বন্যা দুর্গত মানুষের জীবনের না বলা কথা

আপডেট: আগস্ট ৩০, ২০১৭, ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

মো. অব্দুল কুদ্দুস


সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। এখন ধীরে ধীরে সেই অবস্থার উন্নতি হচ্ছে সত্যি। তবে এসব দুর্গত এলাকার ফসলি জমিতে যেখানে ‘সোনালী ধান’ ছিলো তা পচে এখন সেই জমিতে যেন দগদগে ঘা বের হচ্ছে। এই ঘা যেন প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কলিজায়ও। আমরা অবগত হয়েছি দুর্গত মানুষের সেই আর্তনাদ ও কান্নার দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় খবরে দেখেও বিত্তবান অনেকেই উফ…উফ সারাক্ষণ বিরক্তিকর খবর, এসব খবর আর ভালো লাগে না! এরকম নানা ধরনের অপরিপক্ব মন্তব্য করে চ্যালেন পরিবর্তন করে বিনোদনের চ্যানেলে নজর ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ দুর্গত ওইসব মানুষের দুঃখ-কষ্ট কেমন? কীভাবেই বা তারা জীবন কাটচ্ছে? তা একটু বুঝানোর চেষ্টা করছি।
২৫ আগস্ট শুক্রবার সকালবেলা। রাজশাহী শহর থেকে প্রিয় জন্মভূমির মাটি বাগমারার বানভাসী মানুষের কষ্টের চিত্র দেখবার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সঙ্গে আছে প্রাণের সংগঠন ‘বাগামারা ছাত্রবন্ধন’র একদল স্বেচ্ছাসেবক। রয়েছে ত্রাণভর্তি একটি পিকআপ ভ্যান। আরো আছেন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কয়েকজন সাংবাদিক। সাংবাদিকদের সাথে নেয়ার উদ্দেশ্য হলো দুর্গত এলাকার জনসাধারণের কষ্ট বিবেকবান অন্য সব মানুষের কাছে তুলে ধরা। রাজশাহী শহর থেকে বের হয়ে যেই নওহাটা পার হলাম রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু একটি রং ‘সাদা’ চোখে পড়ছে। সর্বনাশা বন্যার পানিতে অন্য সব রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। যে মাঠ সবুজ শ্যামল-সোনালী সবজি খেত ও ধান খেতে পূর্ণ থাকবার কথা সেখানে আজ শুধু পানি আর পানি। বিশাল বিলের দুইপাশের টলমলে পানিতে রাজশাহী-নঁওগা মহাসড়ক যেন টুমটুম করে ভাসছে। গাড়ির চাপে কোথাও কোথাও রাস্তা নরম হয়ে স্পঞ্জের মতো দুমদুম করছে।
তবে কিছু এলাকায় এর একটু ব্যতিক্রম দেখা গেল। তা হলো, কিছু এলাকা আছে যাদের বিল ঝিলের একপাশে প্লাবিত হয়েছে। সেই এলাকার পানি অন্যপাশে ঢুকে যাতে ফসলের ক্ষতি না করতে পারে সেজন্য ব্রিজ বা কালভার্টে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে ফসলের কিছু ক্ষতির হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। প্রতিটি বাঁধে একজন করে প্রহরী রাখা হয়েছে যাতে দুর্বৃত্তরা বাঁধ কেটে ফসল নষ্ট করতে না পারে।
