বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যর খুলল নতুন দ্বার দু’দেশে উদ্বোধন হলো নৌবন্দর, চলল পণ্যবাহী জাহাজ রাজশাহীকে সমৃদ্বশালী অর্থনীতি জোনে পরিণত করা হবে: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী এই রুট ফের সচল হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা অনেক : ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৪, ১১:৫৯ অপরাহ্ণ


মাহী ইলাহি ও একে তোতা:দীর্ঘ ৫৯ বছর পর আবারও ভারতের মুর্শিদাবাদের সঙ্গে নৌপথের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলো রাজশাহীর। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রম ও বাণিজ্য প্রটোকল (পিআইডাব্লিউ টিঅ্যান্ডটি) ১৯৭২ এবং সংশোধনী ২০১৬/২০২০ এর আওতায় ১৯৬৫ সালের পর ভারত ও বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রীরা যৌথভাবে এই নৌপথ উদ্বোধন করেছেন। সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে দুই নৌবন্দর উদ্বোধন করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা।

এর মধ্য দিয়ে খুললো বাংলাদেশ- ভারতের নতুন বাণিজ্যর দ্বার। রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও রাসিক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন। মুর্শিদাবাদ ময়া নৌবন্দরের উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর ও কলকাতায় বাংলাদেশ উপ দূতাবাসের বাণিজ্য সচিব মোহাম্মদ আরিফ।

বাংলাদেশের রাজশাহী প্রান্তে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, রাজশাহীতে শুধু শিক্ষা না, সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি জোনে পরিবর্তন করা হবে। এজন্য সরকার প্রধান শেখ হাসিনা কাজ করে চলেছেন। সিল্কসিটি রাজশাহীকে ব্যবসা-বাণিজ্যে তুলে আনা যায় তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীকে নিয়ে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। শিক্ষানগরীকে অর্থনৈতিক জোনে পরিণত করা যায় সেভাবে তিনি কাজ করছেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কারও সাথে বৈরিতা করে না। সকলের সাথে বন্ধুত্ব রেখে পররাষ্ট্র নীতি তৈরি করেছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে সম্পর্ক অন্যন্য উচ্চতায় চলে গেছে। শুধু ময়া-সুলতানগঞ্জ নয়, ভারতের সাথে পর্যটক পরিবহনে আমরা অভাবনীয় যায়গায় চলে গেছি। ময়া-সুলতানগঞ্জ তারই একটি নতুন মাইল ফলক।

সরকারের এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আমাদের স্থলবন্দর আছে ২৪টি। একটি মিয়ানমার ও ২৩টি প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে। আমাদের ১৭ টি স্থলবন্দরের কার্যক্রম চলছে। ধীরে ধীরে বাকি সাতটি স্থলবন্দরও কাজ শুরু করা হবে। সোনামসজিদ স্থলবন্দর নিয়ে আমরা নতুনভাবে ভাবছি। এই স্থলবন্দর আরও কীভাবে আমাদের জীবন-জীবিকা ও ব্যবসা বাণিজ্য প্রসার ঘটানো যায় সেভাবে আমরা কাজ করবো।

আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ২০১৯ সালে ঢাকা থেকে কলকাতা পর্যন্ত ক্রুজ সার্ভিস উদ্বোধন করেছি। আমাদের নয়টি ও ভারতে চারটি ক্রুজ অতিক্রম করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সীমানায় প্রায় ১২০০ কিলোমিটার পথ আছে। বেনারশ থেকে হিব্রুগড় পর্যন্ত গেছে। সেখানে ২৮ জন ইউরোপিয়ান পর্যটক বাংলাদেশের অপার সৌন্দর্য্য তারা উপভোগ করেছে। তারা শুধু অপার সৌন্দর্য্য উপভোগ করিনি বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে তারা দেখেছে। শেখ হাসিনার উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়েছে।

সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সিটি মেয়র ও এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি বলেন, রাজশাহী থেকে ভারতের নৌপথে বাণিজ্য চালুর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর তা বাস্তবায়ন হলো। এতে রাজশাহীবাসীর দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা পূরণ হলো। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রমণ ও বাণিজ্য প্রটোকল স্বাক্ষর করেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী সুলতানগঞ্জ-ময়া নৌ পথ আবারো চালু হলো। এতে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।

এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা, রাজশাহীস্থ সহকারি হাই কমিশনার মনোজ কুমার, রাজশাহী -১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান আসাদ, রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল কালাম আজাদ, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওদুদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর চেয়ারম্যান কমোডর আরিফ আহমেদ মোস্তফা। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্মসচিব সেলিম ফকির।

