বদলগাছীতে ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা

আপডেট: আগস্ট ২২, ২০১৭, ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

বদলগাছী প্রতিনিধি


নওগাঁর বদলগাছীতে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জানা যায়, উপজেলার সদর ইউপির সাতগাছী গ্রামের গভীর নলকুপের বৈদ্যুতিক ট্র্যান্সফরমার গত শনিবার রাতে কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যায়। এর পরের দিন গত রোববার দুপুরে উপজেলার কোলা ইউপির গয়রা গ্রামের মৃত আবদুুর রাজ্জাকের ছেলে হেলাল হোসেন (৩৫) সাইকেলযোগে ওই সাতগাছী গ্রামে গিয়ে একটি খড়ের পালায় তার একটি ব্যাগ রয়েছে বলে সে খোঁজাখুজি করছিল।
এদিকে গত রোববার সকালে ওই খড়ের পালার মালিক সঞ্জিত খড়ের পালাটি ভেঙে খলিয়ানে রৌদ্রে মেলে দিতে গিয়ে একটি ব্যাগ পায়। ব্যাগটির ভিতরে ছিল ট্রান্সফরমারের কয়েলের প্রায় ২০ কেজির মত তামার তার, তার কাটার ব্লেড, ট্রান্সফরমার খোলার অন্যান্য যন্ত্রপাতি। কিন্তু হেলাল ওই খড়ের পালার মালিক সঞ্জিতের বাড়ির লোকজনকে ব্যাগের কথা জিজ্ঞাসা করলে তারা কোন ব্যাগ পায় নি বলে জানায়। যেহেতু ব্যাগের খোঁজ করছিল এতে সঞ্জিত সন্দেহ করেন এই লোকটি ট্রান্সফরমার চুরি করেছে। এই খবরটি ভাতশাইল গ্রামের সাবেক মেম্বার ও ওই গভীর নলকুপের অপারেটর গোলাম মর্তুজা রেজা চৌধুরীকে মোবাইল ফোনে জানান তিনি। ব্যাগ খুঁজে না পেয়ে হেলাল ভাতশাইল গ্রামের উপর দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। এ সময় রেজা মেম্বার পথিমধ্যে হেলালকে আটক করে তার মটর সাইকেলে তুলে নিয়ে ঘটনাস্থল সাতগাছী গ্রামে যায়। হেলালকে দেখে সাতগাছি গ্রামের লোকজন জানায় এই লোকটি ২দিন থেকে সাতগাছি গভীর নলকুপের আশে-পাশে ঘুরাঘুরি করছিল এবং সে এসে ব্যাগ খোঁজাখুজি করছিল। এ সময় উত্তেজিত জনতা হেলালকে চোর সন্দেহে চড়থাপ্পর দিয়ে বিকেল ৩ টায় চার্জার ভ্যান করে বদলগাছী সদর ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসে। সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের হল রুমে হেলালকে আটকে রেখে মারপিট করলে  সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় রাত ৮ টায় হেলালকে বদলগাছী স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী সদর ইউনিয়ন ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি রাসেল হোসেন জানান, হেলালকে হাত পা বেঁধে পরিষদের হলরুমে ইউপি চেয়ারম্যান আবদুুস সালামের উপস্থিতিতে ও তার আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সদস্য সানাউল হোসেন হিরো, ইউপি সদস্য পিন্টুসহ কিছু লোকজন লাঠি দিয়ে এলোপাথারি মারপিট করে। এসময় হেলাল গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়লে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়ার ১৫ মিনিট পর  সে মারা যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আরএমও ডা. রুহুল আমিন জানান, রাত ৮ টায় ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশসহ কিছু লোকজন হেলালকে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা চলাকালে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে হেলালের মৃত্যু হয়। তিনি আরও জানান ভর্তির সময় হেলাল অনেকটা স্বাভাবিক ছিল।  তার শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা হচ্ছিল। এ অবস্থায় ইসিজি পরীক্ষা চলাকালে তার মৃত্যু হয়।  এ বিষয়ে সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুুস সালাম মন্ডলের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাতগাছি ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগে  হেলালকে গণপিটুনি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসে স্থানীয়রা। আমি তার শারীরিক পরিস্থিতি দেখে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলি। ইউনিয়ন পরিষদে তাকে কোন মারপিট করা হয় নি।
এ বিষয়ে বদলগাছী থানার অফিসার ইনর্চাজ (ওসি) জালাল উদ্দীন জানান, হাসপাতালে হেলালের মৃত্যুর পর তিনি খবর পেয়েছেন। এর আগে হেলালকে ইউনিয়ন পরিষদে আটক রেখে তাকে মারপিট করা হচ্ছে বিষয়টি তিনি জানতেন না। তবে হেলালের পরিবারের লোকজন থানায় এসেছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি আরও জানান ব্যাগটি উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাগটির ভিতরে ছিল ট্রান্সফরমারের কয়েলের প্রায় ২০ কেজির মত তামার তার, তার কাটার ব্লেড, ট্রান্সফরমার খোলার অন্যান্য যন্ত্রপাতি। তিনি আরো জানান, হেলাল গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর থানার ডাকাতি মামলার ওয়ারেন্টভূক্ত আসামি। এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহাদেবপুর-বদলগাছী সার্কেল আবু সালেহ  মো. আশরাফুল আলমের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি আরো জানান, এ ঘটনায়  ইউপি চেয়রম্যান ও সাবেক মেম্বার গোলাম মর্তুজা রেজা চৌধুরীসহ ৩ জনের লিখিত জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। তবে মামলা রেকর্ডের পর অধিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে। এদিকে নিহত হেলালের ভাই বেলাল হোসেন বাদি হয়ে সদর ইউপি চেয়ারম্যার আবদুুস সালাম, সানাউল হক হিরো, গোলাম মর্তুজা রেজা চৌধুরীসহ আরো ১০-১২ জনকে আসামি করে বদলগাছী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগে আরও একটি পাল্টা মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে বলে থানা সূত্রে জানা যায়।