বাঁশ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

শফিক আজিজ:


উপবন ইন্টারসিটিতে সিলেট থেকে ঢাকা- এরপর সিল্কসিটি আন্তঃনগরে ভোরবেলা রাজশাহী পৌঁছাই কোনোরকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই। এবার মহানন্দা এ´প্রেসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে হবে। এ ট্রেন সম্পর্কে ধারণা পেতে এতদাঞ্চলে বহুল কথিত একটি প্রচল-কথা এখানে বলা যেতে পারে। যে কেউ চলতি ট্রেন থেকে ধীরেসুস্থে যেকোনা স্থানে নেমে প্রাতঃক্রিয়াদি সম্পন্ন করে একটু পা চালিয়ে সামনে গেলেই আবার এ ট্রেনটি-ই ধরতে পারবেন। তো, কচ্ছপ-গতির এ ট্রেনেই পৌনে এগারটার দিকে কনসাট স্টেশনে পৌঁছে ব্যাগটি একপাশে রেখে, একটি চায়ের দোকানে বসে চায়ে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছি। বলা নেই-কওয়া নেই, হঠাৎ দৈত্যের মতো চেহারা আর একগাল হাসি নিয়ে কামা এসে সামনে দাঁড়ায়: হাঁরঘের ভাইজান বে! কখন আইছাসেন? কুনু খবর দ্যান্ নাইখো! উত্তরে আমাকে বিশেষ কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করে। কী আর করা, আমিও তাড়াতাড়ি চায়ে চুমুক শেষ করে ওর পেছনে পেছনে ছুটতে থাকি। একটু সামনেই ভ্যান স্টেশন; কামা এসেই একটি ভ্যানে চেপে বসে- ব্যাগটি একপাশে রেখে আমাকেও প্রায় টেনে তুলে। ভ্যানটি ছুটতে থাকে আমাদের গায়ের উদ্দেশে, আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। কামা আমার চাচাতো ভাই। দেহটা অযথাই বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে- সে তুলনায় মগজ বাড়েনি। পড়াশোনা বিশেষ করেনিটো টো করে ঘুরে বেড়ায়। পারলে যেচে-পড়ে লোকের উপকার করেস্বচ্ছল পরিবার বাড়ির কেউ তেমন কিছু বলেনা। পথে একটানা কথা বলে যাচ্ছে এ কথা-সে কথা। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি এ পথেই একটি নদী; না, ভুল বলা হলো এককালে নদী ছিল। এখন বলা যায় একটি খাল। মানুষের ক্রমাগত অত্যাচারে খালে পরিণত হয়ে নির্লজ্জের মতো এখনও টিকে আছে। শীতকালে শুকিয়ে যায়-বর্ষায় জলে টইটুম্বুর। খালের উপর কাঠের একটি সাঁকো। সারা বছর লোকজন, ভ্যান, গবাদি পশু ইত্যাদি এ
সাঁকো ধরেই পারাপার হয়। এখন শীতকাল। খালটির কাছে আসতেই দেখি কাঠের সাঁকোটি নেই- সেখানে নির্মাণ হচ্ছে কনক্রিটের পাকা ব্রিজ। বড় বড় খাম; ব্রিজের অর্ধেক অংশের খামের গার্ডারের উপর জুড়ে বসে আছে কনক্রিটের স্ল্যাব। বাকি অংশের কাজও চলছে। আশে-পাশে নির্মাণ সামগ্রি, শ্রমিকদের অস্থায়ী আবাস; বিদ্যুৎ আনা
হয়েছে- লোকজনে ভরপুর। কামা ও ভ্যানঅলার কথামতো নেমে দাঁড়ালাম। নির্মাণাধীন ব্রিজের পাশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী রাস্তা দিয়ে ভ্যানটি খালের এপাড়ে উঠে গেলো। আমরাও সে রাস্তা ধরে ওপাড়ে গিয়ে ভ্যানে চাপলাম। সাথে সাথেই আবার অন হলো কামা’র কথার রেডিও। এ কথা সে কথার মাঝে হঠাৎ সে বলে ওঠে: ভাইজান, শিউলির‌্যা অ্যাশাছে। -কোন শিউলি? আঁরে, হাঁরঘের আজমত চ্যাচাজীর বেটি! চ্যাচা-চাচী ছবাই অ্যাশাছে বে। ঝাঁ করে হৃৎপি-টা যেন বন্ধ হয়ে গেলো-অনেকক্ষণ কোনো স্পন্দন পেলাম না। একটু পর অনুভব করলাম: ভুল, সেটি তো বন্ধ হয়-ই নি; বরং আরও জোরে লাফাচ্ছে, যেন এক্ষণি বুক থেকে লাফ দিয়ে গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে। অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম। পরাজয়ের একটি গ্লানি আচ্ছন্ন করে ফেলে আমাকে। আশ্চর্য, আজ এ-পড়ন্ত বেলায় নিজেকে কেন পরাজিত মনে হচ্ছে! আমি বা শিউলি কেউ কখনও জয়-পরাজয় নিয়ে ভেবেছি বলে তো মনে হয় না। বরং ওর কাছে পরাজিত হওয়াটাই এককালে আমার কাছে ছিল আনন্দের; কাক্সিক্ষত।

২.
