বরেন্দ্রর প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পাখি

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

তানজিমুল হক



ভোরে সূর্য উঁকি মারার সঙ্গে সঙ্গে পাখি নীড় থেকে বেরিয়ে কিচির-মিচির শুরু করতো। বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ সকাল হলেই পাখির ডাকে ঘুম থেকে উঠতেন। কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের বিখ্যাত কবিতা ‘পাখি-সব করে রব, রাতি পোহাইল, কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল, রাখাল গরুর পাল, ল’য়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।’ কিন্তু এখন আর রাত পোহালে পাখির কণ্ঠ শোনা যায় না। বরেন্দ্রের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পরিচিত পাখি। পাখি বিশারদদের অভিমত, বন উজাড়, বাড়ির আশেপাশে পুরোনো গাছ কেটে ফেলার কারণে আশ্রয় হারাচ্ছে পাখি। এছাড়া খেতে উচ্চমাত্রার কীটনাশকের ব্যবহার এবং শিকারিদের কারণে পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে যাচ্ছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু বরেন্দ্র অঞ্চল নয়, সারাদেশে গত ১৫ বছরে অন্য প্রাণির তুলনায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির হার সবচেয়ে বেশি। দেশের ৫৬৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে গত কয়েক দশকে ১৯টি প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়েছে। দেশি পাখির ওপর ২০১৪-১৫ সালে হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে গত বছরের ২২ জুন তালিকা প্রকাশ করেছে পরিবেশ ও বনবিভাগ। সেই জরিপে উঠে এসেছে এমন চিত্র। তালিকার বাইরে বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাস করা পরিচিত, অপরিচিত অনেক পাখিই বিলুপ্ত হয়েছে। আবার অনেক পাখি বিলুপ্তি হওয়ার পথে।
বন বিভাগের হালনাগাদ ওই তালিকায় বাংলাদেশে এক হাজার ৬১৯ প্রজাতির বণ্যপ্রাণির কোনটি কী অবস্থা সে বিষয়ক লাল তালিকা (রেড লিস্ট) তৈরি করা হয়েছে। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে বন বিভাগ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)।
এতে প্রকাশ পায় যে, দেশে ৩৯০টি বণ্যপ্রাণি কোনো না কোনোভাবে বিপন্ন। এর মধ্যে গত ১৫ বছরে পাখি প্রজাতি বেশি বিলুপ্ত হয়েছে। দেশের ৫৬৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে গত কয়েক দশকে ১৯টি প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত পাখির মধ্যে রয়েছে- লালমুখ দাগিডানা, সারল, ধূসর মেটে তিতির, বাংলার বিখ্যাত বালি হাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিল বা মদনটাক, ধলাপেট বগ, সাদাফোটা গগন রেড, রাজ শকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লালমাথা টিয়াঠুঁটি, গাছ আঁচড়া, সবুজ ময়ুর। এই পাখিগুলো মূলত বাঁশঝাড়, বন জঙ্গল বা নদীর ধারে ঘুরে বেড়াতো। এছাড়া মাত্র দেড় যুগ আগেও বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ-ঘাটে, বাড়ির পাশের গাছ-পালা, ঝোপ-ঝাড়ে টিয়া, ফিঙ্গে, বুলবুলি, শালিক, টুনটুনি, কেঁচকেচি, পেঁচা, আবলকিসহ অনেক পাখির দেখা মিলতো। কিন্তু এ পাখিগুলোও এখন আর খুব বেশি চোখে পড়ে না।
রাজশাহী বিভাগীয় বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা আমজাদ আলী জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে পুরাতন গাছ কমে যাবার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিলুপ্তি ঘটছে। আমরা এ অঞ্চলে নতুনভাবে গাছ লাগাচ্ছি। এ গাছগুলোর বয়স বাড়লে পাখির আবাসন সমস্যার সমাধান হবে। আমরা আশা করছি, বরেন্দ্র অঞ্চলে আবারো পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠ হাড়–পুর এলাকা থেকে একটি মদনটাক উদ্ধার করা হয়েছে। এ পাখিটি এ অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে। আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পাখিটির সেবাযতœ করছি। এভাবে অন্য কোন বিলুপ্ত পাখি উদ্ধার হলেও আমরা সেটিকে বাঁচিয়ে রেখে অভয়ারণ্যে ছেড়ে দিচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য, বিলুপ্তপ্রায় পাখিগুলো যেন প্রকৃতি থেকে হারিয়ে না যায়।
বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে পাখি কমে যাবার কারণ সম্পর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক আরিফুর রহমান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ফসল খেতে অতিমাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে পাখির খাবার ছোট মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ মরে যাচ্ছে। একারণে স্বাভাবিকভাবেই পাখির খাবারের স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। ফলে পাখি খাবার না পেয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে থাকছে না। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার কীটনাশক খেতে ব্যবহারের ফলে পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর বিষাক্ত পানি খেয়ে পাখি মারা যাচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, যেকোনো প্রাণীর অস্তিত্ব নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর। এর একটি হলো, নিরাপত্তা এবং অপরটি খাদ্যের নিশ্চয়তা। পাখির বেঁচে থাকা বা অস্তিত্বের জন্যও এ দুটি বিষয় মুখ্য। পাখির অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়েছে প্রাকৃতিক কারণে নয়। এর জন্য বেশি দায়ী মানুষের সচেতনতার অভাব। এমনকী মানুষ নিষ্ঠুরভাবে নির্বিচারে এদের নিধন করে চলেছে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন শুধুমাত্র শালিক এবং কাকের আধিক্য দেখা যায়। অন্য পাখিগুলোর অসিস্ত¡ সঙ্কটের মুখে। অন্য পাখি কমে যাবার কারণ হচ্ছে খাদ্য সঙ্কট। অতীতে পাকড় বা বটগাছসহ অন্য গাছ থেকে পাখি খাবার সংগ্রহ করতে পারলেও এখন পুরাতন গাছের সংখ্যা কম হবার কারণে তা পারছে না। ফলে খাদ্য সঙ্কটের কারণেও বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে পাখির সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