বাংলাদেশে আইন শিক্ষায় সৃষ্ট সঙ্কট ও সমাধান প্রসঙ্গে।

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

অ্যাডভোকেট আলী আকবর প্রামাণিক  ও অ্যাডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমান খান


ব্রিটিশ ভারত আমল অর্থাৎ আইন আদালতের জন্ম থেকেই আইন শিক্ষায় স্নাতক যে কোন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর হয়ে আসছে। আমাদের দেশে সম্ভবত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সর্বপ্রথম আইন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করে। পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের দেশে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে আইনে অনার্স কোর্স চালু করে। আইন শিক্ষা সর্বজনিন। আইন শিক্ষা কেবলমাত্র বিজ্ঞ আইনজীবী ও জজ সাহেবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইনে ডিগ্রি অর্জনের পর কেবলমাত্র আইনজীবী কিংবা জজ হতে হবে এমন নয়। রাষ্ট্র, বৈদেশিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, চুক্তি, এনজিও কর্মকা-, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক ও বিমা, রাজস্ব এবং ছোট বড় শিল্প কল-কারখান সহ বহু দেশিয় ও বৈদেশিক সন্ধি পরিচালনায় আইন একান্ত অপরিহার্য। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তির আইন সম্পর্কিত বিষয়ে কোন ধারণা নাও থাকতে পারে। আবার রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি কলা, বিজ্ঞান বাণিজ্য কিংবা অপর কোন অনুষদের হতে পারেন। তাকে আইন জানার জন্য আইন শিক্ষা নেয়া থেকে বঞ্চিত করার কোন অধিকার কারো আছে কি? অনুরূপভাবে ভিন্ন অনুষদের ডিগ্রি অর্জনকারী বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, ব্যাংক, বিমা, এনজিও, শিল্প ও কল-কারখানার সঙ্গে যুক্ত, সরকারি উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, পুলিশসহ বিভিন্ন অপরাপর পেশাজীবীদের আইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার কারো কোন অধিকার নাই। সকল শ্রেণির পেশাজীবীগণের জন্য আইন জানা এবং আইনে শিক্ষা গ্রহণে কোথাও কোন বাধা নাই। বাধা সৃষ্টি করা সমীচিন হবে না।
একটি ছেলে বা মেয়ে একবার কোন বিষয়ে সম্মান ডিগ্রি অর্জনের পর পুনরায় আইন শিক্ষার জন্য পুনরায় আইনে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কোন সুযোগ আছে বলে আমার জানা নাই। ভিন্ন অনুষদের ডিগ্রি অর্জনকারী ছাত্র ও ছাত্রীদের আইন জানা বা শিক্ষার দ্বার বন্ধ করার কারো কোন অধিকার আছে বলেও আমার জানা নাই। তবে আমাদের সংবিধান শিক্ষার দ্বার বন্ধ করে নাই বরং শিক্ষা সকল সময় আমৃত্যু উন্মুক্ত।
আমাদের বাংলাদেশে দুই প্রকার স্নাতক ডিগ্রি বিদ্যমানÑ ১. পাস কোর্স ডিগ্রি এবং ২. অনার্স কোর্স ডিগ্রি। পাস কোর্স ডিগ্রি বর্তমানে তিন বছর এবং অনার্স কোর্স ডিগ্রি চার বছর। মাস্টার্স কোর্স ডিগ্রি দুই/এক বছর। সর্বমোট একটা ছাত্র ও ছাত্রীকে মাস্টার্স কোর্স নিতে হলে ১০+২+৪৩+১+২ মোট ১৭ বছর পড়াশুনা করতে হবে। এই ১৭ বছরের জন্য একটা ছাত্র/ছাত্রীকে আরো ৩/৪ বছর পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আইনের ক্ষেত্রে অন্তত ১০+২+৪৩+১২=১৭+২=১৯ বছর লেখাপড়ার পর আইনজীবীর তালিকাভুক্তির জন্য বিবেচিত হবে। এত দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আইনজীবী হিসাবে স্বীকৃতি পেতে আরো অন্তত ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। একটা ছাত্র/ছাত্রীর পক্ষে এত দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা সম্ভব কি? সে কারণে যে কোন গ্র্যাজুয়েট এর আইন বিষয়ে সাধারণ ডিগ্রি লাভের জন্য পাস কোর্স চালু থাকা দরকার। বাংলাদেশের আইন মহাবিদ্যালয় সমূহ সেই শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
