বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ, কতটা স্বাধীন?

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম


মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত সার্চ কমিটির অনুসন্ধান কার্যক্রমের পর যে ১২ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন পরিচালনার জন্য মনোনীত করে সুপারিশ করা হয়েছিল- তাঁদের মধ্য থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (ঈঊঈ) এবং অপর চারজনকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নব নিয়োগকৃত নির্বাচন কমিশনারবৃন্দ সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতির নিকট থেকে শপথ গ্রহণের পর যথারীতি নির্বাচন কমিশন কার্যালয় পরিচালনা করছেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সার্চ কমিটির মনোনীত নিয়োগপ্রাপ্ত বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব জনাব খান মোহম্মদ নুরুল হুদার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল তথা বিএনপির পক্ষ থেকে সিইসির নিরপেক্ষতার বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। দলটির মহাসচিব জননেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম শুরুতেই বলেছেন, “এই কেএম নুরুল হুদা নিরপেক্ষ নন”-
ফলে তাঁর নেতৃত্বে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না। স্মর্তব্য যে, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত সার্চ কমিটির সদস্যগণও যে নিরপক্ষে নন এবং তাঁরা বর্তমান সরকারের আজ্ঞাবহ সে বিষয়েও শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। যাহোক সিইসি কেএম নুরুল হুদার বিষয়ে জনাব মির্জা ফখরুল সাহেব আপত্তি উত্থাপন  করেছে কেন? নুরুল হুদা সাহেব বিএনপির শাসনামলেই কাজকর্ম করেছেন। বিএনপি সরকারের নির্দেশনা পালন করেছেন। মির্জা ফখরুল সাহেব আরো অভিযোগ করেছেন যে, জনাব নুরুল হুদা খোদ জনতার মঞ্চের লোক। জনতার মঞ্চে অংশগ্রহণের কারণে নেতৃত্ব প্রদানের কারণে তাঁকে চাকরিরচ্যুত করা হয়েছিলো ২০০১ সালে। সুতরাং জনতার মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তিকে দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
পক্ষান্তরে পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সিইসি কে এম নুরুল হুদার সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ফরিদপুর জেলার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ১৯৯৫ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি কুমিল্লা জেলার ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। অর্থাৎ ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি বিএনপি সরকারের আজ্ঞাবহ কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইতিহাস এবং তথ্য প্রমাণাদি থেকেই জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে বিতর্কিত ও ভোটারবিহীন নির্বাচন (২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মত) অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই নির্বাচনেও তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তা হলে কি ওই সময় বিএনপি সরকার তাঁকে দিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কাজ করেছিলেনÑ যা এখন ািবএনপির জন্য আশংকার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে? ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সিইসি যদি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারেন তা হলে এখন কেন পারবেন না? বরং বিএনপির তো আত্মসন্তুষ্ট হওয়ার কথা যে, তাদের আমলে যিনি সুষ্ঠু নির্বাচন করেছেন, সেই তিনিই আওয়ামীলীগ সরকার আমলেও সুষ্ঠু নির্বাচনই করবেনÑ এত আস্থা আনতে পারছেন না কেন? তা হলে কি ারে মধ্যে অন্য কোনো ঘটনা আছে যা শুধু বিএনপির নীতি-নির্ধারক মহলই জানেন?
সংবাদপত্রে প্রকাশিত সাক্ষাতকারে জনাব নুরুল হুদা দাবি করেছেন যে তিনি জনতার মঞ্চে ছিলেন না বা যোগ দেননি, তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ওই সময়ে তিনি কুমিল্লার ডিসি ছিলেন ফলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জনতার মঞ্চে যোগদান করা অসম্ভব ব্যাপার। তাঁর এই বক্তব্য পুরোপুরি সত্য, কারণ ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে তথাকথিত জনতার মঞ্চে অংশগ্রহণ করার অপরাধে যে সকল সরকারি কর্মচারীদের কারণ দর্শাও নোটিশ ও অভিযোগনামা পাঠানো হয়েছিল ওই তালিকায় তাঁর (সিইসি) নাম ছিলো না। কারণ বিএনপি সরকার ঠিকই জানতো ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় দেশের ৬৪ জন রিটানিং কর্মকর্তার মধ্যে বর্তমান সিইসি একজন ছিলেন। সংবিধান রক্ষার দোহায় দিয়ে ওই নির্বাচন পরিচালনা না করে জনাব কে এম নুরুল হুদা যদি ওইদিন পদত্যাগ করতেন তাহলেই বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁর নিরপেক্ষতার প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক ছিলো।
ক’দিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নেতা জনাব শামসুজ্জামান দুদু এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন-ছাত্রলীগ এর ক্যাডারকে সিইসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে- সুতরাং তিনি নিরপেক্ষ নন। জনাব দুদুর কাছে সবিনয়ে জানতে চাই- ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মহকুমাগুলি জেলায় উন্নীত করে ৬১টি জেলা গঠন করেছিলেন। ওই ৬১টি জেলায় জেলা গভর্নর নিযুক্তি করেছিলেন। ওই সময়ের যশোর জেলার ডেপুটি কমিশনার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক এবং সিএসপি অফিসার জনাব এ এইচ মোফাজ্জল করিমকে বঙ্গবন্ধু খোদ তাঁর নিজ জেলা গোপালগঞ্জের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। সেই মোফাজ্জল করিম এখন বিএনপির সক্রিয় নেতা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন এর উপদেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর ¯েœহভাজন ও প্রিয় মোফাজ্জল করিম কে বিএনপিতে জায়গা করে দিতে আপনার মনে একবারও কি প্রশ্নটির উদয় হয়নি যে তিনি আওয়ামীলীগের কিংবা ছাত্রলীগের ক্যাডার? তাহলে এক সময়ে ছাত্রলীগ করা (১৯৭৮ সালের আগে বিএনপি ও ১৯৭৯ সালের আগে তো ছাত্রদলের জন্মই হয়নি) পরবর্তীতে বিতর্কিত নির্বাচান পরিচালনা করেছেন, তাঁকে কেন মনে নিচ্ছেন না?
