বাঁশের গল্প

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৭, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

এম বাহাউদ্দিন


বাঁশের সন্ধানে বেরিয়েছিলাম। সেই তৈলাক্ত বাঁশটা। যে বাঁশে বানর লাফিয়ে উঠে আবার পিছলে পড়ে। যে বাঁশ আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। যার কারণে আমি এখন পথে পথে ঘুরি। কারণ অংকটা আমার হয় নি। ভুল হয়েছিল। আসলে অংকটাই ছিল ভুল। সেই অংকের কারণে আমি পাশ করতে পারি নি। পাশ করতে পারি নি বলে জীবনে কিছুই করতে পারি নি। আমার সমস্ত রাগ শুধু বাঁশটার উপরই নয়। বানর, তেল এবং যিনি অংকটা তৈরি করেছিলেন তার উপরও। আমি জানি তিনি এখন পরপারে। হয়তো সেখানেও অংক জাতিয় কাজ নিয়ে ব্যস্থ আছেন। কিন্তু এই বাঁশের অংক তৈরি করে দিয়ে কতো মানুষকে বাঁশ দিয়ে গেলেন তার হিসাব কে রাখে!
বাঁশ, বানর আর তেলের একটা সম্পর্ক আছে। বাঁশে লাফাতে না পারলে তেল দাও। কোনটাই না পারলে ফেল্টুদের স্থান নেই। কোথাও স্থান হলো না। বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় সেই বাঁশের সন্ধান পেতে পারি এই আশায় ঘুরছি। কতো দেশ নগর বন্দর ঘুরলাম। নেই। এ জাতীয় বাঁশ কোথাও নেই। পবিত্র আরব দেশে গেলাম। সেখানে খেজুর গাছ। বাঁশ নেই। গ্রীস, সাইপ্রাস, ইতালি কোথাও বাঁশের সন্ধান মেলে নি। আমেরিকায় গেলাম। সেখানে বাঁশের বদলে আছে রয়েল পাম ট্রি। এই ট্রি তারা আরব দেশে গবাদের কাছে ছয়নয় বুঝিয়ে চড়া দামে বিক্রি করে। একটা পাম ট্রি মাত্র এক লক্ষ আশি হাজার ডলারে বিক্রি করে। এ দিয়ে আমার কোন কাজ নেই। চলতে চলতে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তির সাথে মোলাকাত হয়েছে। কেউ সেই বাঁশের সন্ধান দিতে পারে নি। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিভ্রান্ত, পথ ভ্রান্ত ক্ষুধার্ত হয়ে এসে পৌঁছলাম কানাডায়। এখানেও বাঁশের কোন চিহ্ন পেলাম না। আমার এখন দৈন্য দশা। এতদিনে আমার পরনের কাপড় তেনা তেনা হয়ে গেছে, অনেক জায়গায় তালি পড়েছে। জুতা ছিঁড়ে গিয়ে এখন শুধু ফিতাগুলো পায়ে লেগে আছে। আর চলতে পারি না। পথপাশে একটা গাছের নিচে বসলাম দু দণ্ড জিড়িয়ে নিই।
হঠাৎ এক আলিসান গাড়ি এসে থামলো আমার সামনে। টাই সুট পরা এক ভদ্রলোক নেমে এলেন। খুব দরদ দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, চেহারা দেখে তো মনে হয় বাঙালি!
বললাম, হ্যাঁ, আমি বাঙালি।
আমি ব্যারিষ্টার কামরুল। আপনার এ দশা কেনো ভাইসাব?
মনে মনে ভাবলাম, ব্যারিষ্টার আর উকিল একই কথা। কোন্ উকালতি বুদ্ধি নিয়ে এত দরদ দেখাতে তিনি এসেছেন কে জানে! তাদের তো কুরুইল্লা বুদ্ধির অভাব নেই। মুখে বলালাম, বাঁশের কারনে।
বাঁশের কারনে! বলেন কী! কি জাতীয় কোন্ বাঁশ আপনার এ দশার জন্য দায়ি খুলে বলবেন কি?
