বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ || বাঙালি সত্ত্বায় বিকশিত হোক জীবন

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০১৭, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, ১৪২৪ সন। বাঙালির জাতীয় জীবন থেকে আরো একটি বছর চলে গেল। মহাকালের হিসেবে চলে যাওয়া এক বছর কিছুই নয়- কিন্তু জাতীয় জীবনে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক বেশি। এক বছরের অনেক হিসেব-নিকেশ, অনেক আনন্দ-বেদনার স্মৃতি, উন্নয়ন-অগ্রগতির হাতছানি কিংবা ব্যর্থতা, অর্জনহীনতার গ্লানি। অনেক প্রত্যাশা স্বপ্ন আকাক্সক্ষা আবার পিছন থেকে টেনে ধরে পশ্চাদমূখি অসভ্যতার দিকে আরোপিত যাত্রার প্রবণতা। এসব কিছুকেই সাথে নিয়ে নতুন বছরের পথচলা শুরু হল। গেল বছরে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে যেমন ছিল ছন্দ, তেমন ছিল বেসুরো ল-খভ- কিছু কর্মকা-। তবু নিশ্চিত ছিল প্রগতির নেতৃত্ব, নতুন বছরেও সেই একই ধারাবাহিকতা, গন্তব্যে পৌঁছানোর শপথ।
আর ভ্রষ্ট দূরাচারের দল যাই বলুক না কেন- বাংলা নববর্ষ বাঙালির এক মহান উৎসব। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এক হয় উৎসব-আয়োজনে। রঙে-আনন্দে উচ্ছ্বলতায়, আবেগাপ্লুতায়, চিন্তা ও ভাষায় উদ্ভাসিত হয় আলো, চলার গতিপথ। বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়, বিশ্ব মানুষে ঘোষিত হয়- শান্তি, ঐক্য, প্রেম-ভালবাসা, পরম ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ। পহেলা বৈশাখ বিশ্ব মানবতার সমর্থনে শপথেরও দিন। বিশ্বের অন্য নববর্ষের চেয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের এখানেই পার্থক্য, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা।
বাংলা নববর্ষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাঙালির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেরও পথনির্দেশক। সেই শপথের ইস্পাত কঠিন ঐক্য থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্পর্ধিত অভ্যুদয়। বাংলা নববর্ষের ভেতরের শক্তিকে তাই ভয় পায়- বিবরবাসী সাম্প্রদায়িক শক্তি। তাদের কাছে অত্যন্ত অপছন্দের ব্যাপার এটি। তারা আনন্দ-আলো, জ্ঞান গরিমা, সত্য ও সুন্দরকে ভয় পায়, নারীকে ভয় পায়, সর্বোপরি মানুষের মিলন-ঐক্যকে ভয় পায়। ওদের ভঙ্গুর- বিপর্যস্ত, কালিমালিপ্ত হীন মন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পবিত্রকে ধর্মকে। ফতোয়া দিয়ে বাতিল করতে চায় পহেলা বৈশাখকে, মঙ্গলযাত্রাকে। তবুও আবহমানকাল ধরে চলে আসা মানুষের এই মহামিলনের উৎসব চলছেই, চলতেই থাকবে চিরকাল।
পহেলা বৈশাখে বাঙালি সংস্কৃতির এ চর্চা বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে বিকশিত করে চলেছে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি যোগায়, যোগাবে বাংলা নববর্ষ যুগ যুগ শতযুগ ধরে। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি একাত্তরে বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে মিটিয়ে দিতে চেয়েছিল। ভয়ঙ্কর-বিভৎস নৃশংসতায় মানবতার শত্রুরা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হামলে পড়েছিল। নির্বিচারে হত্যা-গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করেছিল। ‘পোড়া মাটি নীতি’ নিয়ে বাঙালি জাতিকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালি পরাভব মানেনি সেদিন। স্বাধীনতার শত্রুরাই সেদিন হেরেছিল। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও জঙ্গি সন্ত্রাসী সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠি এখনো তৎপর বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে।
বাংলা নববর্ষ উৎসব এক অবিনাশী চেতনার প্রদীপ্ত অগ্নিশিখা। একে নেভান যাবে না, যায়নি, যাবে না কোনো দিন। যারা এই আগুনকে নেভাতে চায়, তারাই বার বার পুড়ে মরেছে। আবহমানকাল ধরে এই অগ্নিধারায় ¯œান করে যে বাঙলি জাতি শুচি-শুভ্র হয়েছে সে তো আগুনেরই সন্তান। সে জাতির ললাটে কলঙ্কটিকা আঁকে কার সাধ্য! তাইতো বাঙালির এই সংস্কৃতি এখন বিশ্বআিৈতহ্যের অংশ হয়ে গেছে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে। বাালির সংস্কৃতি তাইÑ যা বিকশিত হয় বিশ্ব ব্যাপিয়া।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে এই শপথই দৃঢ় হোক- মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বৈষম্য এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। নতুন বছর সকল জরা ও গ্লানি মুছে দিয়ে, নবতর সংগ্রামের শপথে ঐক্যবদ্ধ বাঙালির জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দ বয়ে আনুক এটাই প্রত্যাশা।
বাংলা নববর্ষ-১৪২৪ সবার জন্য শুভ ও কল্যাণকর হোক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