আইন কলেজ সমূহে এলএলবি পাশ) কোর্স উঠিয়ে ৪ বছরের এলএলবি অনার্স) কোর্স প্রথা চালু করলে অন্যান্য অনুষদের ছাত্র / ছাত্রীদের পুনরায় এলএলবি অনার্স) কোর্সে ভর্তি হওয়ার কোন আইনানুগ সুযোগ নাই। সুতরাং আইন কলেজ সমূহে কেবলমাত্র এলএলবি অনার্স) কোর্স চালু করার অর্থ হচ্ছে সকল শ্রেণির ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্র / ছাত্রীদের আইন বিষয়ে পড়াশুনার দ্বার রুদ্ধ করা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এটা লক্ষ্য করা এবং সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত যে, কিছু বিদ্যোৎসাহী আইনজীবী কর্তৃক আইন কলেজ পরিচালিত। কোন আইনজীবী তার পেশা ত্যাগ করে আইন শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে আইনতঃ বারিত। কেননা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এর বিধান অনুযায়ী কোন আইনজীবীই আইন পেশার পাশাপাশি ‘বেতনভূক্ত’ পেশা গ্রহণ করতে পারে না। বিজ্ঞ আইনজীবীর বেতন গ্রহণ পেশাগত অসদাচরণ মর্মে গণ্য হবে। তাছাড়া কোন আইনজীবীর পক্ষের “পূর্ণ” কালীন শিক্ষক হিসাবে কোন আইন কলেজে শিক্ষকতা করা সম্ভব নয়। কেননা আইন কলেজ সমূহ ছাত্র / ছাত্রীদের যত সামান্য বেতনের মাধ্যমে পরিচালিত। আইনজীবীগণ নিজস্ব শিক্ষা দীক্ষা ধরে রাখার জন্যই নামমাত্র সম্মানীতে আইন কলেজ সমূহে শিক্ষাদান কার্যক্রম আইন আদালতের জন্মলগ্ন থেকে পরিচালনা করে আসছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ১০ দশ) জন পূর্ণকালীন স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। কিন্তু ১০ দশ) জন শিক্ষকের বেতন ভাতা কোথা থেকে দেয়া হবে তার দিক নির্দেশনা বা কোন ব্যবস্থাপনা কোথাও দেয়া নাই। অথচ বলা হচ্ছে, সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপিত বে-সরকারি বেতনের নিয়ম নীতি অনুযায়ী বেতন ভাতা দিতে হবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকগণের বেতন ভাতা কেবলমাত্র ছাত্র / ছাত্রীদের বেতনের উপর দেয়া সম্ভব নয়। স্কুল, কলেজ বিশেষ করে আইন কলেজে মিথ্যা বর্ণনায় বা মিথ্যার আশ্রয় নেয়া আইন ও ন্যায় নীতির পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে তাদের সন্তানদের ব্যয়বহুল আইন শিক্ষা দেয়াও সম্ভব নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের আইন শিক্ষার দ্বার বন্ধ করার অধিকার কারো আছে কি?
সার্বিক বিবেচনায় অভিমত হচ্ছে
১। আইনে সকলের জন্য পাশ কোর্সের মাধ্যমে আইন জানা ও আইন শিক্ষা উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি আইন কলেজে অনার্স কোর্স চালু করা হোক।
২। আইন কলেজ সমূহের মাধ্যমে আইন ডিগ্রি অর্জনকারীদের আইন পেশা জাজশিপে জজিয়তী এবং অপরাপর সংশ্লিষ্ট পেশায় যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগের ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখা হোক।
৩। শিক্ষা নীতির অবলম্বনে এমবিবিএস এর মতো পাশ কোর্সে আইন শিক্ষায় দুই বছরের পাশাপাশি আরো ১ এক) বছর কলেজের অধীনে আইনের ব্যবহারিক শিক্ষা যেমন- দেওয়ানি, ফৌজদারি, রাজস্ব, শ্রম এবং আয়কর বিষয়ে শিক্ষানবীশ হিসাবে সংযুক্ত ও রিপোর্ট করার পদ্ধতি চালুর ব্যবস্থা নেয়া হোক।
৪। ছাত্র / ছাত্রীদের বেতন কাঠামো এবং খ-কালীন আইনজীবী শিক্ষকদের সম্মানীর কাঠামো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বার কাউন্সিলের মাধ্যমে আইন কলেজ এবং ব্যক্তিবর্গের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা পূর্বক প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনার দেয়ার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বার কাউন্সিলকে যৌথভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করছি।