আমাদের গাড়ি সামনের দিকে চলছে। মোহনপুর উপজেলা পার হয়ে বাগমারায় প্রবেশ করতেই দেখা গেল গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কয়দিন আগেই সকাল বেলায় যে জমিতে সোনালী ধানের খেলা দেখে কৃষক হাসি মুখে বাড়ি ফিরতো সেখানে এখন শুধু পানি আর পানি। ফসলি এসব জমিতে এলাকার যুবক, বৃদ্ধ অনেকেই একবুক পানিতে নেমে মাছ ধরছেন। আরো সামনে অগ্রসর হলাম। পর্যবেক্ষণ করলাম এই কষ্টের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে পাবার স্বপ্ন দেখছে এসব এলাকার বানভাসী মানুষ। দূর থেকে মাইকে আওয়াজ আসছে ‘সুখবর! সুখবর! সুখবর! আসন্ন ঈদ-উল-আজহা উলক্ষ্যে আগামী… তারিখে বিশাল গুরু ছাগলের হাট।’ কোথাও কোথাও রাস্তার দুইপাশ থেকে ভেসে আসছে মেটালের টনটন শব্দ। চোখ মেলতেই দেখা গেল, কামার পাড়ায় কোরবানির পশু কাটার অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত কামার সম্প্রদায়। এসব দেখে আমাদের মন ভরে গেল। বুঝলাম বাঙালি অদম্য সাহসী ও বার বার দুঃখ দুর্দশাকে জয় করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চারি জাতি। ধীরে ধীরে আমরা প্রবেশ করলাম নরদাশ ইউনিয়নের হাট মাদনগর গ্রামে। সেই গ্রামের আশেপাশের বিলে থৈ থৈ পানি। শাতাধিক বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। রাস্তা ঘাটও পানির নিচে। ব্রিজ কালভার্ট ভেঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। শুষ্ক মৌসুমে যে রস্তায় সহজেই মানুষ চলাচল করতো সেখানে এখন বাঁশের তৈরি সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে।
আমারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছার অনেক পূর্ব হতেই সেখানে দুর্গত মানুষ ভিড় করছিলো। সেখানে পৌঁছামাত্রই তাদের অনেকেই আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলো। আমরা ভীষণ আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম। চাল, ডাল, লবণ, মুড়ি ইত্যাদি পেয়ে দুর্গত মানুষ আমাদের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে প্রাণ ভরে দোয়া করে দিলেন। ‘আল্লাহ যেন তোমাদের আরো বেশি বেশি করে ধন সম্পদ দেয় এমন সুরে তাঁরা আমাদের জন্য দোয়া করে দিলেন। তবে তাঁদের অনেকেই স্থানীয় প্রভাবশলাীদের সম্পর্কে অভিযোগ করলেন যে, এলাকায় সরকারি বেসরকারি ত্রাণ আসলে তাঁরাই সামনে থাকে। ক্ষমতা খাটিয়ে তাঁরা একই বাড়ির তিন থেকে পাঁচজন সদস্যদের নাম লিখে দিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী আদায় করে। অন্যদিকে বড়লোকদেরও অনেক অভিযোগ আছে। তাঁরা বলেছেন, ক্ষতির হিসেবে আমাদের বেশি ধান, কয়েকটি পুকুরের মাছ, খেত-খামার সব ডুবে গেছে। নষ্ট হয়েছে মুরগির খামার। টাকার অঙ্কে এসব ক্ষতির পরিমাণ দরিদ্রদের থেকে অনেক বেশি। তাঁদের অভিযোগ অনেকের শুধু বাড়িঘর ডুবে গেছে। কিন্তু অন্য কোন ক্ষতি হয় নি। সরকারি বরাদ্দ শুধু নাকি ঘরহীনদের জন্য। আমারা কিছুই পাচ্ছি না ইত্যাদি। এতো দুঃখ দুর্দশা থাকলেও মানুষ থেমে নেই। অভিযোগ থাকলেও তাদের কর্মচঞ্চলতার পথরুদ্ধ হয় নি। ওরা সবাই আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায়। সুদৃঢ় করতে চায় বাংলাদেশের অর্থনীতি। তাদের সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটুক এবারের সরকারের নেয়া কৃষিবান্ধব পরিকল্পপনায় এই প্রত্যাশা রইলো।
লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী
ংযুধসড়ষঁরঃং@মসধরষ.পড়স