বাংলা ভাষাপ্রেমী

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

ফারদিন শামস তিমির:


সুলতানপুর হাইস্কুলের এক মেধাবী ছাত্র অনিক। মেধাবী মানে যে শুধু পড়ালেখায় ভালো তা নয়, সে পড়লেখাতে যেমন ভালো তেমনি সে বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকা-েও ভালো। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সে প্রতিবছরই সে সব সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে আর অনেক অনেক পুরস্কারও পায়। একবার একুশে ফেব্রুয়ারি তাদের স্কুলে উপস্থিত বক্তব্যের আয়োজন করা হয়। অনিক তাতে একেবারে খাঁটি বাংলায় বক্তব্য দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। আমরা কথা বলার সময় অনেকেই আছি যারা বিদেশী শব্দ ব্যবহার করে থাকি। চেয়ার টেবিল টাইম টিচার ভ্যালু বাট আরো কত কি। সময় সময় অনিকও তা করে। কিন্তু উপস্থিত বক্তৃতার বেলায় এমন উচ্চারণে আর এমন সুন্দর শ্রুতিমধুর বাংলা বলে যে শুনে মনে হয় যেন অনিক একেবারে নির্ভেজাল বাঙালি। সে এখন নবম শ্রেণিতে। এইতো কিছুদিন আগে স্কুলে একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান হলো। প্রতিবারের মত এবারও অনিকের সম্পাদিত দেয়ালিকা আর বক্তব্য উপস্থাপন প্রশংশিত হলো। বলতে গেলে বাংলার জন্য তার মনে যে ভালোবাসা আছে আর তা যে প্রবল তা খুব ভালো করেই বোঝা যায়। কারণ সে জানে বাংলা ভাষার জন্য কত মানুষ প্রাণ দিয়েছে। সে ইতিহাস সে যতবারই পড়ে ততবারই তার চোখ নোনাজলে ভিজে ওঠে …
এবার ডিসেম্বরেই ইংল্যান্ড থেকে অনিকের মামা এসেছে। বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আর স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করে তবেই মামা ফিরবে তার নিজ গন্তেব্যে। তাই পুরো মার্চ মাস ধরেই মামা বাংলাদেশে থাকবে। এর সাথে মুজিবর্ষের আয়োজনও আছে। মামা এ¤িœতেই রসিকে তার সাথে এত্তোসব আয়োজন, ওহ্ কিযে মজা ! অনিকের সে কথা ভাবতেই মন এক্কবারে নড়েচড়ে ওঠে। কিন্তু এবার মামা কেমন যেন পাঠদান-পাঠদার ভাব নিয়ে আছে। মামা অনিককে জিজ্ঞাসা করল, কিরে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষায় কত মার্কস পেয়েছিস ? অনিক বলল, মামা আট’শ মার্কের মধ্যে সাত’শ আশি। সেকেন্ড হয়েছি আউট অব অল সেকসন। মামা বলল, বাহ্! দারুণ তো। তোর মার্কশিটটা দেখি। অনিক মার্কশিট দেখাল। মার্কশিটে মামা দেখল সব বিষয়ে সে ফুল মার্ক পেয়েছে। তবে ইংরেজিতে পেয়েছে এক’শতে আশি। মামা বলল, বাংলা, গণিত, সমাজ, ধর্ম সবটাতেই তো দেখছি ফুল মার্কস। যেই অনিক কিছু বলবে এমন সময় মা এসে শুরু করল, তুই এখানে থাকিস না তো জানিস না যে শিক্ষকরা অনিকের কত প্রশংসা করে। আমার ছেলের প্রশংসায় সবাই এক্কেবারে পঞ্চমুখ। মামা বলল, সবাই প্রশংসা করলেও আমি ওর প্রশংসা করতে পারছি না কারণ তার উচিত ছিল সব বিষয়ের মত ইংলিসেও ফুল মার্কস পাওয়া। কিন্তু সে তা পাইনি । ও যদি ইংলিসে এমন উইক হয় তাহলে ইন ফিউচার ওর অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু সেই কষ্ট আমি ওকে পেতে দিব না। ওকে আমি ইংলিস শিখাব। এমন ইংলিস শিখাব যে ও বাংলা ভাষাকে ভুলে শুধু ইংলিসেই কথা বলবে। এই শু নে অনিক বলল, মামা আমি মানছি যে ইংরেজি জানাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু এমন ইংরেজি জানা উচিত না যে, সে বাংলাকেই ভুলে যাব। ইংরেজি জানতে হবে শিখতেও হবে আবার বলতেও হবে তবে বাংলাকে বাদ দিয়ে না। মামা বলল, ওসব চিন্তা বাদ দে। কাল থেকেই তোকে ইংলিস শিখাব। এ কথা শুনে এবার অনিক একটু ক্ষুব্ধ হলো। কিন্তু মামার মুখের উপর কোনো কথা বলতে পারল না। বাধ্য হয়েই পরেদিন থেকে সে মামার কাছে ইংরেজি শিখতে শুরু করল। আর এভাবে মামার কাছে ইংরেজি শিখে সত্যিই তার উন্নতি হতে থাকল। তবে এর ফলে তার বাংলার অবনতি ঘটল। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় সে বাংলাতে ’শ তে আটাশি পেল। কিন্তু ইংরেজিতে ’শ তে এক্কবারে ‘শ। বাংলা পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নে নাকি সে বাংলার চেয়ে ইংরেজি শব্দ বেশি ব্যবহার করেছে। এই তার মার্কস কম পাওয়ার কারণ। এই দেখুন, আমার মুখেও মার্কস ছাড়া নম্বর কথাটা সরছে না। তাহলে কি আমার ভাষা বাংলিশ হয়ে যাচ্ছে ! আসলে এ হলো শুদ্ধ বাংলা চর্চার দুর্বলতা। সে যা-ই হোক, বছর ঘুরে আবার একুশে ফেব্রুয়ারি এলো। সে এবার স্কুলে উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নিতে পারল না। কারণ তার অনেক বাংলা শব্দই এখন ইংরেজি হয়ে গেছে। বাংলা ভাষা সে প্রায়ই ভুলতেই বসেছে। সে মন খারাপ করে রাস্তা দিয়ে বাড়ি আসছিল। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ায় তার কাছে একটা কাগজ উড়ে এলো। এ কাগজে লেখা ছিল সালাম। তার মনে পড়ে গেল ভাষাশহিদদের কথা। বাংলা প্রায় ভুলে গেলেও ভাষাশহিদদের কথা মনে করে সে কেঁদে ফেললো ও মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ আরে এ-ই তো আমার শিকড় ! আমি কি শিকড়হীন হতে পারি ! তাইতো নিজের অজান্তেই মায়ের ভাষার জন্য ভালোবাসা উঠে আসে অন্তরে। মা আর মায়ের ভাষাকে ভুলে কি থাকা যায় ! থাকা যায় না। কারণ নিজের মায়ের ভাষায় যত সহজে মনের ভাব প্রকাশ করা যায় অন্য ভাষায় তা যায় না। যদি মনে যদি মায়ের ভাষার জন্য ভালোবাসা না থাকে তাহলে অনিকের মত মনোকষ্টে ভুগতে হবে। আর মনে মায়ের ভাষার জন্য ভালোবাসা থাকলে তার অন্যরকমই তৃপ্তি।