বাংলা ভাষা : নিজ গৃহে পরবাসী যেন না থাকে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২২, ৬:০৭ অপরাহ্ণ

গোলাম কবির



ভাষা আন্দোলনকে সামনে রেখে নতুন করে কোনো তথ্য অধিকারের তেমন পথ বোধকরি বেশি খোলা নেই। তবে সত্যিকথা বলতে কি এ নিয়ে প্রায় শতাব্দীকাল ধরে আমরা যত কথা বলেছি, তত কাজ হয়নি। যদিও বিস্ময়কর সত্য, বাংলাভাষার মাহার্ঘ্যইে বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্রের জন্ম। আমাদের অপবাদে দণ্ডিত করা হয়, আমরা যত কথা বলি, কাজের বেলায় লবডঙ্কা অর্থাৎ ফাঁকি বাজি। একুশকে একটা উৎসব ঠাওরে গতানুগতিক বক্তৃতা মঞ্চে অবতীর্ণ হই এবং আসর গুলজার করি। ভুলে যাই প্রত্যুষে মগ্নপদে প্রভাতফেরীর শপথ।
একটি জাতির জীবনে মাতৃভাষা কি পরিমাণ শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের ভাষা আন্দোলন তা দেখিয়ে দিয়েছে। উনসত্তুর বছর আগে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে হিসেব করে এর বয়স যে ভাবেই নির্ণয় করিনা কেন, এর শেকড় বৈদিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। বেদের ভাষা সাধারণের নয় বলে ফতোয়া দিয়ে ভাষাটি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিলো। তাই সাধারণ মানুষ দীর্ঘসময় দাসত্ব বরণ করতে বাধ্য হয় বিষয়টিকে নিয়তি নির্দেশিত বলে মেনে চলেছে। অথচ অন্যান্য ধর্মে তেমনটি প্রতিবদ্ধকতা ছিলো না। ধর্মগ্রন্থ নয়, আমাদের জীবনগ্রন্থ থেকে বাংলভাষাকে বিচ্ছিন্ন করার অপপ্রয়াস হয়েছে যুগে যুগে। আমাদের জীবনের চারপাশের অনেক কিছুই মাতৃভাষার মাধ্যমে চর্চার অধিকার আমরা পাইনি। রক্তের দামে মাতৃভাষার অধিকারের সাথে বাংলা নামের দেশটিও আমাদের হয়ে গেল। সারা বিশ^ বুঝলো মাতৃভাষার শক্তি কত অপরিমেয়। আজ সেই ভাষা নিজ গৃহে পরবাসী।
পূর্ববাংলার মানুষের সমর্থনে পাকিস্তান নামক উদ্ভট রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পাকিস্তানিদের কৌটিল্যে বাংলাভাষাকে তুচ্ছ প্রমাণিত করার জন্য তারা এবং স্বার্থান্ধ কিছু বাঙলাভাষী মানুষও এক সাথে ঘোঁট বাঁধে। আমাদের দামাল শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইতিহাসের স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করে। যা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ^ময় ছড়িয়ে গেছে।
মাতৃভাষার অযুত কোটি শক্তির পথ ধরে বাংলাদেশের জন্ম। ভাষার জন্য প্রাণ দিতে গিয়ে যে রক্ত দিয়ে প্রদীপ জ¦লেছিলো, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তা ‘ছড়িয়ে গেল সবখানে।’
নানা চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে ভাষার সড়ক রেখে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলাভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন। ভিনদেশি এবং অপরভাষায় পারদর্শীরা এদেশের মানুষের জন্য মাতৃভাষার শক্তিকে পর্দার আড়ালে আচ্ছন্ন রেখেছিলো, বঙ্গবন্ধু সে তিমির দুয়ার খুললেন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমহিমায় অধিষ্ঠিত করার পথ অর্গলমুক্ত করার প্রায় সবকাজ তিনি সমাপ্ত করে এনেছিলেন। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুকে প্রায় সপরিবারে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। পাকিস্তানি ভূতেরা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিকতার দোহাই দিয়ে জোরেশোরে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার শুরু করলো। প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য শ্লোগান জয় বাংলাকে পাকিস্তানি আদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বানালো হলো। শুরু হলো বাঙালির কাঁধে সিন্দাবাদের ভূতের আসর। বাংলাদেশ বিমান আর বাংলাদেশ বেতার পাকিস্তানি কায়দায় আয়ত্তে নিয়ে যাবার প্রকাশ্য পদক্ষেপ নেয়া হলো। তখনো অফিস-আদালতে পাকিস্তানি ফরমাবারদারগণ পুরোপুরি বাংলা ব্যবহারে অনীহা ছিলো। সুযোগ বুঝে এরাই শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজির প্রাধান্য চাপিয়ে দিলো। অলিতে-গলিতে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মৌজ শুরু হয়ে গেল। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলো চমক লাগানো বিজ্ঞাপন দিয়ে ইংরেজি হজম করার কৌশল শিখিয়ে স্বর্গের হাতছানি দেয়ার তেলেসমাতি কাজ দেখাতে লাগলো। দুঃখের বিষয় এখানকার অধিকাংশ পড়ুয়া সত্যিকার ইংরেজি তো শিখলোই না, পক্ষান্তরে বাংলা বর্ণমালাও অনেকে ভুলতে বসলো। অথচ বিশে^র অনেক উন্নত দেশ মাতৃভাষা ছেড়ে ইংরেজি ভাষার প্রতি প্রলুব্ধ হয়নি। জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ উন্নত সংস্কৃতিতে তারা পিছিয়ে নেই। ইয়োরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে কাজের সন্ধানে গেলে ইংরেজি জানা আবশ্যক; কিন্তু সুইজারল্যান্ডে স্থায়ী নাগরিক হতে ইচ্ছুকদের অবশ্যই সুইস ভাষা শিখতে হবে। মাতৃভাষার প্রতি কী মহান শ্রদ্ধাবোধ!
প্রায় সোয়াদুশো বছরের দাসত্ব আমাদের অস্থি-মজ্জাকে এমনিভাবে নিষ্ক্রিয় করেছে যে, মাতৃভাষা শক্তির প্রতি আমরা বিশ^স্ত হতে পারিনি। বৃটিশ আমলারা ইংরেজির প্রসার ঘটালেও বাংলাকে অবজ্ঞা করেনি। দুঃখের বিষয় তাদের পদলেহী উত্তরসুরি আজিজ আহমেদরা বাংলার মানুষের মূল্য তো দেয়নি, বাংলাভাষার প্রতি প্রকাশ্যে ঘৃণা প্রকাশ করেছে। পক্ষান্তরে বৃটিশরা আমলাদের দেশীয় ভাষা শেখাবার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। ইংরেজি ও অন্যান্য অপরভাষার মাহাত্ম্য প্রচার যে প্রকারান্তরে সৌখিন দাসত্ব তা আমরা আমলে আনিনা। বরং বিদেশে কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে আমাদের সন্তানদের বলি দিচ্ছি। আমরা দেদারসে দুর্নীতি করে পয়সার ওমে সতেজ হয়ে সন্তানদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে উৎসাহিত করছি। মানবতা, মনুষ্যত্ব আর সৌভ্রাতৃত্বের বুলি কাগজের পাতায় আবদ্ধ থাকছে। জীবনকে স্বকীয়তা থেকে করছে বঞ্চিত। এখনও সে প্রবণতা কম নয়। তবে ৪০/৫০ বছর ধরে যারা পরবাসে তাদের অনেকে ঘরে ফেরার জন্য উন্মুখ; কিন্তু ফেরার পথে অনেক বাধা। তাদের সন্তানরা রবীন্দ্রনাথের ‘স্বপ্ন’ কবিতার ব্যাকুল নায়কের মত উচ্চারণ করছে ‘সেভাষা ভুলিয়া গেছি।’
সময় ফুরিয়ে যায়নি। আমরা কেবল আড়ম্বর না দেখিয়ে মাতৃভাষার শক্তির প্রতি মনোযোগ ফেরাতে পারি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়গুলো মাতৃভাষার আওতায় এনে মেধাবীদের অধিকতর মেধার স্বাক্ষর রাখার জন্য আহ্বান জানাই। তারা মাতৃভাষার শক্তি প্রতিফলনে কবি মধুসূদনের মত আক্ষেপ প্রকাশ করে শপথ নিন:
নিজাগারে ছিল মোর অমূল্য রতন
অগণ্য; তা সবে আসি অবহেলা করি,
অর্থলোভে দেশে দেশে করিনু ভ্রমণ…

(‘কবি-মৃতৃভাষা’, চতুর্দশপদী কবিতাবলী, মাইকেল মধুসূদন গ্রন্থাবলী-২) আর নয়, এবার দেশের প্রতি, মাতৃভাষার শক্তির প্রতি দৃঢ় মনোযোগ দেই, যেন আমাদের দুঃখিনী বর্ণমালা নিজগৃহে পরবাসী না থাকে। সেই সাথে শপথ নেই বিশ^মানের শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অধোগামিতার অপবাদ মুক্ত করতে।
লেখক: সাবেক শিক্ষক রাজশাহী কলেজ