একথা সর্বজন স্বীকৃত ও প্রমাণিত যে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের পছন্দসই সরকারি কর্মচারীদের ফিট লিস্ট তৈরির মাধ্যমে ডেপুটি কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৯২ সালের পর থেকে পর পর দু’বার যে সরকারি কর্মচারী দুটি বৃহত্তর জেলার (ফরিদপুর ও কুমিল্লা) ডেপুটি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি আওয়ামীলীগের সমর্থক ছিলেন এমন কথা খোদ শক্ররাও বিশ্বাস করবে না। যেমন ভাবে একথা বিশ্বাসযোগ্য হবে না যে, ২০০৯ সালের পর থেকে বর্তমান সরকার কোন ছাত্রদল ক্যাডারকে ডেপুটি কমিশনার পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সুতরাং যোগ-ভাগ-গুন বিয়োগ করলে এটা একেবারে সত্য এবং পানির মতই পরিস্কার যে, বর্তমান সিইসি ওইসময় বিএনপির ফিটলিস্টের ও আস্থাভাজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন। তবে শেষ রক্ষা যে এরশাদ সাহেব এই সিইসিকেক তাদের পছন্দের বলে দাবি করছেন।
বাংলাদেশে সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় একটি নির্বাচন কমিশন রয়েছে। এই কমিশন কে যতটাই শক্তিশালী করা হোক না কেন, কিংবা যতই নিরপেক্ষ বলা হোক না কেন এর লাটাই থাকে কিন্তু সরকারের হাতে। মূলতঃ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কোন ক্ষমতাই নেই। এটি একটি ঠুটোজগন্নাথে পরিণত হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচন পরিচালনা করে অন্য একটি শ্রেণি। ডেপুটি কমিশনারদের করা হয় রিটানিং কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা তরুণদের সহকারী রিটানিং কর্মকর্তা। ভোটের কারচুপি, ব্যালট পেপার জালসই, ব্যালট বাক্স ভর্তিতে এরা অসাধারণ নৈপুন্য দেখিয়ে থাকে। এখানে নির্বাচন কমিশন সত্যিকার অর্থে অসহায়। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৮৮ সালে মার্চ মাসে এরশাদ সরকারের আমলে একবার ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী একরামুল হক জয়লাভ করলেও মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে ফোন আসে রিটানিং কর্মকর্তা (ডিসি)র কাছে- ভোটের ফলাফল পাল্টে দেয়া হয় এবং এহসান আলী খান (জাসদ (রব) প্রার্থীকে নির্বাচিত করা হয়েছিলো। কারণ ওই সংসদে একজন গৃহপালিত বিরোধী দলের উপনেতা প্রয়োজন ছিলো। শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়- হ্যাঁ না বা গণভোট থেকে শুরু করে সকল নির্বাচনের ফলাফলগুলোই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে রিটানিং অফিসার বা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা। অথচ কি নেই নির্বাচন কমিশন দপ্তরের? তাদের লোকবল তো উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, বিভাগীয় নির্বাচন কর্মকর্তা সদর দপ্তরে রয়েছে সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, উপসচিব তারপরেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেনইবা অন্যদের মুখাপেক্ষি থাকতে হয় বা হচ্ছে? কেনইবা তারা দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করতে অপারগÑ ঠিক আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মতো। যে রাজনৈতিক দল ৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে তাদেরকে কেনইবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর নির্বাচনের জন্য নির্ভরশীল হতে হয়। সাংবিধানিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারগণ কেনইবা নিজেদের প্রশাসন যন্ত্র ব্যবহার করে সুষ্ঠুু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারছেন না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
পুনশ্চঃ ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর বিসিএস সচিবালয় অ্যাসোসিয়েশন এর পক্ষ থেকে তৎকালীন সরকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ এর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলো তাতে তাদের প্রধান দাবি ছিলো ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে রিটানিং অফিসার পদে ডেপুটি কমিশনারদের পরিবর্তে জেলা জজ অথবা অন্য কোন কর্মচারীকে যেন দায়িত্ব দেয়া হয়। কারণ নির্বাচন পরিচালনায় যে সকল কারচুপি, অনিয়ম হয়ে থাকে তা রিটানিং কর্মকর্তা হিসেবে ডিসিরাই করে থাকেন মর্মে ওই স্মারকলিপিতে উল্লেখ ছিলো। তৎকালীন বিসিএস সচিবালয় সার্ভিস এর ওই দাবি যথারীতি উপেক্ষিত হয়েছিলো এবং সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিলো যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বারংবার উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে এই ১৯৯২-৯৩ সালে বিসিএস সচিবালয় ক্যাডারকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সাথে একীভুত করা হয়েছিল। ফলে এবিষয়ে জোরালোভাবে কথা বলার আর কাউকে পাওয়া যায় না।
লেখক: প্রকৌশলী