‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারজান ও সাদ্দাম নিহত || নেপথ্যের অনুঘটকদের বিচার হোক

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

গুলশান হামলার ‘অন্যতম হোতা’ নব্য জেএমবির নেতা নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান এবং উত্তরবঙ্গে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকা-ের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি সাদ্দাম হোসেন ঢাকার মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য মতে, বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ওই ঘটনা ঘটে। দুই জঙ্গির নিহত হওয়ার খবর দেশের প্রায় সব সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। নিহত দুই জঙ্গি দেশে বেশ কয়েকটি ভয়ঙ্কর ও নৃশংস হত্যাকা-ের নেতৃত্ব দিয়েছে। এসব হত্যাকা-ের ঘটনা শুধু জাতীয়ভাবে নয়- বিশ্ব জুড়েই বাংলাদেশ সম্পর্কে উদ্বেগ- উৎকণ্ঠার জন্ম দেয়। দেশের অথর্খনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যা এখনো বিদ্যমান।
নিহতদের একজন মারজান, যাকে গুলশান হামলার পর থেকে পুলিশ খুঁজছিল। আর সাদ্দাম হোসেন ওরফে রাহুল ছিলেন উত্তরাঞ্চলে জেএমবির অন্যতম সংগঠক। রংপুরে কুনিও হোশিসহ পাঁচটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি তিনি। গতবছর জুলাই মাসে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২২ জনকে হত্যার ঘটনার পর তদন্তের মধ্যে মারজানের নাম আসে। পুলিশ মারজানকে ওই হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
মারজান খুবই সাধারণ পরিবারের সন্তান। পাবনার হেমায়েতপুরের আফুরিয়া গ্রামের হোসিয়ারি শ্রমিক নিজাম উদ্দিনের ছেলে সে। মা- বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে। সন্তান জঙ্গি-সন্ত্রাসী হয়ে সেই স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে। তাদের বুকে এখন চাপা কান্না আর সন্তানের প্রতি ক্ষুব্ধতা, ঘৃণা। এই ঘৃণার কি কোনো যথার্থতা আছে? অবশ্যই আছে। সন্তান যদি মনুষ্য জন্মকে অস্বীকার করে পাশবিক চরিত্র লাভ করে- সে তো পিতৃ¯েœহ, মাতৃমমতা পাওয়ার যোগ্য নয়। মারজানের মা সালমা খাতুন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্তানের মৃত্যুকে তার কৃতকর্মের শাস্তি বলে মনে করছেন। সন্তানের প্রতি কতটুকু ক্ষোভের সঞ্চার হলে মা এ কথা বলেন! তবে সালমা খাতুন মারজানকে যারা জঙ্গি বানিয়েছে, তাদের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি ছেলের বউ আর তাদের সন্তানকে ফেরত দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। বাবারও সেই একই আকুতি ‘‘সে জঙ্গি দলে নাম লিখিয়েছে। আমার সব স্বপ্ন এক মুহূর্তে ভেঙে দেয়ার আগে একবারও সে পরিবারের কথা ভাবল না।” মারজানের লাশ নেয়ার ইচ্ছার কথা বললেও ঢাকায় গিয়ে নিয়ে আসার সামর্থ্য নেই বলে জানান তিনি।
মারজানের মায়ের যে দাবি সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্য পালনীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। মারজানদের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে যারা তাদের জঙ্গি-সন্ত্রাসী বানাচ্ছে Ñ সেই নেপথ্যের শক্তিধরদের বিচার হতে হবে। অন্ধকারের এই অনুঘটকরাই মারজানের বাবা-মার মত অনেক পরিবারের পাঁজর ভেঙ্গে দিচ্ছে, স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ করে দিচ্ছে। সেই সাথে দেশকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল করছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত করছে এবং বিশ্বে দেশ ও জাতির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। এরা দেশের শত্রু, মানবতার শত্রু। ধর্মের নামে এরা মানবিক বিপর্যয় ঘটাতে চায়, ধর্মকে অবমানানা করতে চায়।
শুধু আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়েই জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা যাবে না। এর সামজিক একটি দায় রাষ্ট্র ও সমাজের রয়েছে তা অবশ্যই পালন করতে হবে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের পেছনে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে তা নিরসনেও রাষ্ট্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মারজানদের মত তরুণদের যাতে জঙ্গি হতে না হয়Ñ সেই লক্ষ্য অর্জনই জঙ্গি-সন্ত্রাবাদ নির্মূলের স্থায়ী সমাধান হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