বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

আপডেট: আগস্ট ১৩, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রম, অবদান ও ত্যাগ অসীম। সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সকলেই বঙ্গবন্ধুর দুর্দান্ত নেতৃত্বের ছাঁয়াতলে থেকে আন্দোলন সংগ্রামকে করেছেন বেগবান। সেজন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির আদর্শ। বঙ্গবন্ধু বাঙালির সকল কাজের অনুপ্রেরণায়, চেতনায় ও পথচলায়। তাই এই মহান নেতার শহিদি আত্মার স্মরণে আগস্ট মাস বীর বাঙালি জাতির কাছে শোকের মাস। এই মাস শুরু হলেই বাংলাদেশের রাজপথের দু’পাশে খুঁটিতে খুঁটিতে, অফিস-আদালতে, শহর কিংবা গ্রামে জাতীয় শোকের প্রতীক ‘কালো পাতাকা’ বাতাসে মাথা নাড়িয়ে সমগ্র জাতির কাছে শোকের মাতমের দুঃসহ বার্তা জানান দেয়। দেশের প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলের পর্দার এক কোণে ‘শোকের মাস/ শোকাবহ আগস্ট’ ইত্যাদি লেখা সংবলিত কালো ব্যাচ ধারণ করে থাকে। দেশের স্থানীয় ও জাতীয় পত্র-পত্রিকা পুরো মাস জুড়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াল কাল্ রাতের বিভীষিকাময় ঘটনা ও বর্বরতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের রাজনীতি সংগ্রাম ও নির্যাতনের নানা দিক তুলে ধরে সংবাদ ছাপিয়ে থাকে। গণমাধ্যমের এই নিঃস্বার্থ প্রয়াসের কারণে যে বাঙালি কেবলমাত্র বাংলা ভাষায় লিখতে, পড়তে ও বুঝতে শিখেছে সেও বঙ্গবন্ধুর মহান কীর্তি এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারছে। টেলিভিশনে মাসব্যাপি মহান মুক্তিযুদ্ধের সত্য ঘটনা ও তথ্য অবলম্বনে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হয়। সাংস্কৃতিক কর্মী ও তাদের সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন, পেশাজীবী, ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী সকলে নানাভাবে বাঙালি জাতির পিতাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করে থাকেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অমর সৃষ্টি প্রথম গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’-তে গণমাধ্যমের প্রতি গভীর আগ্রহ ও বিশ্বাসের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে তুলে ধরেছেন। কেননা বাংলাদেশের সকল আন্দোলন সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিলো অসীম। এই মহান নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পত্র-পত্রিকা এবং ইলেকক্ট্রনিক মিডিয়াকে শুধু ‘সংবাদ মাধ্যম’ না ভেবে ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ওই গ্রস্থসমূহে তাঁর লিখনির মাধ্যমে তিনি শুধু গণমাধ্যমই নয়, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের কথা স্মরণ করেছেন গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধাভরে। ভাষা আন্দোলনে গণমাধ্যমের অবদান, ছয় দফা দাবিকে “মানুষের বাঁচার দাবি” হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অসামান্য অবদানের কথাও তিনি তাঁর দুটি গ্রন্থেই তুলে ধরেছেন চমৎকারভাবে। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন ধরেই মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করেই আমি এবারের শোক দিবসে অর্থাৎ জাতির পিতার ৪২তম মহাপ্রয়াণ দিবসকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর মমত্ববোধের কথা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি-
বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে গণমাধ্যমের গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে একবার  বলেন, “আমার আব্বা খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, বসুমতি, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃ.১০)।” এরপর তিনি তুলে ধরেন তৎকালীন পূর্ব-বাংলার গণমাধ্যম রাজনীতির কথা এবং সেই সময় এই অংশের নেতৃবৃন্দদের জনগণের কল্যাণে নেয়া প্রদক্ষেপের ইতিহাস। তিনি তাঁর এই দুটি গ্রন্থে তৎকালীন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মালিক ও তাঁদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন খোলাখুলিভাবে। কখনো বা কোন পত্রিকার প্রশংসা করেছেন। কখনো আবার ক্ষেত্র বিশেষে কোনো পত্রিকার ভূমিকাকে নিন্দা করতে ছাড়েন নি তিনি। তিনি বলেন-“চল্লিশের দশকে দৈনিক আজাদ ছিলো একমাত্র বাংলা খবরের কাগজ, যা মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করত। এই কাগজের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ছিলেন বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি। তিনি আবুল হাশিম সাহেবকে দেখতে পারতেন না। আবুল হাশিম সাহেবকে শহীদ সাহেব সমর্থন করতেন বলে মওলানা সাহেব তাঁর উপর ক্ষেপে গিয়েছিলেন। আমাদেরও ঐ একই দশা। তাই আমাদের কোনো সংবাদ ছাপা হত না। মাঝে মাঝে জনাব মোহাম্মাদ মোদাব্বের সাহেবের মারফতে কিছু সংবাদ উঠত। পরে সিরাজুদ্দিন হোসেন (বর্তমান দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক) এবং আরও দুইএকজন বন্ধু আজাদ অফিসে চাকরি করত। তাঁরা ফাঁকে ফাঁকে দুই একটা সংবাদ ছাপাত। দৈনিক মর্নিং নিউজের কথা বাদই দিলাম। ঐ পত্রিকা যদিও পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করত, তবু ওটা একটা গোষ্ঠীর সম্পত্তি ছিল, যাদের শোষক শ্রেণী বলা যায়। আমাদের সংবাদ দিতেই চাইতো না। ঐ পত্রিকা হাশিম সাহেবকে মোটেও পছন্দ  করত না। ছাত্র ও লীগ কর্মীরা হাশিম সাহেবকে সমর্থন করত, তাই বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে সংবাদ দিত। আমরা বুঝতে পারলাম, অন্ততপক্ষে একটা সাপ্তাহিক খবরের কাগজ হলেও আমাদের বের করতে হবে, বিশেষ করে কর্মীদের মধ্যে নতুন ভাবধারা প্রচার করার জন্য। হাশিম সাহেবের পক্ষে কাগজ বের করা কষ্টকর। কারণ টাকা পয়সার অভাব। শহীদ সাহেব হাইকোর্টে ওকালতি করতে শুরু করেছেন। তিনি যথেষ্ট উপার্জন করতেন, ভাল ব্যারিষ্টার হিসাবে কলকাতায় নামও ছিল। কলকাতায় গরিবরাও যেমন শহীদ সাহেবকে ভালোবাসতেন, মুসলমান ধনিক শ্রেণীকেও শহীদ সাহেব যা বলতেন, শুনত। টাকা পয়সার দরকার হলে কোনদিন অসবিধা দেখি নাই। হাশিম সাহেব শহীদ সাহেবের কাছে প্রস্তাব করলেন কাগজটা প্রকাশ করতে এবং বললেন যে, একবার যে খরচ লাগে তা পেলে পরে আর জোগাড় করতে অসুবিধা হবে না। নুরুদ্দিন ও আমি এই দুইজনই শহীদ সাহেবকে রাজি করতে পারব, এই ধারণা অনেকেরই ছিল। আমরা দুইজন একদিন সময় ঠিক করে তাঁর সাথে দেখা করতে যাই এবং বুঝিয়ে বলি বেশী টাকা লাগবে না, কারণ সাপ্তাহিক কাগজ। আমাদের মধ্যে ভাল ভাল লেখার হাত আছে, যারা সামান্য হাত খরচ পেলেই কাজ করবে। অনেককে কিছ্ইু না দিলেও চলবে। আরও দু’একবার দেখা করার পরে শহীদ সাহেব রাজি হলেন। মুসলিম লীগ অফিসের নিচের তলায় অনেক খালি ঘর ছিল। তাই জায়গার অসুবিধা হবে না। হাশিম সাহেব নিজেই সম্পাদক হলেন এবং কাগজ বের হল। আমরা অনেক কর্মীই রাস্তায় হকারী করে কাগজ বিক্রি করতে শুরু করলাম। কাজী মোহাম্মাদ ইদ্রিস সাহেব কাগজের লেখা পড়ার ভার নিলেন। সাংবাদিক হিসাবে তাঁর যথেষ্ট নাম ছিলো। ব্যবহারও অমায়িক ছিল। সমস্ত বাংলদেশেই আমাদের প্রতিনিধি ছিল। তারা কাগজ চালাতে শুরু করল। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছে কাগজটা খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করতে লাগল। হিন্দুদের মধ্যে অনেকে কাগজটা পড়তেন। এর নাম ছিলো ‘মিল্লাত’(অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ.৪০)।”
