বাংলাদেশ অভ্যুদয়

আপডেট: মার্চ ৩০, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ
প্রত্যেকটি মানুষের সফলতা বা ব্যর্থতার পেছনে যেমন কিছু কারণ থাকে, ইতিহাস থাকে, জীবন দর্শন থাকে তেমনি প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরও থাকে নিজস্ব দর্শন ও ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান নামক ভূ-খ-টি শাসিত ও চালিত হয় মূলতঃ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানগত অসামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তখন এ দু’টো অংশ “পাকিস্তান” নামক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় এটি ভাববার বিষয়। শুধুমাত্র তা-ই নয় এ দেশটিতে গণতন্ত্রের চর্চা ছিল না মোটেই। জন্মলগ্ন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে দমন-পীড়ন করা, এদেশের সম্পদ আত্মস্যাৎ করে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা, শিল্প-কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা পশ্চিম পাকিস্তানেÑ এ দেশের মানুষকে শোষণ ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে। গণতন্ত্র ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ও উপেক্ষিত। সুতরাং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও কায়েম করাই ছিল বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূল কারণ।
পাকিস্তান প্রথমবারের মত ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল গণতান্ত্রিক নির্বাচন। কিন্তু এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা বাহানা করেছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন পাকিস্তান সরকার। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইউব খান ও ইয়াহিয়া খানও সংসদীয় নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করে সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। প্রতিবাদী হয়ে বাংলার শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জসহ নানা জনপদের মানুষ। ইতিপূর্বে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষার দাবিতে যে তাজা প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে বাঙালি জাতিকে তার ঘা শুকাতে না শুকাতেই ইয়াহিয়া সরকারের এ কর্মকা- বাঙালিদের প্রতিবাদী করে তোলে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটমূলে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়।
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক বক্তৃতা করেন। সে বক্তৃতায় তিনি সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও শত্রুরা এদেশকে আক্রমণ করলে কীভাবে তা প্রতিহত করতে হবে, মোকাবেলা করতে হবে- তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন।
এর পরেই ভুট্টো ও ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন। তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রস্তুত করতে থাকেন এবং পাকিস্তান থেকে বিমানযোগে সৈন্য ও অস্ত্র আনতে থাকেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। পাকিস্তানিরা আলোচনার নামে অযথা সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ২৫ মার্চের গভীর রাতে তৎকালীন আন্দোলন সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালায়। সুপরিকল্পিতভাবে তারা হামলা চালায় জগন্নাথ ছাত্রাবাসে, জহুরুল হক হলে মধুর ক্যান্টিনসহ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসরত নানা স্থাপনায় নারী-পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করে। ক্রমে তাদের এ গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ে এদেশের সর্বত্র। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নেয় প্রাণ বাঁচাতে। পৈত্রিক বাড়ি, ভিটে-মাটি ছেড়ে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়ে তারা। ভারত সরকার উদ্বাস্তু এ বাঙালিদের আশ্রয় দিয়ে অন্ন-বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে যে মানবিকতা ও বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছিল তা ইতিহাসে বিরল। শুধু তাই নয়, ভারতের মাটিতেই প্রশিক্ষণ নেয় এদেশের কৃষক শ্রমিক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ, কিশোর, যুবা এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিসাংগ্রামে। তাদের সেনাবাহিনীর সাহায্যও অতুলনীয়। ইন্দিরা গান্ধীর সে সময়ের ভূমিকা বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে এবং করবে।
পাকিস্তানি বর্বররা বাঙালিদের শুধু মেধাশূন্যই করতে চায়নি, চেয়েছিল এ দেশের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে ধূলিস্যাৎ করতে। যে অগণিত মেধা, প্রতিথযশা ও খ্যাতিমান মানুষ, উদীয়মান সম্ভাবনাময় নারী পুরুষকে হত্যা করেছিল সেদিন পাকিস্তানিরা- তা হয়তো কোনদিন পূরণ হবার নয়। কিন্তু বাঙালিরা বীরের জাতি কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ কিংবা নতি স্বীকার করেনি তারা। সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে লক্ষ লক্ষ প্রাাণের বিনিময়ে অগণিত মানুষের নানামুখী ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে ঠাঁই করে নিয়েছে “বাংলাদেশ” নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রটি।
বাংলাদেশে যে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারকীয়তা ঘটানো হয়েছে ১৯৭১ সালে তা যে কোন গণহত্যাকে হার মানায়। সম্প্রতি সরকার দাবি তুলেছে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়া হোক। এ দাবি শুধু সরকার নয়, গণমানুষের দাবি।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী বাংলাদেশ আপামর মানুষ আজ যে মানবিক জীবন যাপন করছে (অর্থনীতি, শিক্ষা খাদ্য) তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থারই ফসল।
তবে দুশ্চিন্তার বিষয় এটি এদেশের মাটি থেকে এখনও পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা নিশ্চিহ্ন হয়নি। মাঝে মাঝেই তারা তাদের অস্তিত্বের জানান দেয় দেশের নানা জায়গায় আত্মঘাতী, বোমা হামলা কিংবা অন্যান্য নাশকতামূলক কর্মকা-ের দ্বারা। এদের মোকাবেলা করা কিংবা নিশ্চিহ্ন করা দূরুহ কাজ। ১৯৭১-এ যে ধ্বংস হয়েছে সেক্ষেত্রে বিরুদ্ধ অপশক্তি ছিল পাকিস্তান কিংবা এদেশি পাকিস্তানকামী মুষ্টিমেয় বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু স্বাধীন এদেশে মুখোশধারী সন্ত্রাসী যারা যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় নাশকতা করতে পারে- তাদের চিহ্নিত করা ও প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য বিষয়। তবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোপরি এদেশের প্রতিটি মানুষ যদি সচেতন হয় এবং স্ব স্ব অবস্থান থেকে সতর্ক থেকে সহায়ক ভূমিকা পালন করে তবে হাতে গোনা কিছু নাশকতাকারীকে খুব সহজেই নিশ্চিহ্ন করা মোটেই অসম্ভব কোন বিষয় নয়।
দীর্ঘ সংগ্রাম, অসংখ্য প্রাণের আত্মাহুতি বিপুল ধন-সম্পদের ধ্বংস, মা বোনের সম্ভ্রম, নিষ্পাপ অবুঝ শিশুর বলীদান কখনো বৃথা যেতে পারে না। যে মূলমন্ত্র স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়েছিল তাকে সমুন্নত রাখা সরকার তথা এদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। কোন অপশক্তির কাছে বাংলাদেশ আর মাথা নত করছে না কোনদিন-তার স্বাক্ষর বাংলাদেশ রেখেছে এবং রাখছে তার কর্মকা-ের ভেতর দিয়ে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যে স্বাধীন সার্বভৌম অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল তাকে আমরা সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবো, বর্তমান সরকারের ২০২১ ও ২০৪১ সালের লক্ষ্য পূরণে ও সাফল্যের পথে। অবাক বিস্ময়ে পৃথিবী দেখবে ও জানবে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের বিজয় ও গর্বের ইতিহাসকে।
বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পুরো বিশ্বের অত্যাচারী শাসক ও শোষকদের সতর্ক করে দেবে যেন আর কোন ভূ-খ-ে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো না হয়। বিশ্বময় প্রবাহিত হোক শান্তি ও স্বস্তির সুবাতাস।