বাঘায় পদ্মার ভাঙন || ঠিকানার সন্ধানে ছুটছে দুই শতাধিক পরিবার

আপডেট: আগস্ট ২৩, ২০১৭, ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা


পদ্মায় অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়েছে বাঘার দুই শতাধিক পরিবার। ঘর-বাড়ি গুছিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন তারা। উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি চরের মানুষ এখন ঠিকানার সন্ধানে ছুটছেন।
গত সোমবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের কালিদাশখালি চরের রফাজ ব্যাপারি, হাজেরা, আবেদ আলী, ছাইফুল ইসলাম, বালেজ সেখ, তরিকুল ইসলামসহ ১৭ পরিবার ভিটেমাঠি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। তাদের মতো ভাঙন আতঙ্কে ঠিকানা খুঁজছেন চকরাজাপুর চরের আরো অর্ধশতাধিক পরিবার। ঠিকানা হারিয়ে কোথায় যাবেন তা নিয়েও দুঃচিন্তা তাদের। পানিবন্দি হয়ে গবাদী পশু নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন কালিদাখালি চরের জহুরুল ইসলাম, সাইফুল মোল্লা, আদম আলী, নার্গিস বেগম, নুরজাহান বেগম, আতরশি বেগম, সোনাভান বেগম, চকরাজাপুর চরের সিদ্দিক মোল্লা, মান্নান শেখ, আজিজ মেলেটারি, জয়নাল হোসেন, শাহীন হোসেন, নিহাজ মোল্লা, মজিদ মোল্লা, আমজাদ হোসেন, আকরাম হোসেন, ফেদু সরকার, জয়নাল সরকার, পলান হোসেন, সুবান আলী, ইয়াকুব আলী, ইকরাম হোসেনসহ চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, চকরাজাপুর, পলাশি ফতেপুর, ফতেপুর পলাশি, লক্ষীনগর, চকরাজাপুর, পশ্চিম চরকালিদাস খালী, পূর্ব চকরাজাপুর, জোতাশি, মানিকের চর, লক্ষিনগর, টিকটিকিপাড়া, দিয়াড়কাদিরপুর, নওশারা-মহদীপুর চরের তিন শতাধিক পরিবার। বাড়ি-ঘরে ছুঁই ছুঁই পানির আতঙ্কে রয়েছে আরো দুই শতাধিক পরিবার।
প্রমত্তা পদ্মার ফুলে ফেঁপে ওঠা পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাঙছে পদ্মার পাড়। পদ্মার আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউয়ে প্রায় আট কিলোমিটার পাড় ভেঙে চকরাজাপুর ও পাকুড়িয়া ইউনিয়নের কয়েক শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভেসে গেছে গাছপালা। আর ৫০ গজ ভাঙলেই পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর নাপিতের মোড় ও কিশোরপুর এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে গিয়ে ঠেকবে ভাঙন। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে পদ্মা পাড়ের পাঁচ শতাধিক পরিবার। তবে ভাঙন রোধে কোন তৎপরতা দেখা যায় নি।
স্থানীয় সবুর মল্লিক ও লিটন আলী জানান, নদী তীরবর্তী বাঁধের পশ্চিমপাড় থেকে এ ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে হাশেম আলী, নয়ন মন্ডল, শুকুর মন্ডল, সোবহান মল্লিক, আলাল মল্লিক, ছারাতুল্লাহ মন্ডল ও ফরাতুল্লাহ মন্ডলের আবাদি জমি ভাঙনে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। তাদের দাবি, নদী ভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে অরক্ষিত এলাকার আরো অনেক জমি ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
চকরাজাপুর চরের মোস্তাক আহম্মেদ শিকদার বলেন, গত কয়েক দিনে রাক্ষুসী পদ্মা গিলেছে বিঘার পর বিঘা ধান, পাট, আবাদি জমি ও গাছপালা। ভাঙনের শিকার এইসব মানুষদের সহযোগিতা তো দূরের কথা শান্তনা দেবার মতোও কেউ নেই। বারবার সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ভাঙন ঠেকানোর আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয় নি। সেই ভোটের সময় দেখা হলেও সবহারা এসব মানুষের এই মহাবিপদে এখন পর্যন্ত পাশে কেউই দাঁড়ায় নি। অব্যাহত ভাঙন থেকে বাড়ি-ঘর সরানোর তাড়ায় এসব পরিবারের ভালো খাবারের নিশ্চয়তাও নেই।
পূর্ব চকরাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেওয়ার শওকত জামান বলেন, ফসলি জমিসহ গাছ-পালা, বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছে দুই শতাধিক পরিবার। তারা এখন ঘরবাড়ি শরাতে ব্যস্ত। তবে তাঁর বিদ্যালয়টিও হুমকির মধ্যে রয়েছে। ইতেমধ্যে বিদ্যালয়টি দুইবার স্থানান্তর করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
চকরাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুল আযম বলেন, প্রতি বছর ভাঙ্গনে ভূমিহীন হয়ে পড়ছে নদী তীরের অনেক মানুষ।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী হালিম সালেহী বলেন, আউটসাইড ছাড়া বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে কাজ চলছে। বাঘা উপজেলায় বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টে খুব শীঘ্রই কাজ শুরু হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