বাঘায় ১৫ চরে এক সপ্তা ধরে পানিবন্দি দুই হাজার পরিবার || ত্রাণ পান নি অধিকাংশ মানুষ

আপডেট: আগস্ট ২১, ২০১৭, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা


রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার ১৫টি চরের প্রায় দুই হাজার পরিবার এক সপ্তা ধরে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানিবন্দি দুই শতাধিক পরিবারের মাঝে কিছু ত্রাণ বিতরণ করা হলেও বাকি প্রায় এক হাজার ৮শ পরিবার এখনো ত্রাণ পায় নি। ফলে ত্রাণের অপেক্ষায় তারা প্রহর গুণছেন।
শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, দিয়াড়কাদিরপুর একটি চর। এই চরে শরিফুল ইসলাম, করিম মোল্লা, জাহাঙ্গীর হোসেন, হাফিজুর রহমান, সাবিরুল ইসলাম, আবেদ আলী, আজিজুল ইসলাম, কালাম মোল্লা, কাদের মোল্লা, আনিসুর মোল্লা, আবু সামা, আবদুর রাজ্জাক, কালাম হোসেন, সিদ্দিক হোসেনসহ ১৯টি পরিবার বসবাস করে। এক সপ্তা যাবত তারা পানিবন্দী হয়ে আছেন। তাদের মতো আরো ১৪টি চরের মানুষের একই অবস্থা। তাদের বের হওয়ার কোন পথ নেই। তারা এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি যেতে পারছে না। টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ডিঙ্গি নৌকা। এই নৌকায় এক জনের বেশি ওঠা যায় না। এভাবে তাদের চলছে এক সপ্তা যাবৎ। আশেপাশে কোথাও বাজারও নেই। বাজার অনেক দূর, যেতে হলেও একইভাবে যায়। তাদের আয়ের উৎস কৃষি কাজ। বর্তমানে চারদিকে পানি। বাড়িসহ সব জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। পানি ওঠার কারণে তাদের কোন কাজ নেই। তবে এর মধ্যে কেউ কেউ মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে। পদ্মার ১৫টি চরে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে দিয়াড়কাদিপুর চরে ১৯টি পরিবারে জনসংখ্যা অর্ধশতাধিক। তারা প্রায় প্রতিটি পরিবারই অন্যের জমি বাৎসরিক ভাড়া নিয়ে বাড়ি করে বসবাস করে। ২০ কাঠা জমি এক বছরের জন্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা থেকে ছয় হাজার টাকা।
এই চরে বসবাস করে চকরাজাপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জালাল উদ্দিন। বাড়িতে পানি উঠায় তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাঘা উপজেলার পানিকামড়া গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে উঠেছে। এই চরে সাবিরুল ইসলাম বলেন, আমি, স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে অন্যের কাছে থেকে জমি ভাড়া নিয়ে দুইটি ঘর তৈরি করে বসবাস করছি। তারপর পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে পানি উঠেছে। বর্তমানে দুইটি ছাগল ও দুইটি গুরু নিয়ে বিপদে আছি। তার স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ঘরে চাল ছিল না। উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা একটি বস্তার প্যাকেট দিয়েছে। এতে চাল, চিড়া আর গুড় ছিল।  এই দিয়ে চার সদস্যের পরিবার চলছে। এখন পানি উঠায় কৃষি কাজ নেই। তাই কোনো কোনো সময়ে জাল দিয়ে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে। যে টাকা হয় এই দিয়ে কোনো রকম সংসার চলছে।
চকরাজাপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জালাল উদ্দিন বলেন, আমি ২০১৬ সালে সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। চলতি বছরে আমাদের মাধ্যমে কোন সরকারি সহযোগিতা পায় নি। তবে ইউএনও স্যার কিছু সহযোগিতা করেছেন। পদ্মার চরের মধ্যে দিয়ারকাদিরপুর, টিকটিকিপাড়া চরসহ চকরাজাপুর ও কালিদাসখালির কিছু অংশ নিয়ে চকরাজাপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড গঠিত। এই ওয়ার্ডে পরিবার রয়েছে প্রায় তিন শতাধিক। ভোটার রয়েছে এক হাজার ৩৫ জন। চরের মধ্যে আমার ওয়ার্ড অধিকাংশ ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি ডুবে গেছে।
চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিযুল আযম বলেন, পদ্মার চরের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। এছাড়া এক নম্বর ওয়ার্ড অন্যান্য ওয়ার্ডের চেয়ে নিচু। ফলে পানি উঠেছে। চরের অধিকাংশ বাড়ির পাশে পানি এসেছে। কিছু কিছু বাড়ি ডুবেও গেছে। এছাড়া সিংহভাগ জমির ফসল পানির নিচে।
উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে চর এলাকা পরিদর্শন করে কিছু দুস্থদের ত্রাণ হিসেবে সহযোগিতা করা হয়েছে। আবারও বরাদ্দ পেলে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা করা হবে।
এর আগে গত শনিবার উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম পরিদর্শন করে পরিবার প্রতি চাল, চিড়া, মুড়ি ও গুড় ত্রাণ হিসেবে দিয়েছেন। তারপর তারা আর কোনো সহায়তা পায় নি বলে জানান পানিবন্দি মানুষ। শনিবার বিকেল পর্যন্ত দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী মোহাম্মদ হামিদুল ইসলাম, উপজেলা পষিদের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্যানেল চেয়ারম্যান-১  বীরমুক্তিযোদ্ধা শফিউর রহমান শফি, নারী ভাইস চেয়ারম্যান ফারহানা দিল আফরোজ রুমি, চকরাজ্পাুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর আযম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী হালিম সালেহী, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম, কৃষি কর্মকর্তা সাবিনা বেগম, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার আবদুল কাদির, মৎস্য কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আহসান আরা, ওসি আলী মাহমুদসহ উপজেলার বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাগণ।
পরে বন্যায় সতর্কতার সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবেলায় চকরাজাপুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকার সুধিজনদের নিয়ে সমাবেশ করা হয়। এই সমাবেশ বক্তব্য দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামিদুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান ও প্যানেল চেয়ারম্যান-১ বীরমুক্তিযোদ্ধা শফিউর রহমান শফি, চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুল আযম প্রমুখ। এছাড়া বাল্যবিয়ে ও মাদককে না বলবো মর্মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকল শিক্ষার্থীদের শপথবাক্য পাঠ করান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