বরেন্দ্র অঞ্চলে আম বিপ্লব ও পরবর্তী করণীয়

আপডেট: নভেম্বর ২১, ২০২২, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকূ:


বহুদিন পরে এক আত্মীয়ের বাড়ি যেতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে পার্বতিপুর আড্ডা ও পোরশা হয়ে সাপাহার যাচ্ছিলাম বাসে। পার্বতীপুর আড্ডা থেকে সাপাহার পর্যন্ত প্রায় ৩০ কি.মি. দীর্ঘ পথের দুপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ঘন আমের বাগান দেখলাম। এরমধ্যে সবই বামন আকৃতির হাইব্রিড জাত আম্রপালি ৯০ ভাগ ও বাকি ১০ ভাগ বারি-৪ জাতের আমগাছ। দেখলাম ছোট ও ঘন আমগাছের সাথে কিছু আগাছা ও ঘাষ পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠেছে। আমবাগানের এই জংলা অবস্থা দেখে মনে হলো প্রাকৃতিকভাবেই আমবাগান গড়ে উঠেছে। কেউ রোপন করেনি। তখন মে মাস। আগাছা পরিষ্কার না করার কারণে এমনটা দেখা গেলেও বোঝা গেল সবুজের সমারোহ। কোথাও কোনো ফাঁক নেই। এ এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য।

মাত্র ত্রিশ বছর আগেও এই বরিন্দে সবুজ দর্শন ছিল একটা অসম্ভব ব্যাপার। শুধু মাত্র বর্ষা মৌসুমের ৩ মাস দেখা যেতো মাঠ ভরা রোপা আমন ধানের সবুজ দৃশ্য। তখন বরিন্দে ওই একটি মাত্র ফসল হতো এবং বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল। আর বাকি ৯ মাস দেখা যেতো কাটা ধানের কাঁটা কাঁটা শুকনো থোড় আর গাছপালাহীন ঠা ঠা বরিন্দের খোলা প্রান্তর। সুপেয় পানির ছিল প্রচ- অভাব। তাই বলা হতো “বরিন্দ” যেখানে পানি ভাগ্যের ব্যাপার। পানির অভাব পূরণ করতে তৎকালীন হিন্দু জমিদারেরা বরিন্দ অঞ্চলে প্রচুর পুকুর খনন করেছিলেন। সেই পানি ছিল বরিন্দবাসীর রান্না, খাওয়্,া গোসলসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের একমাত্র অবলম্বন। ২/৪ গ্রাম জুড়ে হয়তো একটা নলকূপ পাওয়া যেতো। যাতে সবসময় পানি পাওয়া যেতনা। কারণ বরিন্দের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ১০০ থেকে ২০০ ফুট নিচে এবং মাঝে ছিল পাথরের স্তর। ফলে সুপেয় পানি উত্তোলন ছিল অসম্ভব ব্যাপার। এজন্য বরিন্দে জনবসতি ছিল বেশ কম।
বরিন্দের এই ভূপ্রকৃতি গবেষণা করে দেশি বিদেশি বিশেষজনরা ১৯৮০ সালে মতামত দিয়েছিলেন এ অঞ্চলে পানির কারণেই ফলবান বৃক্ষ জন্মাবে না, ভূগর্ভস্থ পাথরের কারণে পানি উত্তোলন করা যাবে না এবং অতিদ্রুত বরেন্দ্রভূমি মরুভূমিতে পরিণত হবে ও ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বড় বড় গবেষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্বিক গবেষকদের এই মতামত দেশব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে। বরেন্দ্রবাসীদের মনে আতঙ্ক দেখা যায়। সে সময় এ খবর দেশের বভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফলাও করে প্রচার হয়। অন্যদিকে বিএডিসির কিছু তরুণ প্রকৌশলী এই মতামতকে উপেক্ষা করে নিরবে কাজ করতে থাকেন। তাদের দৃঢ় ধারণা ছিল যেহেতু ভূগর্ভের নিচে পানির স্তর আছে সেহেতু প্রয়োজনবোধে পাথর কেটে হলেও পানি উত্তোলন করা যাবে। পরিক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে ১৯৮৫ সালে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। মাটির নিচ থেকে ফল্গুধারা বেরিয়ে এলো বরিন্দের আশীর্বাদ হয়ে। এই বিশাল সফলতার পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান, রঞ্জন মিত্র প্রমুখ। আর এই বরেন্দ্র প্রকল্পকে অনুমোদন দিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মহাম্মদ এরশাদ। এই সফলতা বরেন্দ্র অঞ্চলে নিয়ে এলো আমূল পরিবর্তন। গভীর নলকূপ বসানোর পাশাপাশি শুরু হলো বনজ গাছের বনায়ন। এখনো পোরশা ও সাপাহার উপজেলায় খাস জমিগুলোতে ইউক্যালিপটাস গাছের প্রচুর বন রয়েছে। মাত্র ১০ বছরে এ অঞ্চলে যেমন দুই ফসলের আবাদ নিশ্চিত হলো তেমনি বনায়নের ফলে সবুজ শ্যামল হয়ে উঠলো। বিশেষজ্ঞদের মরুকরণ প্রক্রিয়ার তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হলো। দুটি ফসল আবাদ করার ফলে বিশেষত ধান উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেলো বটে, কিন্তু সেচ, সার, কীটনাশক এর উচ্চমূল্য এবং অন্যদিকে ধানের ন্যায্যূুল্য না পাওয়ায় এলাকার মধ্যবিত্ত কৃষকরা বছরের পর বছর ধরে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেনি। এ সময় অনেক সৌখিন কৃষক বরিন্দের মাটিতে পরীক্ষামূলকভাবে আমবাগান তৈরিতে উৎসাহী হয়ে উঠে। একই সাথে আম গবেষণা কেন্দ্রে হাইব্রিড জাতীয় আম জাতের উদ্ভাবন ও প্রসার ঘটলো। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ আমচাষে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এরই ধারাবাহিকতায় মাত্র ৭/৮ বছরে আমচাষে বড় ধরনের উলম্ফন ঘটলো। বিশেষত পোরশা ও সাপাহার উপজেলায়। এ দুটি উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর কৃষি জমির মধ্যে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ইতোমধ্যে আমবাগান তৈরি হয়ে গেছে বরেন্দ্র অঞ্চলের আমবাগানগুলো ছোট হোক বড় হোক অর্থাৎ ২০০ বিঘার হলেও তা বাঁশের তৈরি বেড়া দিয়ে অথবা মোটা তারের নেট দিয়ে অথবা মাছ ধরা জাল দিয়ে ঘেরা। কোথাও সীমানাঘেরাহীন আমবাগান নেই। নওগাঁর বাকি ৯ টি উপজেলায় আমচাষ অতটা উল্লেখযোগ্য নয়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এই অঞ্চলে হাইব্রিড জাতের স্বল্পায়ু আমগাছের চাষ হয়েছে শতবর্ষী আমগাছের চাষ হচ্ছে না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শতবর্ষী আমের আদি ও মূল জাতগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই এর চাষ অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় সে জাতগুলো হারিয়ে গেলে তা আর পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী হাইব্রিড জাত আমগাছ থেকে হেক্টর প্রতি ১৪ মে.টন আম উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ এ দুটি উপজেলায় প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মে.টন আম উৎপাদিত হচ্ছে। এ থেকে বলা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে আমচাষে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। এখানকার আমচাষীরা বলেন, ধানের জমিতে যে শ্রম দিতে হয় তা আমবাগানে দিতে হয়না। তাছাড়া আম গাছে একবার ফল দিতে শুরু করলে পরিশ্রম কমে যায়। অন্যদিকে আম বিক্রি করে ধানের চেয়ে বেশি লাভ হয়।