৫। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল ‘পূর্ণমান বা পূর্ণকালীন’ আইন শিক্ষকগণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি আইন শিক্ষকগণ আইনের কেবলমাত্র তত্বীয় শিক্ষা দানে পারদর্শী। অপরপক্ষে একজন আইনজীবী তত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক আইন শিক্ষাদানে পারদর্শী। একজনকে পূর্ণাঙ্গ আইনজীবী এবং জজ হতে হলে অবশ্যই তাকে তত্বীয় ও ব্যবহারিক আইন সম্পর্কে জানতে হবে। আর এই কাজটি কেবলমাত্র খ-কালীন আইন শিক্ষক হিসাবে সিনিয়র আইনজীবীর দ্বারাই সম্ভব। সুতরাং আইন কলেজে শিক্ষাদান যে সকল খ-কালীন আইনজীবীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে তা বলবৎ রাখা হোক এবং পাশাপাশি সম্মান শ্রেণিতে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কর্মরত স্থানীয় সিনিয়র আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যবহারিক আইন শিক্ষার প্রথা চালু করা হোক।
৬। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়সহ আইন কলেজ সমূহে গড়ড়ঃ ঈড়ঁৎঃ ঝুষষধনঁং অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা অপর্যাপ্ত এবং একজন আইনের ছাত্র / ছাত্রীর গড়ড়ঃ ঈড়ঁৎঃ-এ অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক থাকলেও তা বাস্তবে পর্যাপ্ত নয়। আইনের ব্যবহারিক বিষয় জানতে, উপস্থাপন ও শুনানির পদ্ধতি জানতে হলে তাকে আদালতে উপস্থিত হয়েই কেবলমাত্র শিখতে হবে। আর এ কাজটি কেবলমাত্র সিনিয়র আইনজীবীর মাধ্যমেই সম্ভব। ক্লাস রুমে বসে আইনের তত্বীয় বিষয় জানা এবং ভাল ফলাফল করা যায় কিন্তু আইনের প্রকৃত প্রয়োগ, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং মোকদ্দমা/মামলা সম্পর্কিত ত্রুটি বিচ্যুতি, মামলা/মোকদ্দমা সম্পর্কিত যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রকৃত আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। সে কারণে আইন আদালতে মোকদ্দমা/মামলা শুনানিতে উপস্থিত অর্থাৎ কোর্টে হাজিরা বাধ্যতামূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
৭। আইন পেশায় জৈষ্ঠ্যের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বাচনভঙ্গি, আইনের ব্যাখ্যা ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অনুকরণীয়। বয়স এবং আইন অনুশীলনের ফলে একজন দক্ষ বিজ্ঞ আইনজীবী যে সমৃদ্ধ ও সফল ছাত্র/ছাত্রী উপহার দিতে পারেন, অপর কারো পক্ষে তা সম্ভব নয়। সুতরাং যে সকল আইন কলেজ জ্যৈষ্ঠ আইনজীবীগণের দ্বারা পরিচালিত তাদের বয়স গুণনীয়ক নয় বরং জ্যৈষ্ঠ্য আইনজীবী তার শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী আইন শিক্ষা বিষয়ে জ্ঞান দানের সুযোগ সৃষ্টি করা মঙ্গলজনক। বর্তমানে বে-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষকম-লী তাদের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান দানের লক্ষ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পরও স্ব-স্ব শিক্ষা দান কার্য পরিচালনা করে আসছেন, ঠিক তেমনিভাবেই আইনজীবীদের আইন কলেজ সমূহে শিক্ষাদান কার্যক্রম এবং আইন কলেজ সমূহ পরিচালনায় আইনজীবীগণের বয়স গুণনীয়ক না করে উন্মুক্ত রাখার সুপারিশ করছি।
সর্বোপরি সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন/চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট/হাইকোর্টে কার্যরত বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী এবং অন্তত সকল বিভাগীয় সদরের আইন কলেজ সমূহের অধ্যক্ষের সমন্বয়ে আইন শিক্ষা বিষয়ে কমিটি গঠন ও তাদের সিদ্ধান্তক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন কলেজ সমূহের আইনের সিলেবাস প্রস্তুত ও আইন পাঠদান পদ্ধতি চালু করার জন্য সুপারিশ করছি।
বর্তমান বাজার অর্থনীতির যুগে কোন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিবিএ বা এমবিএ পড়তে হচ্ছে। নিজের জীবন-জীবিকা ও উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
সে রকম পরিপূর্ণ আইন সচেতন ও আইন বিষয়ে জ্ঞান সমৃদ্ধ নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে হলে পাস কোর্সে আইন অধ্যায়ন অবারিত রাখতে হবে। জাতির জন্য এটা খুবই জরুরি।