শিউলি ও আমরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকি, কাছাকাছি বয়স, খেলার সাথী-সহপাঠী। ওর বাড়িতে আমার যাতায়াত, আমার বাড়িতে ওর। ছেলেবেলা থেকেই প্রচন্ড একগুঁয়ে- জেদী; পরাজয় মানতেই পারে না। শিশুবেলা থেকেই ওর সাথে খেলতে গেলে ওকে হারানো যাবে না। হারলেই কেঁদে-কেটে অস্থিরনাকের পানি, চোখের পানি এককরে ফেলবে। কাঁদতে কাঁদতে এসে আমার মাকে নালিশ জানাবে, চাচীমা, নওশাদ হাঁমারে হ্যারাইয়্যা দিয়াছে…অ্যাঁ
অ্যাঁ…। আমিও বলে দিতাম, তুই হ্যাঁরাছিস, হাঁমার কী? একথা শুনে ওর কান্না দ্বিগুণ বেড়ে যেতো। মা ওকে কোলে তুলে আদর করতো আর আমাকে কৃত্রিম ধমক লাগিয়ে বলতো, খবরদার কহছি, হুরে আর হ্যাঁরাবি না বেঠা!
বয়সে অনেক ছোট হলেও মায়ের ইঙ্গিত ও ইচ্ছা বুঝতে পারতাম। মায়ের কথামতো ওকে আর হারতে দিতাম না। খেলতে গিয়ে যদি দেখতাম ও হেরে যাচেছ তখন ইচেছ করেই আমি হেরে যেতাম; ও খুশি হতো। আমি হেরেই যেতাম, হেরেই যেতাম…। একসাথে বড় হই; এসএসসি পাশ করি। আমি গিয়ে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলাম।
ওদিকে আজমত চাচা ডিভি লটারি পেয়ে সপরিবারে আমেরিকা চলে গেলেন। শিউলি বা ওদের পরিবারের কারও সাথে এরপর আর যোগাযোগ হয়নি; হয়তো বা সম্ভবও ছিল না। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে খনিবিদ্যায় পড়া শেষে সিলেট গ্যাস প্ল্যান্টে কাজ নিয়ে চলি যাই। প্রায় ন’মাস পর মাকে দেখার জন্যই বাড়িতে ফেরা।
৩. বাড়িতে ফিরে গোসল-টোসল করে ফ্রেস হয়ে মায়ের হাতের খাবার খাওয়ার পর ভ্রমণক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে দেখি প্রায় পাঁচটা বেজে গেছে। মা বলে, দ্যাখ্ কে অ্যাসাছে! তাকিয়ে দেখি মায়ের পেছনে শিউলি দাঁড়িয়ে। অনেক বড় হয়েছে। মুখে লাজুক হাসি। কেমন আছিস রে দুষ্টু?