কঠোর পরিশ্রম আর সাধনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত মিল্লাত পত্রিকার পর অরেকটি পত্রিকা বের করা হলে বঙ্গবন্ধু তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এভাবে-“হাশিম সাহেব কলকাতায় আসলেই শহীদ সাহেবের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতেন। এর প্রধান কারণ ছিল মিল্লাত কাগজকে দৈনিক করতে সাহায্য না করে তিনি দৈনিক ইত্তেহাদ কাগজ বের করেছিলেন-নবাবজাদা হাসান আলী সাহেবের ব্যবস্থাপনা  এবং আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের সম্পাদনায়। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দৈনিক আজাদও ক্ষেপে গিয়েছিল শহীদ সাহেবের উপর। কারণ, পূর্বে একমাত্র আজাদ ছিল মুসলমানদের দৈনিক। এখন আর একটা কাগজ বের হওয়াতে মওলানা সাহেব যতটা নন তাঁর দলবল খুব বেশী রাগ করেছিল (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ.৭২)।”
বঙ্গবন্ধু নিজেই প্রেসে সাংবাদিকতা বা হকারির কাজ করেছেন। শত কষ্ট হলেও তিনি সংবাদপত্রকে ধ্বংস করতে চান নি। একবার তাঁর নিজের হাতে গড়া মিল্লাত প্রেস লোকসানের মুখে পড়লে তিনি তা বিক্রির হাত থেকে রক্ষা করতে কাজ করেন নি¤েœাক্ত কৌশলে-“এই সময়ে আরও কয়েকটা ঘটনা ঘটে আমাদের কর্মীদের মধ্যে। আমাদের যে মিল্লাত প্রেসটি ছিল- সেটা হাশিম সাহেব পরিচালনা করতেন। কথা উঠল, প্রেসটা কি করা যায়? হাশিম  সাহেব পূর্বেই দেনা হয়েছে বলে একটা রঙিন মেশিন বিক্রি করে দেন, তাতে দায়দেনা শোধ হয়ে যায়। তিনি শামসুল হক সাহেবকে ঢাকা থেকে ডেকে নিয়ে বললেন,“ কলকাতার কর্মীরাও অনেকে ঢাকা চলেছে, আমি পাকিস্তানে যাব না। তোমরা প্রেসটা ঢাকায় নিয়ে একে কেন্দ্র করে দলটা ঠিক রাখ, আর কাজ চালিয়ে যাও।” শামসুল হক সাহেব আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজি হলেন, ঢাকার লীগ অফিস ১৫০ নম্বর মোগটুলীতে প্রেসটা বসানো হবে। মিল্লাত কাগজ চলবে, আমরা একজন একটা বিভাগের ভার নেব। শামসুল হক সাহেব ঢাকায় এসে সবকিছু ঠিক করে কলকাতা গেলেন। হাশিম সাহেব আবার কলকাতার কর্মীদের বললেন, “তোমরা তো কলকাতায় থাকলে, তোমাদেরই বোধ হয় প্রেসটা থাকা দরকার। কারণ, হিন্দুস্তানে তোমরা কিইবা করবা! যাদের বাড়ি পাকিস্তানে পড়েছে তাদের আর প্রয়োজন কি, পাকিস্তান তো হয়েই গেছে।” কলকাতার কর্মীরা বলেই বসল, ঠিক তো কথা…। একদিন নূরুদ্দিন, নূরুল আলম ও কাজী ইদ্রিস সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে, আমার বাসার কাছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “ব্যাপার কি?” এরা আমাকে বলল, “সর্বনাশ হয়ে গেছে, হাশিম সাহেব প্রেস বিক্রি করে ফেলতে চান, আমরা চাঁদা তুলে প্রেস করেছি, মুখ দেখাব কি করে?” আমি বললাম, “ আমি কি করব?” সকলে বলল, “তোমাকে বাধা দিতে হবে।” বললাম আমি কেন বাধা দিব? আমি পাকিস্তানে চলে যাব। আর কবে দেখা হবে ঠিক নাই। আমার প্রয়োজন কি? তোমরা হাশিম সাহেবের খলিফা, আমার নাম তো পূর্বেই কাটা গেছে, আর কেন?” সকলেই বলল, “তুমি বললেই আর ভয়েতে বিক্রি করবে না।” বললাম,“ঠিক আছে আমি অনুরোধ করতে পারি।” পরের দিন মিল্লাত প্রেসে গিয়ে হাশিম সাহেবের সাথে দেখা করি। পাশের ঘরে আমার সহকর্মীরা চুপ করে বসে আছে; শুনবে আমাদের কথা। আমি শান্তভাবে তাঁকে বললাম,“প্রেসটা নাকি বিক্রি