অন্যদিকে ভারতের মুর্শিদাবাদ প্রান্তে ময়া নৌবন্দরের উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর। তিনি বলেন, ইনল্যান্ড ওয়াটার ওয়েজ-১ এর আওতায় ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই নদী বন্দরের সূচনা হলো। এই রুট ফের সচল হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা অনেক। বাংলাদেশের সহযোগিতায় ইনল্যান্ড ওয়াটার ওয়েজ-২ এর আওতায় ভারতের আসামে থেকে কলকাতা নদী বন্দরের মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে থাকি। আজ আমরা একটা পাথরের চালান দিয়ে পরীক্ষামূলক যাত্রার সূচনা করলাম। এই নদী বন্দরকে কেন্দ্র করে আশেপাশ ব্যাপক অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই উপকৃত হবে।

শান্তনু ঠাকুর বলেন, কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে হলদিয়া থেকে বারাণসী পর্যন্ত অন্তর্দেশীয় ১ নম্বর জলপথ বরাবর পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই জলপথের অংশে ৬২টি জেটি, রোরো এবং রোপ্যাক তৈরি হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী সকলেরই সুবিধা হবে। এর ফলে পরিবহনের সময় অনেকটাই কমবে বলে জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ দূতাবাসের বাণিজ্য সচিব মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ঐতিহাসিক এই রুট পুনরায় চালু হওয়ায় দুই দেশই উপকৃত হবে। পরীক্ষামূলক যাত্রায় আমরা দেখতে চাচ্ছি কার্গো শিপিং, লোডিং আনলোডিং সব ক্ষেত্রে ঠিক কত সময় এবং খরচ লাগতে পারে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রম ও বাণিজ্য প্রটোকলটি ১৯৭২ সাল থেকে চালু রয়েছে। ২০১৬ এবং ২০২০ সালে পিআইডাব্লিউ টিঅ্যান্ডটির প্রথম এবং দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে চুক্তির ৫ ও ৬ নম্বর রুটটি বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে আরিচা এবং ময়া থেকে ধুলিয়ান পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ফলে ভারতীয় অংশে ময়া ও ধুলিয়ানকে এবং বাংলাদেশের অংশে রাজশাহী ও গোদাগাড়ী বা সুলতানগঞ্জকে নতুনভাবে পোর্ট অব কল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

১৯৬৫ সালে সুলতানগঞ্জ-ময়া ও গোদাগাড়ী-ভারতের লালগোলা নৌঘাটের মধ্যে নৌপথে বাণিজ্য চালু ছিল। পরে রুটটি বন্ধ হয়ে যায়। সোমবার বাংলাদেশ সীমান্তের সুলতানগঞ্জ নৌ-বন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পরে রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ ঘাটটি নদী বন্দরের মর্যাদা পেলো। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য ভারত থেকে আমদানিতে সময় ও খরচ কমে যাবে। এতে উপকৃত হবেন বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, বছরে এই নৌপথে ২ দেশের মাঝে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।

সোমবার এই রুটের পরীক্ষামূলক উদ্বোধনী যাত্রায় মুর্শিদাবাদের মায়া নদীবন্দর থেকে সোমবার পাথরের একটি পরীক্ষামূলক চালান রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। উল্টো দিক থেকে জুটের একটি চালান মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে পাঠানো হয়। এতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে আরও গতি আসবে বলে আশাবাদী বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা।

সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য ভারত থেকে আমদানিতে সময় ও খরচ কমে যাবে। বছরে ৪ হাজার ১৩৯ ট্রিপ পণ্যবাহী কার্গো চলাচল করবে। এতে উপকৃত হবেন বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। এর আগে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশের রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ধুলিয়ান নৌরুটে বাণিজ্য চালুর। রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার একটি নৌপথের অনুমোদন থাকলেও পদ্মার নাব্যতা সঙ্কটের কারণে কার্যকর করা হয়নি। ফলে রুটটি সংক্ষিপ্ত করে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া নৌবন্দর পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে ২০ কিলোমিটার পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে পণ্য আনা নেওয়া হবে। শুরুতে এই নৌপথে ভারত থেকে পাথর বালি ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সামগ্রী আনা হবে।

সুলতানগঞ্জ থেকে ময়া নৌঘাটের নদীপথে দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার। সুলতানগঞ্জ নৌঘাটটি রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণের পদ্মার শাখা নদী মহানন্দার মোহনার কাছাকাছি। সারাবছর সুলতানগঞ্জের এই পয়েন্টে গভীর পানি থাকে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ময়া নৌঘাটটি মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমা শহরের কাছে ভারতীয় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সুলতানগঞ্জ-ময়া পথে নৌবাণিজ্য শুরু হওয়ায় পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমে যাবে। এতে রাজশাহীর অর্থনীতি গতিশীল হবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। প্রথমদিন বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস পণ্য নিয়ে এবং ভারত থেকে পাথরবাহী কার্গো দুপুর দুইটায় সুলতানগঞ্জ বন্দরে আসে।