ভাল, তুই কেমন আছিস রে, পাজি? মা মুখটিপে হেসে বলে, ওমা¹ে, ছুরু হলো তোরঘেঁর ছ্যালেব্যালার দুছ্টামি। বলে বাইরে চলে গেলো। কথায় কথায় জানা হলো, ও ওখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যানথ্রপোলজি
পড়ে এখন ওটিতেই পড়ায়।
৪. শিউলির সাথে বৈকালিক ভ্রমণে বের হয়েছি নদীরধারে যেখানে ব্রিজ নির্মাণ হচেছ সেদিকটায়। শীতের বিকেল; চারদিকে কুয়াশা নেমে এসে প্রায় আঁধার ঘনিয়ে গেছে। লোকজন তেমন নেই, শ্রমিকেরা তাদের অস্থায়ী ডেরার বাইরে রাতের খাবার রান্না করছে; এতে একই সাথে তাদের আগুন পোহানোও হচ্ছে। এদিক-সেদিক বালি, রড, পাথর, সিমেন্ট, ক্র্যাশিং মেশিন, কনক্রিট মিক্সিং মেশিনআরও কত কী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এসবের মধ্যেই লম্বা মোটা ধাতব একটি পাইপ দেখতে পেয়ে শিউলি দৌড়ে তার কাছে যায়। সেটি ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে একটি আজব প্রস্তাব করে; বলে, আয় একটা খেলা খেলি। তুই পাইপের এ- প্রান্তের ফাঁকে মুখ লাগিয়ে বলবি, আমি তোকে ভালবাসি। আমি ও-প্রান্তে কান লাগিয়ে শুনবো। আবার আমি ও-পাশ থেকে মুখ
লাগিয়ে একই কথা বলবো। তুই শুনবি এ-পাশ থেকে। ওর এমন আজব খেলার প্রস্তাব পেয়ে আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। তখন এমনসব অদ্ভুত খেলা ও আবিষ্কার করতো আর আমাকে ইচ্ছে করেই হেরে যেতে হতো। আজকের খেলায় কোনরুপ হারজিতের বালাই নেই দেখে আমি রাজি হই। শিউলি পাইপের ও-প্রান্তে কান লাগায়; আমি এ-প্রান্তের ফাঁকে মুখ লাগিয়ে জোরে বলে উঠি, আমি তোকে ভালবাসি। কথাটি রিদমিক একটি গমগমে সুর তুলে ও-পাশে পেতে রাখা ওর ডান কানে গিয়ে পৌঁছায়। এবার আমি এ-পাশে কান লাগাই; ও-পাশ থেকে একই ভাবে একই কথা বলবে ও। আমি কান লাগিয়ে থাকি, কয়েক মুহূর্ত…কয়েক সেকেন্ড পাড় হয়ে যায়, কোনো শব্দ
নেই। আরও সময় চলে যায়, নেই কোনো বাক্য…আরও আরও সময় কেটে যায় নেই সেই শাশ্বত ও বহুল উচ্চারিত কথাটি। পাইপ থেকে কান তুলে তাকাই ও-পাশটায়ওর দিকে; দেখি দাঁড়িয়ে হাসছে ও। এবার বুঝে ফেলি ওর চালাকি; ও ইচ্ছে করেই আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। আমাকে পরাজিত করেই ও খুশি বা খুশি হতে চায়; থাকতে চায় অপরাজেয়। হঠাৎ বিশ^বিদ্যালয়ের আমার এক সহপাঠীর বলা একটি কথা মনে পড়ে যায়। সে বলতো পরাজয় মানেই বাঁশ। কথাটি মনে হতেই আমি হু হু করে হেসে উঠি। আমার এমন হাসিতে শিউলি অবাক হয়ে তাকায় আমার দিকে। তারপর সহসা দুজনেই নিশ্চুপ; চারদিকে সুনসান নীরবতা। অচিরাৎ বিকট-ভীষণ একটি শব্দ; যেন বা ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই নির্মাণাধীন ব্রিজের ওদিকটায় ঘনকুয়াশা হঠাৎ যেন আরও ঘন হয়ে আসে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি। প্রথমেই আর্তচিৎকার করে আমার দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে শিউলি। কিছু বুঝে উঠার আগেই শ্রমিকেরা মরণচিৎকারে এদিক সেদিক ছুটাছুটি শুরু করে। সাথে সাথেই গ্রামের প্রায় সকলে দৌড়ে, আতঙ্কে ছুটে আসে নদীর ধারে; ব্রিজের কাছে। দেখে, নির্মাণাধীন ব্রিজের স্ল্যাবের অংশটি ধসে পড়েছে। তারা আরও দ্যাখে ব্রিজটির খাম, গার্ডার আর স্ল্যাবে রডের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশ।