বাগমারায় অবাধে চলছে ড্রামচিমনির ইটভাটা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৭, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

রাশেদুল হক ফিরোজ, বাগমারা



রাজশাহীর বাগমারায় আইনের তোয়াক্কা না করে অধাধে চলছে ড্রামচিমনির ইটভাটা। পরিবেশের জন্য ওইসব ইটভাটা হুমকি হওয়ায় সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন লোকজন। চারপাশের পরিবেশ দূষণের মধ্যে ফেলে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বাগমারা উপজেলায় দিব্যি চলছে ড্রামচিমনিওয়ালা ১২টি ইটভাটা। নীতিমালা লঙ্ঘন করে লোকালয় ও কৃষি জমিতে গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার গোবিন্দপাড়া, নরদাশ, শুভডাঙ্গা ও আউচপাড়া ইউনিয়নের জনবসতি এলাকায় এবং কৃষিজমির পাশে প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা। ভাটাগুলোতে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। শ্রমিকরা জানান, এসব ভাটায় কয়লা ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাই সারা বছর কাঠই পোড়াতে হয়। ভাটাগুলোর পাশে রয়েছে ফলের বাগান, আলু ও ধান খেতসহ বিভিন্ন আবাদ। ভাটাগুলোর ১শ থেকে ১৫০ গজের মধ্যে রয়েছে জনবসতি। টিনের ড্রামচিমনি দিয়ে কাঠ পোড়ানোর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে লোকালয়ে। অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী, আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ থাকলেও তারা সে গুলো কর্ণপাত না করেই গড়ে তুলেছেন ওই ইটভাটাগুলো।
ওইসব এলাকার স্থানীয় ৩০ থেকে ৪০ জন বাসিন্দা ও উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, সাত-আট বছর ধরে স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি অনুমোদন ছাড়াই লোকালয় ও আবাদি জমির পাশে ইটভাটা স্থাপন করে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। ড্রামচিমনিওয়ালা এসব ইটভাটার মালিকেরা হলেন, সুজন পালশার মোয়াজ্জেম হোসেন, বাইগাছার আবদুস সালাম, বানাইপুরের রশিদুল ইসলাম, শালমারার আফসার আলী, বাকশইলের আমিনুল ইসলাম, গোবিন্দপাড়ার উকিল চান, পাশুড়িয়ার আবদুস সামাদ, জয়পুরের আবুল কাশেম, মনোপাড়ার রাজা মিয়া, বামনী গ্রামের দুলাল হোসেন, বানইলের আবদুস সালাম ও মজোপাড়ার বুলু মিয়া। তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে ভ্যাট ও ট্যাক্স না দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
সুজনপালশার দেছের আলী, অভ্যাগতপাড়ার আবদুল জব্বার অভিযোগ করে বলেন, কৃষিজমিতে বা জমির পাশে এসব ইটভাটা স্থাপন করায় তাদের ফসলের ক্ষতি হয়। ভালো ফলন পাওয়া যায় না। এসব ইটভাটার মালিকেরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় গ্রামবাসী প্রতিবাদ করতেও সাহস পান না।
তবে ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল রাজশাহী পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শক মকবুল হোসেন বাদী হয়ে উপজেলার বাকশাইল, সুজনপালশা, বাইগাছা, জয়পুর, গোবিন্দপাড়া, শালমারা ও পাশুড়িয়া এলাকার সাতটি ইটভাটার মালিকের বিরুদ্ধে পৃথক সাতটি মামলা করেন। মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন বলে জানান রাজশাহী পরিবেশ অধিফতরের একজন পরিদর্শক। ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা হলেও ভাটাগুলো বন্ধ না করে চলছে ইট তৈরী ও পোড়ানোর কাজ।
এলাকার লোকজন জানান, অবৈধ ইটভাটার মালিকেরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেছে। যার কারণেই প্রশাসন ওই সকল ইটভাটার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।
কৃষকদের এসব অভিযোগ সঠিক হিসেবে উলে¬¬খ করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান বলেন, কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন করা ঠিক না। ফসলি জমির পাশে ইটভাটা স্থাপন করায় ফসলের উৎপাদন ব্যাপক হারে কম হয়েছে। ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে এসব সকল বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম হেলাল বলেন, সমিতিভুক্ত ২৭টি ইটভাটার প্রত্যেকটি বছরে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা করে ভ্যাট পরিশোধ করছে। কিন্তু অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ওই ১২টি ইটভাটার মালিকেরা কোনো ভ্যাট বা ট্যাক্স দেন কীনা আমার জানা নেই। ওইসব ইটভাটায় ইট পোড়াতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করা হয়।
ড্রামচিমনিওয়ালা ইটভাটার মালিক রশিদুল ইসলাম ও আবদুস সালাম অনুমতি ছাড়াই ইটভাটা স্থাপন এবং কাঠ পোড়ানোর অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, থানার পুলিশসহ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেই তারা ইটভাটা চালাচ্ছেন। তবে প্রশাসন বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন তা পরিষ্কার করেন নি। রাজশাহী কাস্টমস এক্সসাইজ ও ভ্যাট কার্যালয়ের ডেপুটি কমিশনার রুহুল আমিন বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের রাজশাহীর উপপরিচালক মামুনুর রশিদও ড্রামচিমনির ইটভাটা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে স্বীকার করে বলেন, বাগমারা এলাকায় গত শুক্রবার অভিযান চালানো হয়। কিন্তু কোনো ড্রামচিমিনর ইটভাটা সেখানে পাওয়া যায় নি। শুধু ফিক্সড চিমিনির ইটভাটা দেখা গেছে বলে তিনি জানান।
বাগমারা থানার ওসি সেলিম হোসেন বলেন, এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব সংশি¬ষ্ট বিভাগের। তবে কোনো বিভাগ পুলিশের সহযোগিতা চাইলে তা দেয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