বদলে যাবে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দর একনেকে ১০৭ কোটি টাকার আধুনিকায়ন প্রকল্প অনুমোদন

আপডেট: October 21, 2020, 12:21 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:


দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে আলোর মুখ দেখছে রাজশাহীর শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্প। রাজশাহী এর রানওয়ে সারফেসে অ্যাসফল্ট কংক্রিট ওভারলেকরণ প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ এই রুটের যাত্রীদের জন্য অত্যাধুনিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও কার্গো বিমান ওঠানামার ব্যবস্থা থাকছে এই আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায়।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এক হাজার ৬৬৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন এক হাজার ৫২৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৪৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এই সভায় শাহ মখদুম বিমানবন্দরের জন্য ১০৭ কোটি টাকার প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়। এই ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে আধুনিক রূপ পাবে শাহ মখদুম বিমানবন্দর। প্রকল্পটি ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন করবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোকে রাতে ফ্লাইট ওঠা-নামার উপযোগী করার জন্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ নির্দেশ দেন তিনি। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা।
একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সামনে সার্বিক তথ্য তুলে ধরেন পরিকল্পনা বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী উল্লিখিত নির্দেশ দেন বলে জানিয়েন আসাদুল ইসলাম। সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মহিবুল হক জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর রানওয়ে ও লাইটিং সিস্টেম উন্নত করা হবে।
সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম জানান, একনেক সভায় যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী বিমানবন্দরের রানওয়ের উন্নয়নে ৫৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৯ হাজার টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মানুষের আর্থিক অবস্থা দিন দিন ভালো হচ্ছে। দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চলও হচ্ছে। এসব কারণে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট বাড়ছে। তাই বিমানবন্দরগুলোর উন্নয়ন করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, যেন রাতেও বিমান ওঠা-নামা করতে পারে।
তিনি জানান, সড়ক উন্নয়ন ব্যয় পর্যবেক্ষণ করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলেছেন।
রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে একটির বেশি উড়োজাহাজ রানওয়েতে নামতে বা উঠতে পারে না। তবে বিমানবন্দর আধুনিয়াকায়ন প্রকল্প শেষে হলে একইসঙ্গে তিনটি উড়োজাহাজ দাঁড়াতে পারবে। কারণ কার্গো বিমান ওঠানামাসহ একসঙ্গে তিনটি উড়োজাহাজ পার্কিং করার ব্যবস্থা রেখেই এবার আধুনিকায়ন করা হবে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের।
এর আওতায় বর্তমানে শাহ মখদুম বিমানবন্দরে থাকা ৬ হাজার ৬০০ ফুট দৈর্ঘ্যের রানওয়ে বাড়িয়ে ১০ হাজার ফুট করা হবে। এর প্রস্থ তখন ১০০ ফুট থেকে বেড়ে হবে ১৫০ ফুট। আর এখনকার ২৬০-২৫০ ফুটের অ্যাপ্রন হবে ২৭৫-২৫০ ফুট। নির্মিতব্য আধুনিক টার্মিনাল ভবনটির নিচতলার আয়তন হবে ১৭ হাজার বর্গফুট।
দ্বিতীয় তলাটি হবে ১১ হাজার বর্গফুটের। টাওয়ার ও অন্যান্য স্থাপনা মিলিয়ে টার্মিনাল ভবনটিতে জায়গা থাকবে ৩১ হাজার বর্গফুট। সুপরিসর টার্মিনাল ভবনে চেকইন কাউন্টারের সংখ্যা এখনকার তুলনায় বেড়ে দ্বিগুণ হবে। সঙ্গে থাকবে বিশালাকৃতির কনকার্স হল, ডিপারচার লাউঞ্জ, অ্যারাইভাল লাউঞ্জ, স্ন্যাকস কর্নার ও একটি ভিআইপি লাউঞ্জ। মন্ত্রণালয়ের গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই বছর মেয়াদি এই আধুনিকায়ন প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুন নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ২৭০ মিলিমিটার পুরুত্বে অ্যাসফল্ট কংক্রিট ওভার-লেককরণ করা হবে। বিমানবন্দরগুলোর এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল) সিস্টেমের আপগ্রেডেশন, রানওয়ে সাইড-স্ট্রিপসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিমানবন্দরের জন্য পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি আধুনিক অগ্নিনির্বাপক গাড়ি কেনা হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নানা কারণে প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। শাহ মখদুম বিমানবন্দর অধিক পুরাতন। ফলে রানওয়ের বিটুমিনাস কারপেটিংয়ের আয়ু শেষ হয়ে গেছে। রানওয়ে সারফেস থেকে নুড়ি পাথর ওঠে আসাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিমানবন্দরগুলো অধিক সংখ্যক প্লেনের রিপিটেড লোড বহন উপযোগী হয়ে নির্মিত নয়। এসব বিবেচনায় প্রকল্পটি নির্বাচন করা হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সমানতালে বেড়ে চলেছে যাত্রী সংখ্যা। এসব বিবেচনায় যাত্রীবাহী প্লেনের সংখ্যা আরও বাড়বে। এসব বিবেচনায় নির্মাণের পর থেকে সুদীর্ঘ তিন দশকে রানওয়ের উপরিভাগের বিটুমিনাস কারপেটিংয়ের আয়ু শেষ হয়ে গেছে। এ কারণেই প্রকল্পটি হাতে নেয়া হচ্ছে।
রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ৬০০ ফুট, প্রস্থ ১২০ ফুট। বর্তমানে এ বিমানবন্দরে দিনে চারটি প্লেন চলাচল করলেও ঝুঁকি রয়েছে। মেরামতের মাধ্যমে রানওয়েকে সচল রাখা হয়। এসব কারণেই প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে।
ঢাকার একটি অনলাইন পোর্টালকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মুহিবুল হক জানান, রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের আধীনে বড় উড়োজাহাজ ওঠানামার জন্য বর্তমান রানওয়ে আরও সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে যেন তিনটি উড়োজাহাজ পার্ক করার যায় সে অনুযায়ী অ্যাপ্রনের আয়তন বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে নতুন একটি অত্যাধুনিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে। আর এর সাথে যাত্রীদের জন্য বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধা রাখার বিষয়টিও তাদের বিশেষ বিবেচনায় রয়েছে। এটি যুক্ত হয়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ১০৭ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। কাজটি শেষ হলে শাহ মখদুম বিমানবন্দর নতুন রূপ পাবে বলেও উল্লেখ করেন বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব।
এর আগে, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিন রাজশাহী বিমানবন্দর পরিদর্শনও করেছিলেন। এসময় প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী দেশের অন্যতম এই বিমানবন্দরটিকে শিগগিরই ঢেলে সাজানোর মধ্যে দিয়ে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন সংস্কার কাজ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন।
এদিকে, রাজশাহী-ঢাকা রুটে প্রতিনিয়ত যাত্রী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থাও তাদের ফ্লাইট সংখ্যাও বাড়াচ্ছে। ৩৬ বছর আগে নির্মিত এই বিমানবন্দরে বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান ও বেসরকারি দুইটি সংস্থা মিলিয়ে প্রতিদিন ছয়টি ফ্লাইট যাত্রী পরিবহন করছে। অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হওয়ায় শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে বর্তমানে রাজশাহী-ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে দেশের তিনটি এয়ারলাইন্স। প্রতিটি এয়ারলাইন্সের দুইটি করে মোট ৬টি ফ্লাইট প্রতিদিন চলাচল করছে। ফলে এই রুটে সপ্তাহে মোট ৪২টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। অথচ যাত্রী অভাবে ২০০৭ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে অভ্যন্তরীণ এই রুটে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। আট বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালে আবারও রাজশাহী-রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়।
রাজশাহীর নওহাটায় ১৬২ একর জমির ওপর ১৯৮৪ সালে শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই বিমানবন্দরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬৪ ফুট (২০ মিটার) ওপরে অবস্থিত। এর মাত্র একটি রানওয়ে আছে। যার দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ৬০০ ফুট। আর প্রস্থে ৯৮ ফুট। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত বিমানবন্দরটি ছিল লাভজনক অবস্থানে। একপর্যায়ে মাত্র দুইজন যাত্রী নিয়েও প্লেন উড়েছে এই বিমানবন্দর থেকে। এই রুগ্নদশা চলতে চলতে ২০০৭ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে অভ্যন্তরীণ এই রুটে প্লেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছিলো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।