সব খুলে বলার পর তিনি বললেন, আপনি ভুল জায়গায় বাঁশের সন্ধান করছেন। বাংলাদেশের বাইরে খুব কমই বাঁশ উৎপাদন হয়। তার ব্যবহার ও কম। আপনি যে বাঁশের কথা বলছেন তা বোধ হয় আলি আকবরের লেখা পাটিগণিতের অংকে যে বাঁশের কথা বলা হয়েছে তার কথা বলছেন।
বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। সে বইএ আরো অনেক অদ্ভুত অংক আছে।
আরে সে বাঁশ তো আসলে তার বিকৃত মস্তিষ্কের কর্ম। আলি আকবরের বাবার অনেক টাকা ছিল বোধ হয়। তার কোন কাজ ছিল না তাই বসে বসে এসব বিদঘুটে অংক তৈরি করেছিল। একবার ভাবলেই বুঝতে পারবেন। বাঁশে কেন তেল দিল তা উল্লেখ করেনি, বাঁশে আইক্কা ছিল কিনা তাও বলে নি। বানর যখন লাফ দেয় প্রথম লাফ দিয়েছে মাটিতে দাঁড়িয়ে এবং দশ ফুট উপরে উঠে তিন ফুট পিছলে সাত ফুটের মাথায় এসে দাঁড়াল। প্রশ্ন হল কিসে দাঁড়াল? বাঁশে তো তেল। তাও না হয় মেনে নিলাম সাত ফুটের মাথায় দাঁড়াল। আবার যখন লাফ দিবে তখন আর দশ ফুট উঠতে পারবে না। কারণ মাটিতে দাঁড়িয়ে যে শক্তি পেয়েছিল তৈলাক্ত বাঁশে দাঁড়িয়ে সে শক্তি পাবে না। এটা সম্পূর্ণ ভুল অংক। আর একটা অংক আছে। চুরি বিদ্যা শিক্ষা দেয়। যেমন পাঁচ সের দুধে দু সের পানি মিশিয়ে কম দামে বিক্রি করলে কত লাভ হবে তা বের করতে হবে। তার মানে স্কুলেই চুরি বিদ্যাটা আয়ত্ব করা আর কি! বাদ দেন ওসব অংকের কথা আর বাঁশের কথা। এভাবে পথে পথে ঘুরলে বেশিদিন বাঁচবেন না। উঠুন, গাড়িতে উঠুন।
মনে মনে ভাবলাম, ভদ্রলোকের কথার সাথে তো আমার ধারনার অনেক মিল। নিশ্চয়ই এ অন্য জাতের ব্যারিষ্টার। কুরুইল্লা বুদ্বির কোনা আলামত দেখা যায় না। তাকে বিশ্বাস করা যায়। উঠে পড়লাম গাড়িতে।
তার বাড়িতে নিয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়ার পর বলল, আপনি বাঁশের উপর এত ক্ষেপলেন কেন? বাঁশ তো আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অপরিহার্য! আমার জন্মের আগেই আঁতুর ঘর তৈরি হয়েছিল বাঁশ দিয়ে। আমার মৃত্যুর পর এই বাঁশ দিয়ে চাটাই তৈরি হবে, তাতে আমাকে শুইয়ে বরাক বাঁশে করেই নিয়ে যাওয়া হবে কবরে। এই বাঁশ না থাকলে আমাদের দেশের গরীব মানুষ কি দিয়ে তাদের কুড়েঘর তৈরি করত! বাঁশের প্রয়োজনের কথা বলে শেষ করা যাবে না! আপনি দেশে চলে যান। সেখানে আলি আকবরের বাঁশটা পেলেও পেতে পারেন। আমি আপনার টিকিটের ব্যবস্থা করে দিই। এখানে থাকলে আপনি মারা যাবেন।
