বাঘায় খেজুর গুড়ের পাটালি তৈরিতে ব্যস্ত গাছিরা

আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০১৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা



অগ্রাহায়ণে শীতের আগমনে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গ্রামে গ্রামে গাছিরা মৌসুম চুক্তিতে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। প্রতিদিন সকালে খেজুরের রস জ্বালিয়ে পাটালি বানানোর ধুম পড়েছে। উপজেলার বাজারগুলোতে বছরের প্রথম খেজুরের পাটালি বিক্রি হতে দেখা যায়। দামও বেশি প্রতি কেজি পাটালি ৮৫ টাকা থেকে ৯৫ টাকা।
উপজেলায় আগের মতো সারি সারি খেজুর গাছ নেই। যে গাছগুলো রয়েছে তা গাছিরা কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকেই কাটা শুরু করে। বিভিন্ন কারণে এলাকার গাছিরা এখন আর এই পেশাতে নেই বললেই চলে। উৎপাদন ও বিক্রি প্রতিযোগিতায় বহিরাগত গাছিদের সঙ্গে টিকতে না পেরে স্থানীয় গাছিরা অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েছে। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ খেজুর গাছ। গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিক উৎসব শুরু হয় খেজুর গাছকে ঘিরে। শীত এগিয়ে আসছে। অযতœ ও অবহেলায় বেড়ে উঠা খেজুর গাছের কদরও বাড়ে শীত এলেই। খেজুর গাছ সুমিষ্ট রস দেয়। রস থেকে তৈরি হয় গুড় ও পাটারি। যার সাদ ও ঘ্রান আলাদা। পুরো শীত মৌসুমে চলে এর পিঠা-পুলি আর পায়েস খাওয়ার পালা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার দুইটি পোৗরসভা ও সাতটি ইউনিয়নে প্রায় ৩০ হাজার ৩৮৯ কৃষি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার খেজুরের বাগান রয়েছে। এছাড়া সড়ক পথ, রেল লাইনের ধার, পতিত জমি, জমির আইল ও বাড়ির আঙ্গিনায় রয়েছে প্রায় দেড় লক্ষাধিক খেজুর গাছ। একজন ব্যক্তি প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫৫টি খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে পারে। এরকম চার হাজার ব্যক্তি রয়েছে। মৌসুমী ভিত্তিক চার হাজার পরিবার খেজুর গাছের ওপর নির্ভরশীল। একজন গাছি এক মৌসুমে অর্থাৎ ১২০ দিনে একটি গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ কেজি গুড় পেয়ে থাকেন। খেজুর গাছ ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। এ গাছের জন্য বাড়তি কোন খরচ করতে হয় না। ঝোপ-জঙ্গলে কোন যতœ ছাড়াই বড় গয়ে ওঠে। শুধুমাত্র মৌসুম এলেই নিয়মিত গাছ পরিস্কার করে রস সংগ্রহ করা হয়। রস, গুড়, পাটারি ছাড়াও খেজুর গাছের পাতা দিয়ে মাদুর তৈরি ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। পরিকল্পিত ভাবে খেজুর গাছ বৃদ্ধি করা হলে দেশের গুড় পাটালীর চাহিদা মেটানোর পর বিদেশেও রফতানি করা হলে অর্থ উপার্জন করার সুযোগ রয়েছে।
পাবনা থেকে আসা গাছি আবুল হোসেন বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো খেজুর গাছ নেই। শীত মৌসুমে আমরা আড়ানী ও বাউসা এলাকায় এসে ৩ থেকে ৪ মাসের জন্য খেজুর গাছ ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকায় চুক্তি নিয়ে রস সংগ্রহ করি। এগুলো গুড় তৈরি করে হাট বাজারে বিক্রি করি। এবার ১২০টি গাছ চুক্তি নিয়েছি। এ গাছগুলো আমরা দুই জনে রস সংগ্রহ করি। সংসারে ৬ সদস্যের পরিবার। এর ওপর ৩ থেকে ৪ মাস ভালোভাবে চলবে। অন্য সময়ে অন্যের জমিতে কাজ করি। কাজ না থাকলে শহরে রিক্সা চালিয়ে সংসার চালায়।
আড়ানী হামিদকুড়া গ্রামের গৃহকর্তী কাজলী বেওয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমার চার কন্যা ও দুই ছেলে। সবাইকে বিয়ে দিয়েছি। শীত এলেই জামাই-কন্য, নাতী-নাতনী, ছেলেদের শশুর-শাশুড়ী ও আত্মীয়দের নিয়ে ২/১ বার উৎসবের আয়োজন করি। এ প্রথাটা আমার শশুর-শাশুরীর আমল থেকে চলে আসছে। তাই আমিও করি। নিজের প্রায় ১৫ থেকে ২০ টার মতো খেজুর গাছ রয়েছে। এ গাছ থেকে নিজের বাড়িতে খাওয়া হয়। সংসারে কিছু কাজে লাগে।
হামিদকুড়া গ্রামের গাছি সোহেল রানা বলেন, আর কয়েকদিন বাদেই পুরোপুরিভাবে সংগ্রহ করা হবে খেজুর রস। আগের মতো গ্রামে গ্রামে শীতের সন্ধ্যায় সাজো রস খাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। গ্রামীণ সন্ধ্যাকালীন জীবন বড়ই আনন্দের হয়ে উঠবে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দিলীপ কুমার সরকার বলেন, শুধু সরকারি ভাবেই না, আমরা কৃষকদের মাঝে খেজুর গাছ লাগানো জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। যা কৃষকদের মাঝে রস ও গুড়ের চাহিদা মিটাবে। এছাড়া আখের পাতা ও গমের কুড়া সংগ্রহ করার পরামর্শ দিয়ে থাকি যেন, গুড় তৈরিতে সহজ হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবিনা বেগম বলেন, কৃষকদের পতিত জমিতে খেজুর গাছ রোপণ করার পরামর্শ দেয়া হয়। ইতোমধ্যে অনেকে নিজ নিজ পতিত জমিতে গাছ রোপণ করছেন। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে এই মৌসুমে বিদেশে রফতানির পরিকল্পনা আছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