করবেন?” বললেন, “উপায় কি, প্রত্যেক মাসেই লোকসান যাচ্ছে, কি করি? আর চালাবে কে?” আমি বললাম “খন্দকার নূরুল আমিন তো ম্যানেজার হয়ে এতকাল চালাল। খরচ কমিয়ে ফেলল। প্রেসটা বিক্রি করে দিলে কর্মচারিদের থাকবে কী? আর মুখ দেখাতে পারব না। সমস্ত বাংলাদেশ থেকে চাঁদা তুলেছি, লোকে আমাদের গালি দিবে।” হাশিম সাহেব হঠাৎ রাগ করে ফেললেন এবং বললেন,“ আমাকে বেচতেই হবে, কারণ দেনা শোধ করবে কে?” আমি বললাম, “কয়েক মাস পূর্বে যে প্রেসটা বিক্রি হল তাতে দেনা শোধ হয় নাই?” তিনি ভীষণ রেগে গেলেন, আমারও রাগ হল। উঠার সময় বলে এলাম,“প্রেস বিক্রি করতে গেলে আমি বাধা দেব, দেখি কে আসে এই মিল্লাত প্রেসে?” (পৃ.৭৯-৮০)
বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনীতির খবরাখবর নিতে ভরসা রাখতেন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উপর। তিনি তাঁর জীবনের কঠিন সময়ে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতকি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে। এরূপ একটি উদাহরণ তিনি দিয়েছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। তিনি লিখেছেন-“পরের দিন আজাদ কাগজে তিনি (মওলানা আকরাম খাঁ) নোটিশটা এবং যারা দস্তখত করেছে তাদের নাম ছেপে দিলেন এবং এক বিবৃতি মারফত ঘোষণা করলেন যে, রিক্যুইজিশন সভা আহ্বান করার ক্ষমতা কারও নাই, কারণ পুরানা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। এখন তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম লীগের এডহক কমিটির সভাপতি। অর্থাৎ আমরা কেউই আর মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সভ্য নই। এভাবে মুসলীম লীগ থেকেও আমরা বিতাড়িত হলাম। অনেকেই চুপ করে গেল, আমরা রাজি হলাম না। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে দেখব।(পৃ.৯১)
একবার বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানতুল্য পত্রিকার দুর্দিদের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর লিখনির মাধ্যমে। তিনি সে সময় দৈনিক ইত্তেহাদের দেখাশুনা করতেন। বঙ্গবন্ধু বলেন-“আমি ঢাকায় রওয়ানা হয়ে আসলাম। রেণুর শরীর খারাপ দেখে এসেছিলাম। ইত্তেহাদের কাজটা আমার ছিল। মাঝে মাঝে কিছু টাকা পেতাম, যদিও দৈনিক ইত্তেহাদের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছিল। পূর্ব বাংলা সরকার প্রায়ই ব্যান্ড করে দিয়েছিল। এজেন্টরা টাকা দেয় না। পূর্ব বাংলায় কাগজ যদিও বেশী চলত। (পৃ.১২৬)
এত দুর্দিন ও দুর্দশা এবং শাষক গোষ্ঠির খড়গও বঙ্গবন্ধুকে গণমাধ্যম প্রেম থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে নি। একটি পত্রিকা বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আরেকটি প্রত্রিকা। সব কাজই তিনি করেছেন এদেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট আলোচনায় বঙ্গবন্ধু বলেন-“মওলানা সাহেব সাপ্তাহিক ইত্তেফাক কাগজ বের করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ বের হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। কারণ টাকা কোথায়? মানিক ভাইকে বললেন, কাগজটা তো বন্ধ হয়ে গেছে, যদি পার তুমিই চালাও। মানিক ভাই বললেন, কি করে চলবে, টাকা কোথায়, তবুও চেষ্টা করে দেখব। আমি মানিক ভাইকে আমার এক বন্ধু কর্মচারির কথা বললাম, ভদ্রলোক আমাকে আপন ভাইয়ের মত ভালোবাসতেন। কলকাতায় চাকরি করতেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বাসিন্দা নন তবুও বাংলাদেশকে ও তার জনগণকে তিনি ভালোবাসতেন। আমার কথা বললে কিছু সাহায্য করতেও পারেন। মানিক ভাই পরের মামলার তারিখে বললেন যে, কাগজ তিনি চালাবেন। কাগজ বের করলেন। অনেক জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। নিজেরও যা কিছু ছিল এই কাগজের জন্যই ব্যয় করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যে কাগজটা খুব জনপ্রিয় হতে লাগল। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁকে সাহায্য করতে লাগলো। এ কাগজ আমাদের জেলে দেয়া হতো না, আমি কোর্টে এসে কাগজ নিয়ে নিতাম এবং পড়তাম। সমস্ত জেলায় জেলায় কর্মীরা কাগজটা চালাতে শুরু করল। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানের কাগজ হিসেবে জনগণ একে ধরে নিল। মানিক ভাই ইংরেজি লিখতে ভালোবাসতেন, বাংলা লিখতে চাইতেন না। সেই মানিক ভাই বাংলায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলামিস্টে পরিণত হলেন। চমৎকার লিখতে শুরু করলেন। নিজেই ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে ছাত্রলীগের দুই-তিনজন কর্মী সাহায্য করত। টাকা পয়সার ব্যাপারে আমার বন্ধুই তাঁকে বেশী সাহায্য করতেন। বিজ্ঞাপন পাওয়া কষ্টকর ছিল, কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য কোথায়? তবুও মানিক ভাই কাগজটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন একমাত্র তাঁর নিজের চেষ্টায় (পৃ.১৭৫)।”
গণমাধ্যম স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে সাহায্য করেছিলো তাও তিনি লিখেছেন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। তিনি বলেন-“নওয়াই ওয়াক্ত, পাকিস্তান টাইমস, ইমরোজ ও অন্যান্য কাগজে আমার প্রেস কনফারেন্সের বক্তব্য খুব ভালভাবে ছাপিয়েছিলো। সরকার সমর্থক কাগজগুলি আমার বক্তব্যের বিরুদ্ধে সামালোচনাও করেছিল। আমি রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাজবন্দীদের মুক্তি, গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ, স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক সমস্যার উপর বেশী জোর দিয়েছিলাম (পৃ.২১৮)।”
বঙ্গবন্ধু একবার তাঁর চিন সফরের কথাও বলেছেন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নামক কালজয়ী গ্রন্থে। এই সফরের ফলে গণমাধ্যমের ওপর ক্ষণেকের জন্য হলেও কী প্রভাব পড়বে তাও তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৪৯-এর সেপ্টেম্বর মাসের ১৫-১৬ তারিখ খবর এল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা শান্তি সম্মেলনে যোগদান করবে। শ্লোগান হলো, “যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই”। আমাদেরও যেতে হবে পিকিং-এ, দাওয়াত এসেছে। সমস্ত পাকিস্তান থেকে ত্রিশজন আমন্ত্রিত। পূর্ব বাংলার ভাগে পড়েছে মাত্র পাঁচজন আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, উর্দু লেখক ইবনে হাসান ও আমি। সময় নাই, টাকা পয়সা কোথায়? পাসপোর্ট কখন করবো? টিকিট অবশ্য পাওয়া যাবে যাওয়া-আসার জন্য শান্তি সম্মেলনের পক্ষে থেকে। তারপরও প্রস্তুত হতে অনেক লেট। মানিক ভাই বলতে শুরু করেছেন তাঁর যাওয়া হবে না, কারণ ইত্তেফাক কে দেখবে? টাকা কোথায়? ইত্তেফাকে লিখবে কে? কিছু সময় পর খবর পেলাম চব্বিশ ঘন্টা প্লেন লেট। আগামী দিন বারোটায় প্লেন আসবে, একটায় ছাড়বে। মানিক ভাইকে অনেক করে বললাম, একটু করে রাজি হলেন, তবে ঠিক করে বলতে পারছেন না। পরের দিন সকালে প্রস্তুত হয়ে আমি (বঙ্গবন্ধু) মানিক ভাইয়ের বাড়িতে চললাম। তখন ঢাকায় রিকশাই একমাত্র সম্বল। সকাল আটটায় যেয়ে দেখি তিনি (মানিক ভাই) আরামে শুয়ে আছেন। অনেক ডাকাডাকি করে তুললাম। আমাকে বলেন, “কি করে যাব, যাওয়া হবে না, আপনারাই বেড়িয়ে আসেন।” আমি