বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখ বরণে জোর প্রস্তুতি

আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

শিহাবুল ইসলাম


রাবি চারুকলা বিভাগে বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা- সোনার দেশ

বছর ঘুরে আবারো দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ মানেই পুরাতন বছরের জীর্ণতা আর ক্লান্তির অবসান ঘটিয়ে নতুন উদ্যোমে আরেকটি নতুন বছরের সূচনা। ঐক্য আর সম্প্রীতির সেতুবন্ধনের অঙ্গীকার নিয়ে ক’দিন পরেই সারাদেশে উদযাপন হতে যাচ্ছে উৎসবটি।
অসম্প্রদায়িক চেতনায় সমগ্র বাঙালি উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা, আবেগ আর উল্লাসে উৎসবমুখর পরিবেশে মেতে উঠবে বৈশাখ বরণে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো..’ গানে বৈশাখের ভোরে জেগে উঠবে নগর-গ্রাম-মফস্বল।
পহেলা বৈশাখ মানে দিনভর বাঙালির সংস্কৃতি- পল্লিগীতি, বাউল, লালন, ভাটিয়ালি, হাছন, রবীন্দ্র-নজরুলের সঙ্গে নতুন করে পরিচয়। পহেলা বৈশাখ মানে আবহমান বাংলার পান্তা ইলিশ খাওয়ার উৎসব।
আগামী শুক্রবার বাঙালির জীবনে আসছে পহেলা বৈশাখ ১৪২৪। প্রতিবছরের মতো এবারো বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে পিছিয়ে নেয় উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী শহরের সবচেয়ে বড় উৎসবটি মতিহারের সবুজ চত্বরেই হয়ে থাকে। এছাড়া এ উৎসবকে বরণ করে নিয়ে নগরীর পদ্মার ধারে ভিড় করেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ হাতে নিয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন কর্মসূচি। বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরে বিভিন্ন সাজে সকালে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। পরে পান্তা-ইলিশ এ উৎসবে যোগ করে আরেক মাত্রা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাণের এ উৎসবকে ঘিরে নাটক, কবিতা, সংগীত ও নৃত্যের জোর মহড়া চলছে গত কয়েকদিন থেকে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন সংগঠন ও বিভাগগুলো তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে নানা বৈচিত্রের সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে।
পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদকে ঘিরে। এ অনুষদকে নিয়েই শুরু হয় দিনের প্রথম কর্মসূচি। চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী মৌমিতা চৌধুরী বলেন, বাংলা বর্ষবরণ নিয়ে তাদের প্রস্তুতির কথা। তিনি বলেন, এদিন সকালে আমাদের চারুকলা অনুষদের একটি র‌্যালি থাকবে। র‌্যালিতে ডামি, ঢোল, তবলা, একতারা, হরেক রঙের মুখ ও মুখোশ, ফুল ও পরি প্রকৃতির রঙ তুলিতে তুলে ধরার কাজ এগিয়ে চলছে।
বৈশাখকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলগুলোর সামনে পসরা সাজিয়ে বসেছেন কয়েকজন দোকানি। এখানে শাড়ি, থ্রিপিস থেকে শুরু করে রয়েছে সাজসজ্জার বিভিন্ন জিনিসপত্র। কথা হয় এখানকার এক দোকানি জালালের সঙ্গে। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখকে ঘিরে নতুন নতুন সব বাঙালির পোশাক নিয়ে এসেছি। এখানে কেনাকাটা করতে আসা বেগম রোকেয়া হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবন সংস্কৃতিতে মিশে রয়েছে। এ উৎসবকে ঘিরে সবাই এক হয়ে মিশে যায়। আর কেনাকাটা-সাজসজ্জার বিষয় তো আছেই। সবাই নতুন নতুন সাঁজে সেদিন ঘুরাঘুরি করবে। আমিও শাড়ি ও নানা ধরনের গহনা পরবো বলে ভাবছি। আর সেজন্যই এখানে হাতের কাছে পেয়ে কেনাকাটা সেরে নিচ্ছি।
বাঙালির সার্বজনীন এ উৎসবটি পালনের প্রস্তুতি চলছে সর্বত্রই। রাজশাহী নগরীতেও বৈশাখের ছোঁয়া লেগেছে। নগরীর বিপণী বিতানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন বিপণী-বিতানগুলোতে বৈশাখ উপলক্ষে তাদের বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাঁজিয়েছে। অনেক দোকানি আবার বৈশাখ উপলক্ষে তাদের পণ্যে ছাড় দিয়েছে। কয়েকদিন আগে থেকেই দোকানগুলোতে ভিড় জমতেও শুরু করেছে।