তার কথাগুলো আমার মনে ধরল। সেই মতে বাংলাদেশে গিয়ে পৌঁছলাম। অক্টোবর ২০০৬ সাল। হায় হায়! একি! এখানে যে বাঁশের ছড়াছড়ি! কত রকমের বাঁশ! বরাক বাঁশ, মূলি বাঁশ, মাকাল বাঁশ, বোম্বাইয়া বাঁশ, আইক্কাওলা বাঁশ, চুক্কা বাঁশ, ফাডা বাঁশ, ছাচা বাঁশ ইত্যাদি কত রকমের বাশ! যে যেভাবে সুবিধা ব্যবহার করছে। চুক্কা বাঁশ দিয়ে একদল আর এক দলের মানুষেক খুন করছে। একদলের হাতে দেখলাম কয়েক গজ লম্বা তৈলবিহীন বরাক বাঁশ। এটাকে বলে লাঠি। তা দিয়ে মাথা ফাটে, যেখানে সেখানে ঢুকে। কখনো গোপন অংগে। এই ভয়ে আর এক দল যোগাড় করেছে গজারি লাঠি। গজারি দিয়ে লাঠিকে ঠেকাতে হবে। না হয় গোপন অংগেও ঢুকে যেতে পারে। দেখলাম দেশে বানরের যথেষ্ট উৎপত্তি হয়েছে। যেখানে সেখানে বানর বাঁশে উঠানামা করছে।
একজন বলল সবচেয়ে বড় বাঁশটা দেশের প্রধান ভবনে। যে বানরটা এ বাঁশে উঠানামা করছে এটা অন্য জাতের। অনেক ক্ষমতাশালী। এক নজর দেখার জন্য আমিও গেলাম। দেখি এই লাফালাফি খেলা দেখার জন্য অনেক মানুষের ভিড়। দেশি-বিদেশি ধনী গরীব সব জাতের। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে বাঁশটা দেখেই আলি আকবরের অংকের সাথে মিলালাম। প্রায় মিলে গেছে। এই বাঁশটার কারণেই আমার জীবনে এত কিছু ঘটে গেল। এখন ওটাকে আমি দেখে নেব। হাতের কাছে পেয়েছি! এগিয়ে যাব বাঁশের দিকে, দেখলাম নাদুস নুদুস গোলগাল ডিমের মত চেহারার এক ভদ্রমহিলা, দেখতে এমিলডা মারকোসের মত অনেকটা। হয়ত বা এমিলডার সহোদরা হবে। যার পাঁচ শ নাকি পাঁচ হাজার পাদুকা ছিল। জনগণের সম্পদ লুট করা টাকা দিয়ে কেনা, কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর সময় একটাও নিয়ে যেতে পারে নি। এই ভদ্রমহিলা এমনভাবে সাজগোজ করে আছেন মনে হয় বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে যাবে অথবা এখানকার কাজ সেরেই বাসর ঘরে ঢুকবেন। মহিলার অঙ্গলি হেলনের তালে তালে বানরটা লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে আবার পিছলে পড়ছে। তার পাশে বেহেস্তী পোশাক পরা কিছু মানুষ ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষমতাধর মহিলা কি আদেশ করেন তার অপেক্ষায়। কয়েক বছর আগে তাদের দেয়া ফতোয়া বদল হয়েছে। এখন নারী নেতৃত্ব আর বেদায়েত নয়। বরং খেদমত করাই বেহতের। তারা বোধ হয় ভদ্রমহিলাকে বেহেস্তে নিয়ে যাবে। হয়ত বা এখানকার কাজ সমাধা করেই তাদের সাথে রোয়ানা দিবেন। দর্শকের মধ্য থেকে একজন বলল, এ মহিলার বানর উৎপাদনের ফ্যাক্টরি আছে। এখন বাঁশে তেল দেয় না। ঘি দেয়। ওই বানররাই ঘি সাপ্লাই দেয়। আর একটা ভবন আছে, সেখানে দেশের সমস্ত ঘি জমা হয়, আর প্রয়োজনে ব্যবহার হয়। সেই ভবনে ঘিয়ের অভাব নেই। এসব জনগণের ঘি। জনগণের সেবা করার নামে নিজেরাই সেসব ঘিয়ের মালিক হয়ে গেছে। এই যে বাঁশটায় দেখছেন তা তেল নয়, ঘি। এত ঘি ঢালা হয়েছে রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত ভিজে গেছে। যেন এইমাত্র বৃষ্টি হয়ে গেল।
