বাংলা বর্ষ গণনার ইতিহাস

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

সাইফুদ্দীন চৌধুরী:


সৌরজগতের সংগে সংগতি রেখে কৃষি কাজ সম্পাদন এবং সেই সংগে সময়ের হিসাব সংরক্ষণের অভ্যাস মানব সমাজের প্রাচীনতম ঐতিহ্যের একটি। পৃথিবীর অনেক দেশেই এই ঐতিহ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার কথাই বলি : এই দেশের সেকালের পুরোহিতরা একদা লক্ষ্য করছিল যে, ভোর বেলা লুব্ধক নক্ষত্র আকাশের বিশেষ স্থানে অবস্থান গ্রহণ করলেই নীলনদে বন্যা আসবার সময় হয়। এই নীলনদের বন্যার সময়ের হিসাব অনুযায়ী মিশরীয়রা কৃষি কাজ করতো। বলা যায়, প্রকৃতির এই নিয়মটির উপরই তখন নির্ভর করতো সেখানকার অধিবাসীদের ভাগ্য। পুরোহিতরা লুব্ধক নক্ষত্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখে মিশরীয়দের ভাগ্য বিপর্যয় থেকে রক্ষার প্রচেষ্টা চালাতো। এইভাবে নীলনদের বন্যার হিসাব ধরে বছর গণনার শুরু হয়, অধিকন্তু গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের সংগে সংগতি রেখে মানবভাগ্য জড়িত থাকার ধারণাও সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ এবং ধর্মীয় ধ্রুপদীসাহিত্যেও বর্ষ গণনার প্রসংগ আছে। ইসলাম ধর্মে চন্দ্র এবং সূর্য উভয়কে কেন্দ্র করেই বর্ষ গণনার নজির রয়েছে। আল কুরআনের সুরা ইউনুসের ৫ম আয়াতে বলা হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ তায়ালা) সূর্যকে তেজদীপ্ত ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মঞ্জিলসমূহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা বর্ষের গণনা ও কাল নির্ণয় অবগত হতে পার, আল্লাহ এটি নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। তিনি নানা সম্প্রদায়ের জন্য এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন।” পৌরাণিক হিন্দু ধর্মেও নবগ্রহ বা নয়টি গ্রহের বিশদ বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সূর্য, চন্দ্র, শনি, মংগল, বৃহষ্পতি, শুক্র, কেতু, রাহু প্রভৃতির নাম।
উপর্যুক্ত পৌরাণিক এবং ধর্মীয় বর্ষগণনার প্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক কালে এই উপমহাদেশের চিত্র কী? বাংলা বর্ষ গণনার ঐতিহ্য কতো পুরনো? এই সব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে সত্যিকার অর্থেই নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। ভারতীয় উপমহাদেশের বর্ষ গণনার বিষয়ে পথিকৃৎ গ্রন্থাকার হলেন স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম। তিনি তাঁর রচিত The Book n Indian Erra শীর্ষক গ্রন্থে এই উপমহাদেশে প্রচলিত ২৭টি সন নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলা সনের উদ্ভব এবং ক্রমবিকাশ সম্পর্কে কানিংহাম সাহেবের আলোচনা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বলে আমাদের মনে হয়। তাঁর মতে বাংলা সন হলো মিশ্র প্রকৃতির সন, যার প্রবর্তক মুঘল স¤্রাট আকবর। স¤্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরির রবিউসসানি মাসে এই সনের প্রবর্তন করেন। এর প্রথমাংশ ৯৬৩ পর্যন্ত হলো হিজরি অব্দ বা চন্দ্রাব্দ। আকবর এই সনের নাম দেন ফসলি সন যার গণনার সূত্রপাত হয় ১লা আশ্বিনকে নববর্ষ ধরে। পক্ষান্তরে, বাংলা সনের ক্ষেত্রে এই হিসেব করা হলো ১ লা বৈশাখ হিসেবে ধরে। আর ওই বাংলা বারো মাসের নামকরণ করা হয় ২৭ টি উল্লেখযোগ্য নক্ষত্রের মধ্য থেকে ১২টি নক্ষত্রের নামানুযায়ী। যেমন- বৈশাখ মাসের নাম এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে, জ্যৈষ্ঠ মাসের নাম এসেছে জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্র থেকে।
আমাদের দেশে বাংলা সন বস্তুতপক্ষে প্রচলিত হয় ১৫৭৬ সাল থেকে যখন স¤্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বঙ্গ জয় করেন। মুঘল শাসনের অব্যবহিত পূর্বে সুলতানি আমলে এদেশে প্রচলিত ছিল হিজরি সন। আজ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। বাংলা সন গণনার ঐতিহ্য শুরু মাত্র ৪৪৫ বছর আগে থেকে। স¤্রাট আকবর এই চান্দ্র মাসের পাশাপাশি একটি সৌর সনও প্রচলন করতে চেয়েছিলেন খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। কিন্তু তিনি তা করতে পারেন নি। যেমন তিনি পারেননি তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম ‘দীন-ই-ইলাহী’কে প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু বাংলা ফসলি সনের প্রবর্তন তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের রাজত্বকালের এক মহান কীর্তি। যে বাংলা সন তার সকল ঐতিহ্য এবং মহিমা নিয়ে আজও বিপুল বৈভবে টিকে আছে।
লেখক: গবেষক, প্রাক্তন অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়