বরেন্দ্র এলাকায় আমচাষের ফলে এখানকার আর্থসামাজিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। তবে বিপরীতে ধানে উদ্বৃত্ত বরিন্দ খাদ্য সংকটের শিকার হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এ দুটি উপজেলা ধান উৎপাদনে ঘাটতি বিরাজ করছে। অন্যদিকে হাইব্রিড জাতীয় আমগাছ সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত ফল দিবে। তারপর কমে যাবে। তখন নতুন করে আমগাছ লাগাতে হবে। তারপরেও আমবাগান করার যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে তাতে ধানি জমি আরও কমবে, আমের জমি বাড়বে এবং আম উৎপাদন বাড়বে প্রায় দিগুণ। অর্থাৎ আগামী ৪/৫ বছরে এ দুটি উপজেলায় আমের উৎপাদন ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। এ অবস্থা কমবেশি আম উৎপাদনকারী সকল জেলার। ফলে দেশব্যাপি আম উৎপাদনে একটা বড় লাফ দিবে এবং ৩০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। যা দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করার পরেও উদ্বৃত্ত হবে। আর এ আম যদি রপ্তানি করা সম্ভব না হয় তাহলে কম দামেও সে আম কেউ কিনবে না। এই আশংকার কারণ হচ্ছে আম উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরায় আমের উন্নয়ন ও বিশেষত আম রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য নয়। ফলে আমচাষীরা মারাত্বক আর্থিক ক্ষতির সন্মুখিন হবে ও হতাশায় নিমজ্জিত হবে। আমচাষে আসবে অনীহা।

যার প্রচন্ড ধাক্কা লাগবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এজন্য পূর্বাহ্নেই আম রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য অতিদ্রুত ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে। বিদেশে বাংলাদেশের সুমিষ্ট আমের প্রচুর চাহিদা আছে। কিছু কিছু রপ্তানি হচ্ছে সেটা ব্যক্তি পর্যায়ে। কিন্তু তা বিশ্ব বাজারের উপযোগী করে উৎপাদন ও রপ্তানিবান্ধব সৃষ্টি করার সময় এখনই। আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর আমচাষীরা সেই দিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।
লেখক : সাংবাদিক