যা বলছিলাম, ভদ্রমহিলা আঙ্গুলি ইশারা করছে আর বানরটা লাফিয়ে উপরে উঠছে আবার পিছলে নামছে। তার প্রতিটি লাফের সাথে সাথে সমস্ত বাংলাদেশ কেপে উঠছে। এই বুঝি একটা প্রলয় কাণ্ড ঘটে যাবে। দেশটা একাত্তরের দশা হয়ে যাবে। দর্শকরা সবাই ভয়ে কাপছে! বিদেশিরাও। হঠাৎ দেখা গেল বানরটা বাঁশের শেষ মাথায় আটকে গেছে, আর নামতে পারছে না। বানরটা খুব চেষ্টা করছে পিছলে নিচে নামার জন্য। কিন্তু পারছে না। উপরেও উঠতে পারছে না, নিচেও নামতে পারছে না। বাঁশটা ঢুকে গেছে! সকলের দৃষ্টি এখন বানরটার দিকে। কি হয় দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। দর্শকের মাঝ থেকে একজন বলল, আসলে ওটা বানর নয়। মানুষ ছিল। নাচার জন্য তাকে প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে। তার গায়ে গন্ডারের চামড়া লাগানো হয়েছে যাতে তার গায়ে পাথর মারলে, গু ছিটিয়ে দিলে, থুতু দিলে বা পাদুকা বর্ষন করলেও টের না পায়। নাচতে নাচতে তার এ দশা হয়েছে, প্রোটিন আর ভিটামিনের অভাবে চেহারা বিকৃত হয়ে গিয়ে এখন বানরের মত দেখায়। (দৈনিক পত্রিকার ছবি দ্রষ্টব্য)। বাঁশ যেদিকেই ঢুকুক তাতে তার কিছু হবে না!
ভিড়ের মাঝ থেকে কে একজন চিৎকার করে উঠল, বাঁশটা ঢুকল কোথায়!
আমার আলি আকবরের কথা মনে হল। অংকটা সে লিখতেই ভুল করেছিল। অনেক প্রয়োজনীয় কথা সে লেখে নি। যেমন বাঁশে ঘি দেয়া যাবে কিনা, আইক্কা থাকবে কিনা, বাঁশটার সাইজ কি হবে, কোন্ জাতের কোন ঝাড়ের বাঁশ এসব কিছুই উল্লেখ করে নি। সবচেয়ে ভুল করেছে সে সাবধান বানী উল্লেখ না করে। বাঁশ যে ঢুকেও যেতে পারে সে কথা উল্লেখ করে নি। ব্যারিষ্টার কামরুলের কথাই বোধ হয় ঠিক, এটা আলি আকবরের অলস মস্তিক্সের কর্ম। কাল্পনিক। আসলে সামনে যা দেখছি তাই বাস্তব। স্থির করলাম বাঁশের চিন্তাটা মাথা থেকে বাদ দিতে হবে।
বাঁশের মাথায় বানররুপি মানব সন্তানের ছটফটানি দেখছি। ক্ষমতাধর মহিলার ইংগিত ছাড়া বাঁশটা বের করতেও পারছে না। সবাই অপেক্ষা করছে অংগুলি কোনদিকে হেলে তা দেখার জন্য।
আমি আর দাঁড়ালাম না। গ্রামের পথে রোয়ানা দিলাম। বানররূপী মানুষটা তখনো বাঁশের মাথায়।
পাঠকের কি অনুমান হয় বাঁশটা শরীরের কোন্ অংশে ঢুকল?