বাঙালির বৈশিষ্ট্য – ১

আপডেট: মার্চ ৩১, ২০২১, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


এবার দেখা যাক বড় বড় কবি সাহিত্যিক মণীষীরা বাঙালি সম্পর্কে কি বলে গেছেন । যা গুগল থেকে সংগৃহীত ।
নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
* সাত কোটি বাঙ্গালীরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙ্গালী করে মানুষ করোনি ।
* আমরা আরম্ভ করি, শেষ করিনা।
* আড়ম্বর করি , কাজ করিনা।
* যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করিনা।
* ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারিনা।
* আমরা না পড়িয়া পন্ডিত, আমরা না লড়িয়া বীর।
* আমরা ধাঁ করিয়া সভ্য, আমরা ফাঁকি দিয়া পেট্রিয়ট।
* আমরা অহঙ্কার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করিনা।
* আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করি।
* পরের অনুসরণ আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহ আমাদের সন্মান।
* পরের চোখে ধুলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স।
* নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি বিহবল হইয়া ওঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য (চরিত্র পুজা –বিদ্যা সাগর )
* আমাদের রসনার অদ্ভুত রাসায়নিক প্রভাবে জগতে যে তুমুল বিপ্লব উপস্থিত হইতে পারে তাহারি জন্য প্রতিক্ষা করিয়া আছি সমস্ত জগত ও সেদিকে সবিস্ময়ে নিরীক্ষা করিয়া আছে। (স্বদেশ ও সমাজ চিঠি পত্র -৪)।
* আমরা এগুবইনা অনুসরণ করি, কাজ করিনা। পরামর্শ দেবো, দাঙ্গা-হাঙ্গামাতে নাই, কিন্তু মামলা মোকদ্দমাতে, দলাদলিতে আছি। অর্থাৎ হাঙ্গামার অপেক্ষা হুজ্জতটাই আমাদের কাছে যুক্তিসিদ্ধ মনে হয়। (স্বদেশসমাজ-চিঠিপত্র-৫)
* আমরা দলাদলি, ঈর্ষা, ক্ষুদ্রতায় জরাজীর্ণ। আমরা একত্র হইতে পারিনা, পরস্পরকে বিশ্বাস করিনা। আপনাদের মধ্যে কাহারো নেতৃত্ব স্বীকার করিতে চাহিনা। (রাজা প্রজা ইংরেজ ও ভারতবাসী )।
লেখক হুমায়ুন আজাদ
* বাঙ্গালী অভদ্র, তার পরিচয় রয়েছে বাঙ্গালির ভাষায়। কেউ এলে বাঙ্গালী জিজ্ঞাসা করে কি চাই? বাঙ্গালীর কাছে আগন্তক মানেই ভিক্ষুক, বাঙ্গালী বলে দাঁড়ান। বসতে বলার সৌজন্যটুকুও বাঙ্গালীর নেই।
* গণ সৌচাগার দেখলেই কেন যেনো আমার বাঙ্গালীর আত্মাটির কথা বার বার মনে পড়ে।
* আমাদের অধিকাংশের চরিত্র এত নির্মল যে তার নিরপেক্ষ বর্ণনা দিলেও মনে হয় গালাগাল করা হচ্ছে।
* মানুষ মরণশীল, বাঙ্গালী অপমরণশীল। * বিনয়ীরা সুবিধাবাদী, আর সুবিধাবাদীরা বিনয়ী।
* এ বদ্বীপে দালালী ছাড়া ফুলও ফোটেনা, মেঘও নামেনা।
* বাঙ্গালীর বিবেক খুবই সন্দেহজনক। বাংলার চুয়াত্তরে বিবেক, সাতাত্তরে পরিণত হয় সামরিক একনায়কের সেবাদাসে।
* বাংলাদেশ অমর দেশ, এদেশের প্রতি বর্গ মিটার মাটির নিচে ৫ জন করে অমর ঘুমিয়ে আছে।
* শাড়ী পরে শুধু শুয়ে থাকা যায়, এজন্য বাঙ্গালী নারি দেহটা হচ্ছে চলমান শোয়া ।
* বাঙ্গালিকে একটি একাডেমি দাও, বাঙালি সেটাকে গোয়ালে পরিণত করবে।
* আমরা প্রতিভার প্রশংসা করলেও ওই পুঁজিপতি গাধাকে আসলে পছন্দ করো তুমি।
প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ
* বাঙ্গালী গরমের ভক্ত, নরমের যম। একটু নরম দেখলেই উপায় নেই, ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। তারা যত ঝাঁপ দেবে, পুলিশ ততই বিপদে পড়বে। বাঙ্গালীর যত রাগ খাকী পোষাকের দিকে। পুলিশের দিকে ঢিল মারতে পারলে আর কিছু চায়না।
* আমাদের মধ্যে সম্মান করা এবং অসম্মান করা দুটি প্রবণতাই প্রবলভাবে আছে। কাউকে পায়ের নিচে চেপে ধরতে আমাদের ভাল লাগে।
* আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের যখন গুছিয়ে কথা বলা দরকার তখন টেলিগ্রাফের ভাষায় কথা বলি। আর যখন সার সংক্ষেপ করা দরকার তখন পাঁচ শো পৃষ্ঠার উপন্যাস লেখা শুরু করি।