পহেলা বৈশাখে নিজেকে স্বতন্ত্র এবং নতুনভাবে উপস্থাপন করতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছে তরুণ-তরুণী, শিশুসহ ছেলে-বুড়ো সবাই। ঈদ ও পূজোর মতোই নতুন কাপড় কেনার ধুম পড়েছে দোকানগুলিতে। বাংলার ঐতিহ্য কুলা, ঢেঁকি, মাথল, ডুগি, তবলা, একতারা অংকন করা লালপেড়ে সাদাশাড়ি, ফতুয়া, পাঞ্জাবী ও গামছা কিনতে নগরীর প্রধান প্রধান মার্কেটগুলিতে তরুণ-তরুণীদের যেন ঢল নেমেছে। মাঝ বয়সিরাও পিছিয়ে নেই বৈশাখী উৎসবের আয়োজন থেকে। তারাও কিনছেন সাধ্যমত পোশাক-পরিচ্ছদ।
পহেলা বৈশাখ নিয়ে চিন্তার শেষ নেই মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজ মুন্নার। পহেলা বৈশাখ নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। প্রকাশ করে ফেলেন তার অনেক চিন্তা এ বর্ষবরণ নিয়ে। তিনি বলেন, বৈশাখে বাঙালিয়ানার সবকিছু ফুটিয়ে তুলতে আমরা অনেক কিছুই করে থাকি। এগুলোর মাধ্যমে ফুটে উঠবে বৈশাখী আমেজ। এমন চাওয়া থেকে আমরা বেশাখের প্রথম দিন মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার করে থাকি, যা বাংলার ঐতিহ্য পান্তা-ইলিশ পরিবেশনে যোগ করে নতুন মাত্রা।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একই ধরনের বৈশাখী পাঞ্জাবি তৈরি করছি। নববর্ষের দিন সবাই একই পোশাক পরে ঘুরে বেড়াবো।’
চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলা ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন কমিটির আহবায়ক ড. মো. আমিরুল মোমেনীন চোধুরী বলেন, ‘চারুকলা অনুষদ পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করতে তিন লাখ টাকার বাজেট হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রাণ কোম্পানির পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা এবং বাকিটা বিভাগ বহন করবে। তবে এই অল্প পরিমাণ টাকা দিয়ে আসলে আমাদের কাজ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে।’
জানতে চাইলে চারুকলা অনুষদের অধিকর্তা ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রথম দিনে সকাল ৮টায় সংগীত মাধ্যমে উদ্বোধন হয়ে অনুষ্ঠানের পরে ৯টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর বেলা আড়াইটায় চারুকলা অনুষদের নিজস্ব পরিবেশনায় সমবেত সংগীত, লোক সংগীত ও বাউল সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃতি, হরবোলা, অভিনয় ও ফ্যাশান শো থাকছে।
দ্বিতীয় দিনে বেলা ৩টায় সুন্দরম আবৃত্তিগোষ্ঠীর ও চারুকলার শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় নৃত্য, আবৃতি ও অভিনয়ের পাশাপাশি বিকেল ৫টায় সমান্তরাল ও অন্যান্য গোষ্ঠীর পরিবেশনায় ব্যান্ড সঙ্গীত অনুষ্ঠিত হবে। তৃতীয় দিন বেলা সাড়ে ৩টায় চারুকলার শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা এবং ‘আধাঁরের মুসাফির’ যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে।
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও হাতে নিয়েছে নানা প্রস্ততি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘এদিন সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে থেকে এক মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হবে। পরে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ শেষে নিজ নিজ বিভাগের আয়োজনে আমরা যোগ দেব।’
তবে বিকেল ৫টার মধ্যে সকল বিভাগকে অনুষ্ঠান শেষ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন ছাত্র উপদেষ্টা।
এদিকে প্রতিবারের ন্যায় এ বছরও রাজশাহী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বাংলা বর্ষবরণে তিন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জোটের সহ-সাধারণ সম্পাদক কামারুল্লাহ সরকার বলেন, ‘এদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আলুপট্টি পদ্মাপাড় বটতলায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সকাল সাড়ে ৭টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা শহর প্রদক্ষিণ শেষে মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগারে পান্তা খাওয়ার উৎসবে যোগ দিবে।’
শান্তিপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। আরএমপির মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিন বর্ষবরণের অনুষ্ঠানস্থান ছাড়াও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে। সেই সঙ্গে সাদা পোশাকে কাজ করবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এছাড়া যৌথভাবে টহল দেবে র‌্যাব-পুলিশ।