বাঘায় স্কুলছাত্র নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশের হাবিলদার বরখাস্ত

আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০১৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

বাঘা প্রতিনিধি
রাজশাহীর বাঘায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে রশি দিয়ে বেঁধে পা উপরের দিকে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতনে অভিযুক্ত সেই পুলিশের হাবিলদারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশের উর্দ্বোতন কর্তৃপক্ষ তাকে এ সাসপেন্ড করে। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল সরেজমিনে বেরিয়ে আসে নির্যাতনের কাহিনী।  সেই নির্যাতনের বিভৎস কাহিনীর বর্ননা দিলো ওই শিক্ষার্থী নিজেই। শিক্ষার্থীর নাম মনিরুল ইসলাম। সে নারায়নপুর গ্রামের মিঠু প্রামানিকের ছেলে এবং বাঘা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।
নির্যাতনের শিকার মনিরুল জানায়, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে র‌্যাকেট খেলার কোর্ট কাটবে মর্মে নারায়নপুর মাছ বাজারে বন্ধু শাওনকে ডাকতে গিয়েছিল সে। একই সময় ছুটিতে বাড়িতে আসা রাজশাহী পুলিশ লাইনের হাবিলদার হাফিজুর রহমান জিল্লু’র মাছ বাজারে একটি মোবাইল ফোন হারিয়ে যায়। সেখানে ছিল কয়েকজন যুবক। পরে মোবাইল চোর সন্দেহে পুলিশের হাবিলদার হাফিজুর রহমান জিল্লুর, তার ভাই মহিবুল ইসলাম, অন্য আরেক ভাই সেনা সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন তাকে মোটরসাইকেলে তুলে নারায়নপুর বাজারে নিয়ে যায়। সেখানে মনিকা সিনেমা হলের সামনে মোবাইল ও ফ্ল্যাক্সিলোড ব্যবসায়ী আনারুলের দোকানের সামনে ধরে রাখা হয়। এরপর বাজারের একটি দোকান থেকে নতুন রশি কিনে আনে তারা। ওই রশি দিয়ে শিশু শিক্ষার্থীর দুই পা বেঁধে ফেলে। এসময় মোবাইল বিষয়ে কিছু জানে না বললেও মনিরুলকে মুখের ওপর ঘুষি মারা হয়। মনিরুল কাঁদতে কাঁদতে আবারো একই কথা বললেও তারা কোন কথা শুনে নি। এরপর প্রায় দেড় হাত দৈর্ঘ্যর একটি বাঁশ এনে পেটানো হয়। তাতেও হাবিলদার ও তার সহযোগীরা ক্ষান্ত হয় নি। তারপর দোকানের কাঠের তীরের সাথে পা উপরের দিকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো হয়। প্রকাশ্যে বাজারে এ ঘটনার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে মানুষ। কিন্তু নির্যাতনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রথমদিকে কেউ এগিয়ে আসতে সাহস পায় নি। কিন্তু নির্যাতনের দৃশ্য সইতে না পেরে একত্রিত হয়ে বাজারের লোকজন নির্যাতনকারীদের ধাওয়া করে। সেসময় হাবিলদারের মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। এরপরে বাজারের লোক তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এসব ঘটনাগুলো যখন মনিরুল বর্ননা করছিলো তখন মনিরুলের কন্ঠ ভারী হয়ে যাচ্ছিলো। সে বার বার দাবি তুলছিলো পুলিশ আর প্রভাবশালী যাই হোক না কেন এর সুষ্ঠ বিচার যেন হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী পলাশ হোসেন, পিন্টু হোসেন, রাজা হোসেন, লুৎফর ও তুর্য বলেন, সেখানে এ দৃশ্য দেখে তারাসহ বাজারের লোকজন নির্যাতনকারীদের ধাওয়া করে। বিক্ষুব্ধ জনতার ধাওয়ায় মটোরসাইকেল ফেলে নির্যাতনকারীরা পালিয়ে যায়।
মনিরুলের মা আবেদা বেগম ছেলের নির্যাতনের বিচার দাবি করেন বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি করে। আমার তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে ঢাকায় এক কোম্পানিতে নিয়োগ হয়েছে। আগামী সপ্তাহে যোগদান করবে। মনিরুল তাদের মধ্যে মেজো। ছোট ছেলে কেজি স্কুলে পড়ে। তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে এ কাজ করতে পারে না।
বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আলী মাহমুদ বলেন, খবর পেয়েই পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে মোটরসাইকেলসহ জিল্লুরকে আটক করা হয়। তবে অন্যরা আতœগোপন করেছে। এ ঘটনায় ছাত্র মনিরুলের মা বাদি হয়ে মামলা করেছেন। এদিকেই আটককৃত হাবিলদারকে মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আলী মাহমুদ আরও বলেন, বাকি দুই আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে খবর পেয়েছি সেনা সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন যশোর ক্যান্টনমেন্টে যোগদান করেছেন। তার ব্যাপারে আমরা সেনাবাহিনীতে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। তিনি ল্যান্স কর্পোরাল পদে সেখানে কর্মরত আছেন।
উল্লেখ্য, রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় মোবাইল চুরি সন্দেহে মুনিরুল ইসলাম (১৩) নামে এক স্কুলছাত্রকে দোকানের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার (২৪ অক্টোবর) বাঘা উপজেলার নারায়ণপুর বাজারের মনিকা সিনেমা হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। বাজারের লোকজন ওই ছাত্রকে উদ্ধার করে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।  বর্তমানে মনিরুল বাঘা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় মনিরুলের মা আবেদা বেগম থানায় মামলা করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