বন্যার্তদের সাহায্যে যতœবান হোন

আপডেট: জুলাই ২০, ২০১৭, ১২:৪৯ অপরাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওরের দেশ বাংলাদেশ। সমতলভূমির দেশ হলেও (প্রধানত) এখানে যেমন পাহাড়ি এলাকা আছে, তেমনি আছে নীচু জলাভূমিও। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের নিত্যসঙ্গী। বর্ষাকাল এদেশে প্রায় প্রতি বছর বয়ে আনে দুর্বিসহ কষ্ট। নদীগুলোর ড্রেজিং এর ব্যবস্থা না থাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরাবস্থা, মানুষের অসচেতনতা সর্বোপরি স্বার্থান্বেষী বিশেষ মহলের চক্রান্ত ও লোভের ফলে বর্ষা মৌসুমে মানুষ সীমাহীন কষ্টের শিকার হয়।
এবছরও এদেশের মানুষ রেহাই পায়নি প্রকৃতির রোষানল থেকে। এদেশের উত্তর, মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের মানুষ এখন বন্যায় আক্রান্ত। সিলেটের হাওরাঞ্চলে বন্যা শুরু হয় প্রথমে। নষ্ট হয়ে গেছে মাঠের ফসল। পরিস্থিতির উন্নতি হয় নি। দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। বন্যায় ভেসে গেছে মানুষের বসতবাড়ি, নষ্ট হয়ে গেছে ক্ষেতের ফসল। গবাদি পশুর খাবার নেই, মানুষের আশ্রয় নেই, নেই অন্নের সংস্থান, নেই অসুখে ওষুধ বা পথ্যের ব্যবস্থা, নেই পানীয় জলের ব্যবস্থা। বিঘিœত হচ্ছে ছেলে- মেয়েদের লেখাপড়া। কোথাও কোথাও স্কুল ঘরগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে ত্রাণকেন্দ্র হিসেবে। আবার কোথাওবা পায়ের নীচে জল নিয়েও চলছে শিক্ষা কার্যক্রম- অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা, যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা।
বন্যার কারণে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষেরা খাদ্য, ওষুধ, পানীয় জলের অভাবে হাহাকার করছে। সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয় সাহায্যের ব্যবস্থা করলেও সে সাহায্য উপযুক্ত ক্ষেত্রে পৌঁছায় কিনা এ বিষয়ে সরকারের কোনো মনিটরিং নেই। ফলে এক শ্রেণির সুবিধাভোগী লোক দুর্গত মানুষদের নাম মাত্র ত্রাণ দিয়ে বাকিটা আত্মস্যাৎ করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। এরা সুবিধাবাদী- এদের কোনো দল মত নেই, নেই মানবতা। অসহায মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে তাদের আখের গোছানোটাই প্রধান উদ্দেশ্য। দেশে যে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অনেক সময় সরকারের একক প্রচেষ্টায় সেটা সামাল দেয়া সম্ভব হয় না। আধা-সরকারি, বেসরকারি, বিদেশি এবং ব্যক্তিগতভাবে যে বিপুল ত্রাণ সামগ্রী আসে তার সুষম বণ্টন না হাওয়ার ফলে মানুষের দুর্ভোগ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। লোক দেখানো কিছু ছবি পত্র-পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হলেও (ত্রাণ বিতরণের) বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। হয়তো কোথাও দুর্গত মানুষদের একাংশকে ত্রাণ দিয়ে আর তাদের খবর থাকে না।
শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ শিবির কম। যারা ত্রাণ শিবিরে যেতে পারে না তারা কোনো সাহায্য পায় না এবং তাদের সাহায্য দেবার কোন ব্যবস্থাও করা হয় না। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত খাবার মজুদ আছে। কিন্তু খাবার যতই মজুদ থাক না কেন সেগুলো যদি যথাসময়ে দুর্গত মানুষদের পৌঁছে দেয়া না যায় তাহলে সেটা অর্থহীন।
এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ত্রাণ দেবার নাম করে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে। এটা অত্যন্ত লজ্জার। কারণ আর্ত-মানবতার সেবা করা মানুষের কাজ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার জনগণকে রক্ষা করা দলমত, জাতি-ধর্মানির্বিশেষে। যারা ভোটের রাজনীতি করছেন প্রকারান্তরে তারা সরকারকে অ-জনপ্রিয় করে তুলছে। এটাও সরকারের জানা থাকা দরকার।
বন্যাদুর্গত অনাহার, অর্ধাহারে থাকা, রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে বেঁচে থাকা মানুষের মুখের গ্রাস যারা কেড়ে খাচ্ছে সরকারের তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। দুর্গত এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টার বা যন্ত্রচালিত ট্রলার বা নৌকার সাহায্যে ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা উচিৎ। মানুষকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে যারা রাতারাতি প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে এবং মোড়লিপনা করছে তাদের বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট সতর্ক হওয়া উচিৎ। শুধু দুর্গত মানুষই নয় সরকার গৃহীত নানা কল্যাণমূলক কাজ যেমন উপবৃত্তি, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা সহ সব ক্ষেত্রেই এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত সরকারের মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সুতরাং, বন্যার্তদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিন, স্বার্থের হাত নয়। এ দুর্বৃত্তদের অসৎ তৎপরতার কারণেও অনেকে ত্রাণ দিতে চান না। তাদের বিশ্বাস তার এ সাহায্য দুর্গতদের কল্যাণে না লেগে দুর্বৃত্তদের টাকার অংক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেবে। সুতরাং, তারা কুণ্ঠিত হয়।
দীর্ঘদিন থেকে চালু হয়ে আসা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অবিবেচক কাজের ফলেও এদেশের বন্যা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটে সে বিষয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান হওয়াটা জরুরি। ওদের দেশে বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও ওরা ওদের গেটগুলো খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে আরো বিপদের ভেতরে ফেলে-এ পরিস্থিতি বন্ধ হওয়া উচিৎ।
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহায্য করা যে কোনো মানুষের কর্তব্য। সেক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দুর্গতদের সাহায্যে না লেগে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করবে এটা কখনো কোনো বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। হয়তো যা রটে তা অপ-প্রচার কিন্তু পুরোটাই অপ-প্রচার এটাও সত্যি নয়। আর যদি অপ-প্রচারই হবে তা হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাদের সততা দিয়ে প্রমাণ করুক এগুলো মিথ্যা- দায়টি পুরোপুরি তাদের।
এদেশের বিবেকবান সাধারণ মানুষের চাওয়া দুর্গত মানুষদের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ এবং একইসাথে সকল আক্রান্ত মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিয়ে তাদের কষ্টের বোঝা সামান্যতম হলেও লাঘব করা। সরকারের আরো বেশি সজাগ ও সতর্ক হস্তক্ষেপ সকলের একান্ত কাম্য।