠন করা এবং সকল এমপি মন্ত্রিদের ওই সরকারে যোগ দেওয়া। সাধারণ মানুষ ভাবলো বোধহয় নেতৃত্ব বদল হলো। কিন্তু এটা ছিল একটি ঘৃণ্য বেঈমানি ও মোনাফেকির কাহিনী। তাই সেদিন জনপ্রতিরোধ হয়নি। যারা প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে জনগণকে নেতৃত্ব দেবে তারাতো বেঈমান মোস্তাকের সরকারে যোগ দিয়েছে। আর প্রাণপ্রিয় নেতার মৃত্যুতে কেউ কাঁদেনি একথা ঠিক নয়। বহু মানুষ কেঁদেছে হত্যাকারীদের অভিশাপ দিয়েছে। কিন্তু তাদের কান্নার ও অভিশাপের প্রতিবাদী বহিঃপ্রকাশ হয়নি নেতৃত্বের অভাবে। সেদিন ক্ষমতালোভী এমপি-মন্ত্রীরা লোভ পরিত্যাগ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে এগিয়ে আসেনি। সেদিন বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধানকে তার বিপদের কথা জানিয়েছিলেন কিন্তু তার আহবানে সাড়া দেয়নি। তিনি তার বিকল্প নেতৃত্ব সৃষ্টি করে যেতে পারেননি অথবা বিকল্প নেতৃত্ব থাকলেও ক্ষমতার মোহে রক্তাক্ত পথে কেউ যায়নি। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর তার দলের লোকজন যে তার ছিলনা তা তিনি বহুবার তার বিভিন্ন ভাষণে প্রকাশ করে গেছেন। তার একমাত্র ভরসা ছিল সাধারণ জনগন। সেদিন তিনি যদি সুযোগ পেতেন এবং পল্টন ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণকে একবার ডাক দিতে পারতেন তাহলে জনগণ ঝাঁকে ঝাঁকে জীবন দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ছিনিয়ে আনতো। অন্য কোনো নেতার প্রয়োজন হতোনা। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি।
বাবরনামার বাঙালি চরিত্র, রাজনৈতিক কর্মকা্ন্ডে পরিণতি, নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ফল এবং প্যাট্রিয়ট কবিতার দেশপ্রেমিক নেতার করুণ পরিণতি এই ৪টি কারণের সাথে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যা এবং প্রেক্ষিতে প্রতিরোধ গড়ে না ওঠার যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এই নির্মম ঘটনা এবং পাশাপাশি বিশ্বাসঘাতকতার প্রকৃত বিবরণ সংশ্লিষ্ট অনেকেই জানেন। কিন্তু সত্যটা প্রকাশ করেন না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ঘটনাকে ব্যবহার করেন। সব রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রেই ওই ৪টি কারণইই জড়িয়ে থাকে। কিন্তু জনগণ অন্ধকারেই থেকে যায়। সেটা আর অন্ধকারে রাখা যাবেনা। ওবায়দুল কাদের তা বলেছেন।
লেখক : সাংবাদিক