বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রি-পেইড মিটারে সেচ কার্য || বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় বিপাকে কৃষকরা

আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০২০, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব


বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রি-পেইড মিটারে গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ কার্য চললেও নেসকোর বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, দাম বেশি পড়ায় চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একে তো ফসলের দাম কম তারপর বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ায় লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। আবার পানি সেচের জন্য গভীর নলকূপের সিরিয়াল পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিএমডিএ সূত্রে জানা যায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বরেন্দ্র অঞ্চলের ৭১৪ টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ২৩৫ টি গভীর নলকূপ নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানী লিমিটেড (নেসকো) থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে চলে। বাকি গভীর নলকূপগুলো পল্লী বিদ্যুত থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে চলে। এক একটা গভীর নলকূপের অধীনে ৩০ হেক্টর জমি রয়েছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) জানায়, পানি সেচের জন্য নেসকো ইউনিট প্রতি ৪ টাকা করে নেয়। পল্লী বিদ্যুৎও ইউনিট প্রতি চার টাকা নিলেও তারা সেচ কার্যের জন্য কৃষকদের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ ছাড় দেয়। ফলে বিদ্যুতের দাম দেখা যায়, ইউনিট প্রতি চার টাকার অনেক কম পড়ে।
তবে নেসকো থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে সেচ কার্য পরিচালনার জন্য কৃষকদের চাষাবাদ অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন কৃষকরা। কৃষকরা বলেন, এখন সেচ কার্য পরিচালনার জন্য প্রি-পেইড কার্ড ব্যবহার করতে হয়। প্রি-পেইড কার্ডে যতক্ষণ টাকা থাকে ঠিক ততক্ষণই কার্ড ব্যবহার করা যায়। আর কার্ডের মাধ্যমে গভীর নলকূপ থেকে পানি সেচকার্যের জন্য সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে ঘণ্টা প্রতি ১১০ থেকে ১২০ টাকা খরচ হয়। ফলে সেচ কার্যের জন্য অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। আবার গভীর নলকূপ থেকে পানি নেয়ার ক্ষেত্রে সিরিয়াল পাওয়াটা অনেক কঠিন হয়।
গোদাগাড়ীর বাসুদেবপুর গ্রামের কৃষক শাহাদত হোসেন বলেন, আমার দশ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করি। কিন্তু পানির সিরিয়াল পেতে খুব কঠিন হয়। আবার ঘণ্টাপ্রতি ১২০ টাকা করে দেয়ার কারণে পানি সেচের জন্য অনেক টাকা লেগে যায়। অথচ সরকার বিদ্যুতের দাম কমিয়ে কৃষকদের স্বল্পমূল্যে জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে পারে। আবার সেচের সিরিয়াল পাওয়ার জন্য লাইন দিতে হয়। একটা গভীর নলকূপের অধীনে শত শত কৃষক। সেইসব সিরিয়াল মেইনটেইন করে লাইন পেতে অনেক সময় লেগে যায়।
দিগরাম গ্রামের কৃষক নাইমুল হক জানান, তিনি চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। কিন্তু পানি, সার, কীটনাশক ও বীজ কিনে আবাদ করার পর কৃষককের আর কিছু থাকে না। আর ধানের দাম যে পরিমাণ কম তাতে কৃষকের আরো দুরাবস্থার মধ্যে পড়ে।
গোদাগাড়ীর বালিয়াঘাটা গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি ২৫/৩০ বিঘা জমি চাষাবাদ করেন। জমি সেচের জন্য ঘণ্টায় ১২০ টাকা করে দিতে হয় বিএমডিএকে। ফলে জমিতে সেচের জন্য অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। একবছর জমিতে বোরো আবাদের জন্য সেচ পেলে তার পরের বছর আর জমিতে বোরো আবাদ করার জন্য জমিতে সেচ পাওয়া যায় না।
বিএমডিএ’র গোদাগাড়ী জোনের সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ জিল্লুল বারী জানান, প্রি-পেইড মিটার কার্ডের কারণে পানির অপচয়রোধ করা গেছে। যেহেতু এখন টাকা প্রদান করার পর পানি পাওয়া যায় তাই কৃষকরা অপচয়ও করেন না। তবে সিরিয়াল পেতে একটু সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ আগে ১০০ জন কৃষকের একশোটা শ্যালো মেশিন থেকে পানি পেত আর এখন একটা মেশিন থেকে ১০০ জন কৃষক পানি নিচ্ছেন।
শুধু যে কৃষকরা তাদের সেচ কার্যের জন্য পানি পান গভীর নলকূপ থেকে তা না, খাওয়ার পানিও নেন গ্রামবাসীরা। বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন নলকূপ নেই বললেই চলে। কারণ পানি থেকে ১২০ ফুট গভীর নলকূপ বসাতে হয়। এইজন্য সরকারিভাবে গভীর নলকূপ থেকেই বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সরবরাহ করা হয়। একটি গভীর নলকূপ থেকেই সেচ কার্য ও খাওয়ার পানি পাওয়া যায়। এইজন্য পাম্পের সাথে দুইটা আলাদা লাইন স্থাপন করা আছে। একটি লাইন থেকে সোজাসুজি পানি জমিতে চলে যায়। আর আরেকটা লাইন দিয়ে পানি পানির ট্যাংকিতে উঠে যায়। সেই পানি ট্যাংকি থেকে বাড়ি বাড়ি স্থাপিত ট্যাপের সাহায্যে নেন গ্রামবাসী। এইজন্য পরিবার প্রতি ১০০ টাকা খরচ দিতে হয় তাদের।
বিএমডিএ জানায়, গোদাগাড়ীতে তাদের ১৪২ টি গভীর নলকূপের পাশে স্থাপিত পানি রিজার্ভার ট্যাংকি থেকে গ্রামবাসীদের পানি সরবরাহ করা হয়। জমিতে পানি নেয়ার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা প্রি-পেইড কার্ড কৃষকদের ব্যবহার করতে হলেও পানি ট্যাংকির জন্য একটি মাত্র কার্ডই ব্যবহার করতে হয় কৃষকদের।
দিগরাম গ্রামের গভীর নলকূপ অপারেটর মো. হারুন অর রশীদ বলেন, একটি ট্যাংকির জন্য একটাই প্রি- পেইড কার্ড ব্যবহার করতে হয় গ্রামবাসীদের। এইজন্য কমিটি আছে। কমিটি একজন লোক ঠিক করে দেয়। যিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা তোলা ও কার্ড রিচার্জ করার কাজ করেন। এইজন্য তাকে গ্রামবাসীরা বেতনও দেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