বন উজাড় করে চাষাবাদ || গোদাগাড়ী সামাজিক বনায়ন প্রকল্প

আপডেট: জানুয়ারি ৩, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও গোদাগাড়ী প্রতিনিধি



রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের বন উজাড় করে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর বনের উপকারভোগীরা রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
রোববার সকালে সরেজমিনে গোদাগাড়ীর ফরাদপুর এলাকায় পদ্মার চরের বনটিতে গিয়ে উপকারভোগীদের এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। উপকারভোগীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল বনের গাছ কেটে ফেলে ও বনে অগ্নিসংযোগ করে ফাঁকা জমি দখল করছেন। এরপর তারা সেখানে বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করছেন। এদের সঙ্গে উপকারভোগীদেরও কয়েকজন জড়িত আছেন।
‘সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন’ প্রকল্পের আওতায় বিভাগীয় সামাজিক বনবিভাগ ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪০ হেক্টর জমিতে এক কোটি পাঁচ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ব্যয়ে বনটি গড়ে তোলে। এলাকার ২৪৯ জন ব্যক্তিকে উপকারভোগী করে সেখানে রোপণ করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির এক লাখ ৩২ হাজার গাছ। গাছগুলো এখন বেশ বড় হয়েছে। এ অবস্থায় সেখানে নজর পড়েছে দুর্বৃত্তদের।
উপকারভোগীদের অভিযোগ, গেল গ্রীষ্মকালে ফরাদপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন কেটু, আজাহার আলী ও আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বনের পশ্চিম, পূর্ব-পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর কোণে অগ্নিসংযোগ করেন। তাদের সঙ্গে আছেন উপকারভোগী আল্লাম হোসেন, জাহির হোসেন, সারোয়ার হোসেন নিপু।
বর্ষা মৌসুমে বনে পানি প্রবেশ করলে উপকারভোগীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা নৌকায় করেও গাছ কেটে নিয়ে যান। এতে বনের ৩০০ বিঘা জমি ফাঁকা হয়ে যায়। বন্যার পানি নেমে গেলে এর মধ্যে তারা প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে কলাই, ৭৫ বিঘা জমিতে খেসারি ও ২৫ বিঘা জমিতে মসুর ডালের চাষাবাদ করেছেন। কিছু জমির ফসল এরই মধ্যে কাটতে শুরু করেছেন তারা।
সরেজমিনে গেলে বনের পাহারাদার আবদুল হাকিম ও উপকারভোগী রমজান আলী, জবিয়ার রহমান এবং সাবিয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে জানান, ১০০ বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ফসল হবে। এই টাকার অংশের ভাগ পেতে স্থানীয় বন কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অভিযোগ করতে গেলে উল্টো তাদেরকেই হুমকি দেয়া হচ্ছে।
বন সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, গোদাগাড়ী থানায় অভিযোগ করা হলে বিষয়টি দেখভালের জন্য প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পার্থ প্রতীমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি কোনো ব্যবস্থা তো নিচ্ছেনই তা বরং বন উজাড়কারীদের সঙ্গেই তার দহরম মহরম দেখা যাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, উপকারভোগী না এমন লোকজন বনের জমি দখল করে চাষাবাদ করায় বিষয়টি উপজেলা বন কর্মকর্তা ময়েন উদ্দিনকেও জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনিও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এ ব্যাপারে চুপ থাকার জন্যই তিনি উপকারভোগীদের নির্দেশ দিচ্ছেন। ফলে যে উদ্দেশ্যে নিয়ে সরকার এই বন করেছে তা ভেস্তে যাচ্ছে।
দখলকারীদের নেতা ফরাদপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন কেটুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সঠিক না। আমি বনে চাষাবাদের ব্যাপারে কিছু ব্যক্তিকে সহযোগিতা করি। এছাড়া অন্য কিছু না। তবে গাছ কেটে ফসল চাষ করে তিনি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন কী না- এ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেন নি।
প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পার্থ প্রতীম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছি। এ বিষয়ে আমাকে ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কোন নির্দেশনা দেয়া হয় নি। নির্দেশনা পেলে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে দখলদারদের সঙ্গে আমার ‘সম্পর্ক’ রয়েছে বলে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা সঠিক না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বন কর্মকর্তা ময়েন উদ্দিন দাবি করেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। উপকারভোগী নয়, এমন ব্যক্তিদের জমি দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামিতে বন সম্প্রসারণ করা হবে। সেখানেও নতুন কিছু উপকারভোগীর সৃষ্টি হবে। ওই তালিকায় তাদের নাম আসতে পারে। এ জন্য তারা জমি দখল করে চাষাবাদ করছেন। তবে তারা বনে অগ্নিসংযোগ করেছেন বা গাছ কেটেছেন কী না তা আমার জানা নেই।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