বাংলাভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক রাশেদা খালেক:


আমার গর্ব আমি বাঙালি। আমার অহংকার আমার আছে বাংলাভাষা, আমার শান্তি আমি বাংলায় কথা বলি। আমার আনন্দ আমি বাংলায় গান গাই। আমার সকল মমতা ও ভালোবাসা বাংলাভাষাকে ঘিরে। এই বোধ এই অনুভূতি যদি হয় একজন খাঁটি বাঙালির, তবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাংলাভাষা প্রীতি যে কত তীব্র কত তীক্ষ্ম তা সহজেই অনুমেয়। বাঙালির মনে বাঙালি জাতিসত্তা, বাঙালি জাতীয়তাবোধ যিনি গড়ে তুলেছেন, ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের যিনি জন্ম দিয়েছেন- সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা আন্দোলন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই আমি ভাষা শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের আগে থেকেই এই দেশটির রাষ্ট্রভাষা নিয়ে মতভেদ ও বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৪৭ সালের ১৯ মে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকা থেকে জানা যায় যে, নিখিল ভারত মুসলিম লিগ ওয়ার্কিং কমিটির প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করবার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। একই বছর ২৪ জুলাই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত বলে মতামত জানিয়েছেন।
এসময় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। প্রগতিপন্থি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদরা তাদের লেখনি ও কর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে দাবি ও যুক্তি তুলে ধরতে থাকেন। ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারি পদে জরুরি নিয়োগের জন্য উচ্চতর ‘সিভিল সার্ভিস’ পরীক্ষার জন্য ন’টি ভাষায় যেমন ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, জার্মান, ফ্রেন্স, ল্যাটিন এমনকি সংস্কৃত ভাষাকে নির্দিষ্ট করে একটি সার্কুলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলাকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন, অগ্রাহ্য করা হয়। বঞ্চিত করা হয় বাঙালিদের। এসব দেখে সচেতন বাঙালি সমাজ হতবাক ও বিস্মিত হয়। এহেন পরিস্থিতিতে বাংলার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং পূর্ববাংলার স্বার্থ সংরক্ষণে সচেতন মহল নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন দুটি পর্বে পরিচালিত হয়। প্রথম পর্ব ১৯৪৭-৪৮, ২য় পর্ব ১৯৫২ সাল। প্রথম পর্যায়ে গড়ে তোলা এ আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সময়-কাল ও বাস্তব অবস্থার বিবেচনায় তারা হলেন প্রকৃত বাঙালি, ভাষাপ্রেমিক এবং সময়ের সাহসী সন্তান। এ আন্দোলনে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে অনন্যমাত্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর তসুদ্দুক আহমদের সভাপতিত্বে প্রগতিশীল যুবকদের এক সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ গঠন করা হয়। এ সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে ২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়।
ক্স পূর্ব পাকিস্তান কর্মীসম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলাভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক।
ক্স সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে সে সম্পর্কে আলাপ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।
রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত এই ২য় অংশটির প্রস্তাব করেন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর এই প্রস্তাব সমর্থন করেন রাজশাহীর জননেতা আতাউর রহমান। সে সময়ে পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ ছিল বাঙালি। সুতরাং শেখ মুজিবের কৌশলি প্রস্তাবের উদ্দেশ্য বুঝতে এবং মেনে নিতে কারও অসুবিধা হয় নি।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অনুষ্ঠানে কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দু এবং ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করবার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনসহ মুসলিম লীগের সকল সদস্য তাঁর প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এ খবর শুনে পূর্ব বাংলার সর্বত্রই ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। ২ মার্চ ১৯৪৮ সালে বিভিন্ন ছাত্র-যুব-সাংস্কৃতিক সংগঠনের এক যৌথ সভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটি ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে কর্মপরিষদের এক সভা বসে। সভায় আপসকারীদের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সরকারের সাথে অনেকেই আপস করতে চাইলো। শেখ মুজিব তাঁর বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন তুললো ‘সরকার কি আপস প্রস্তাব দিয়েছে? নাজিমুদ্দিন সরকার কী বাংলাভাষার দাবি মেনে নিয়েছে? যদি তা না হয়ে থাকে তবে আগামী কাল ধর্মঘট হবে।’ শেখ মুজিবকে সমর্থন দিলেন অলি আহাদ, তোয়াহা, শওকত সাহেব, শাসসুল হক সাহেব। আপসকারীদের ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেল। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সাল সাধারণ ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে পুলিশের সাথে নেতাদের বচসা এবং ধস্তাধস্তি হয়। এক পর্যায়ে নেতৃবৃন্দ রাস্তায় শুয়ে পিকেটিং করতে থাকেন। পুলিশ শেখ মুজিবসহ ৬৩ জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের প্রতিবাদে দেশব্যাপি ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষও আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়। নাজিমউদ্দিনের সরকার বিপাকে পড়ে আপসের পথ ধরে। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সাথে সরকারের ৮ দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শেখ মুজিবসহ সকল বন্দিদের কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর শেখ মুজিব ১৫ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে ৮ দফা চুক্তিনামাকে অসম্পূর্ণ ও আপসকামী বলে আখ্যায়িত করেন। এবং ১৬ মার্চ বেলা দেড়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এক সভায় আয়োজন করে। সভায় সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিব সভাপতিত্ব করেন এবং একাই তিনি বক্তব্য রাখেন। উক্ত সভায় ৮ দফার ৩টি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করে তা সরকারের কাছে পাঠানো হয়। সভা শেষে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটি জঙ্গি মিছিল অ্যাসেমব্লি হলে যায় এবং ঘেরাও করে। পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে মিছিলকারিদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়্
পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে পরদিন ১৭ মার্চ ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট ঢাকা হয়। ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভা থেকে ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র প্রথমবারের মত ঢাকা আগমন উপলক্ষে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ছাত্র ধর্মঘট আপাতত প্রত্যাহার করা হয়। ২১ মার্চ ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা সভায় এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ উর্দুকে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা উল্লেখ করলেÑ ছাত্রসমাজ নো নো নো ধ্বনিতে তীব্র প্রতিবাদ জানায়- আর এ প্রতিবাদের অন্যতম নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৪৮ সালে ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র মৃত্যু হলে রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি অমিমাংসিত থেকে যায় এবং আন্দোলনেও কিছুটা ভাটা পড়ে।
১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি হন। যার ফলে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। তবে কারাবন্দি শেখমুজিব চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে সাক্ষাৎপ্রার্থী রাজনৈতিক সহকর্মী ভাষা সৈনিক জিল্লুর রহমান, কে জি মোস্তফা, অলি আহাদ, গাজীউল হক, শামসুল হক চৌধুরী প্রমূখ নেতাদের ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার শেখ মুজিবকে হাসপাতাল থেকে রাজনীতি করার অপরাধে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেন। শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমদ মুক্তির দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি হতে অনশন ধর্মঘট শুরু করলে ভাষা আন্দোলন কর্মসূচিতে উৎসাহ ও প্রেরণা জাগে। ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে পুলিশের গুলিতে বরকত, সালাম, রফিক, আজাদ প্রমূখ ছাত্রদের হত্যা করা হলে জেল থেকেই তিনি ছাত্রহত্যার বিচার দাবিতে অনশন চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটলে সরকার ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরস্মরণীয় চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে।
লেখক: চেয়ারম্যান, নর্থবেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটি