বধ্যভূমি সংরক্ষণের দ্বিতীয় পর্যায় || গণহত্যা সম্পর্কে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জানতে পারবে

আপডেট: মার্চ ১২, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

সরকার ১৯৭১ সালের আরো ২৭৯টি বধ্যভূমি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বধ্যভূমি সংরক্ষণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম হবে এটি। প্রথম পর্যায়ের অপর ৩৪টি বধ্যভূমি বর্তমানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের ২৭৯টি বধ্যভূমির মধ্যে একটি হলোÑপাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এক বর্বর হামলায় খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে অন্তত ১০ হাজার লোক হত্যা করেছে। ১৯৭১ সালের ২০ মে কয়েক ঘণ্টায় ওই লোককে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা নির্যাতন থেকে বাঁচতে নিরাপদে ভারতে যাওয়ার লক্ষ্যে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লোকেরা এই বাজারে অবস্থান করছিল। এররকম ছোটবড় বধ্যভূমি বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটেয়ে আছে। অনেক বধ্যভূমি হয়তো এখনো অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে। অনুসন্ধান কার্যক্রম থাকলে এগুলো আবিষ্কার করাও সম্ভব হবে।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বধ্যভূমি সংরক্ষণে সরকার ৩৫০ কোটি টাকার ওই প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। ২০১৮ সালের জুন নাগাদ প্রকল্প কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি এখন পরিকল্পনা কমিশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সরকার এর আগে ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের স্মৃতি ধরে রাখতে দেশব্যাপী বধ্যভূমি সংরক্ষণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
এমনিতেই বিলম্ব হয়ে গেছে তদুপরি বর্তমান সরকার যে বধ্যভূমিগুলি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে এ জন্য তারা প্রশংসার দাবি রাখে। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক টানাপোড়নের মধ্যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই হারাতে বসেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পরিকল্পিত উপায়ে বিকৃত করে দেশ পেছনের দিকে অর্থাৎ পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু জাতি সেই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বাঁক পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় প্রত্যাবর্তন করেছে। এখনই সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চর্চা এবং ইতিহাস- ঐতিহ্যের সবকিছুকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া। বর্তমান সরকার সেই কাজটিই নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছে।
বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করতে হবে এই কারণে যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানাতে হবে যে, তাদের পূর্বসূরিদের স্বাধীনতার জন্য কী বিশাল আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে নিঃশ্বেষ করতে কী ভয়ঙ্কর আক্রোশে গণহত্যা সংঘটিত করেছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে, সম্পদ লুটপাট ও বসতভিটায় অগ্নিসংযোগ করেছে। মানুষকে জোর করে ধর্মান্তরিত করেছে। তাদের নৃশংসতা থেকে নারী ও শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। এতো ত্যাগ, এতো রক্ত স্বাধীনতার জন্য পৃথিবীর আর কোনো জাতিকে দিতে হয়নি।
বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের যৌক্তিকতা খোদ পাকিস্তানই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে একটি মীমাংসিত ৩০ লক্ষ শহিদ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা একাত্তরে বাঙালিদের ওপর যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তা শুধু অস্বীকারই করছে না, বিশ্ববাসীকেও বিভ্রান্ত করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আর এসব করছে তারা যুদ্ধাপরাধের দায় এড়াতে। শুধু পাকিস্তানিরাই নয়Ñ বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এ ষড়যন্ত্র বিদ্যমান আছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও একই ধরনের প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি। মুক্তিযুদ্ধের শক্তির বিরুদ্ধে এখনো ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বাংলাদেশের এ ব্যাপারে নিরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। প্রামাণিক দলিলসহ একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের বিষয়টি বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে হবে। ইতোমধ্যেই একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যার শুরুর দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