রাগ করে উঠলাম। ভাবিকে বললাম,“ আপনি কেন যেতে বলেন না, দশ-পনের দিনে কি অসুবিধা হবে? মানিক ভাই লেখক, তিনি গেলে নতুন চীনের কথা লিখতে পারবেন, দেশের লোক জানতে পারবে। কাপড় কোথায়? স্যুটকেস ঠিক করেন। আপনি প্রস্তুত হয়ে নেন। আপনি না গেলে আমদেরও যাওয়া হবে না।” মানিক ভাই জানে যে আমি নাছোড়বান্দা। তাই তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিলেন। এরপর তাঁরা চীনে গেলেন। শান্তি সম্মেলনে যোগ দিলেন। বঙ্গবন্ধু সে সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করলেন। নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে চীন সফরের সমাপ্তি ঘটলো (পৃ.২২২)।”
বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের এক তিল পরিমাণ অবদানও স্বীকার করতে ভুলেন নি। তিনি গণমাধ্যমের পাশাপাশি গণমাধ্যম পুরোধা ব্যক্তিত্বদের অবদান লিখে রেখেছেন স্বর্ণাক্ষরে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-“ইয়ার মোহাম্মাদ খান আমাকে সাহায্য করতে লাগলেন। তাঁর সমর্থন ও সাহায্য না পেলে খুবই অসবিধা ভোগ করতে হত। মানিক ভাই ইত্তেফাক কাগজকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। সাপ্তাহিক কাগজ হলেও শহরে ও গ্রামে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান অবজারভার কাগজও আমাদের সংবাদ কিছু দিত (পৃ.২৩৭)।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আরেকটি কালজয়ী গ্রন্থ কারাগারের রোজনামচাতে গণমাধ্যম প্রীতির কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। তিনি এই গ্রন্থে কারাঅভ্যন্তরীণ জীবনের দুই বছরের (১৯৬৬-১৯৬৭) ঘটনা ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। তাঁর এই ডায়েরিতে (পৃ. ৬২) তিনি পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠির নানা অত্যাচারের কথা এবং ইত্তেফাক পত্রিকা অন্যায়ভাবে বন্ধ করে দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করার কথাও বলেছেন। এরপর তিনি (পৃ.৮৪-৮৫) লিখেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার বাজেট পেশ করে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের ওপর কীভাবে করের বোঝা চাপিয়েছিলো তার ইতিহাস। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণাও সর্বত্র ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। ভাষণটি নি¤œরূপ: “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত না করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ২৭৬)
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, যুক্তফ্রন্টের প্রণীত ২১ দফা এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ৬ দফা ইত্যাদিকে তৎকালীন গণমাধ্যম জনগণের প্রাণের দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই ১৯৭৪ সালে স্বাধীন গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় প্রেস কাউন্সিল। সুতারাং বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবনে গণমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে বলা যেতে পারে। তিনি নিজে যেমন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেছেন তেমনি অন্যদের প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছেন। পৃথিবীর কোন নেতা এমন করে গণমাধ্যমের প্রতি ভরসা রেখে জনগণের কল্যাণে ও দেশের মুক্তি সংগ্রামে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে অগ্রে রেখেছেন বলে আমাদের জানা নেই।
লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী
ংযুধসড়ষঁরঃং@মসধরষ.পড়স