* বাঙ্গালীকে বেশি প্রসংসা করতে নেই। প্রসংশা করলেই একলাফে আকাশে উঠে যায়। আকাশে উঠে গেলেও ক্ষতি ছিলনা, কিন্তু আকাশ থেকে থুথু ফেলা শুরু করে।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
* বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে তখন আমরা বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফিকাহ ও হাদিস চষে।
আহামেদ ছফা
আমাদের দেশের পূর্বসূরি বলতে যাদের বোঝায়- তাদের মধ্যে জ্ঞানে গুনে কবি, সাহিত্যি লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানীদের মধ্যে এমন কোন বিশ্ব মাপের লোক নেই যাদের চিন্তাধারা অনুসরণ করে বেশী দূর এগিয়ে যাওয়া যাবে। সুতরাং নেই এটা মেনে নিয়েই কাজ করলে সুফল পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কুয়াশার চাইতে অন্ধকার ভালো।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক
* যে জাতি তার বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায় তারা সিংহের সাথে লড়াই শিখবে ?
ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
যে দেশে গুনীর কদর হয়না, সে দেশে গুনী জন্মায় না।
মারাঠি রাজনিতিবিদ স্বাধীনতা সংগ্রামী কংগ্রেস নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে
* বাঙালি আজ যা ভাবে সেটা গোটা ভারত ভাবে আগামীকাল।
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী জার্মান চ্যান্সেলর উইলী বান্ট
মুজিব হত্যার পর বাঙ্গালীদের আর বিশ্বাস করা যায়না। যারা মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোন জঘন্য কাজ করতে পারে ।
স্বাধীনতার স্বপ্নস্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান
* ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা তাদের ধর্মকে ভালবাসে। কিন্তু ধর্মের নামে ধোকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে দিবেনা। এ ধারণা অনেকেরই হয়েছিল। জনসাধারণ চায় শোষণহীন সমাজ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
* বাঙ্গালী ঐক্যবদ্ধ হলে অসাধ্য সাধন করতে পারে।
তসলিমা নাসরিন
* চরিত্রহীনতার সাথে যৌনতার কোন সম্পর্ক নাই। সম্পর্ক আছে শঠতা, নীচতা, অসততা, মিথ্যা, প্রতারণা, ছলনা , ও চাতুরিতার সঙ্গে ।
রুদ্র মুহান্মদ শহিদুল্লাহ
* আর কি অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা প্রসস্তি। ভিরাগত তস্করের নামে নানা রঙ্গা পতাকা।
সুভাষ চন্দ্র বোস (নেতাজি)
* তোমরা আমায় রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিব।
বড় বড় লেখক সাহিত্যিক ও মনিষীরা উল্লিখিত যে সব উক্তি করেছেন বাঙালি সম্পর্কে তা সবই তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফসল বলেই মনে হয়। তাদের সর্বশেষ উপলব্ধির ফলাফল। এগুলো বাঙালি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা অন্য কথায় দুর্নাম। সবই তারা নির্দ্বিধায় বলছেন। নিজ জাতি সম্পর্কে এমন ধারণা তাদেরকে নিশ্চয় দগ্ধ করেছে । যদি এগুলো সমালচনার জন্য করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। তখন প্রশ্ন জাগে এ সমালোচনায় বাঙালি জাতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? যদি নাও হয়ে থাকে তবে হতাশ হবার কিছু নাই। এসব সমালোচনা ও দুর্নাম ছাড়িয়ে বাঙালির গৌরবের, বীরত্বের ও অহঙ্কারের যে ইতিহাস আছে তা কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নাই ।
পুর্বেই বলা হয়েছে ঈশা খাঁর কথা। মোগল সেনাপতি মানসিংহের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে ঈশা খাঁ তাকে পরাজিত করিছিলেন। মানসিংহের তরবারি ভেঙ্গে যায়, তদপুরি তাকে আঘাত করেননি। বরং আরেকটি তরবারি নিয়ে যুদ্ধের আহবান জানান। ঈশা খাঁ তাকে এই উদারতা দেখালেও মানসিংহ তা করেননি। ঈশা খাঁর এই বীরত্ব ও উদারতা বাঙালি জাতিকে গর্বিত করে।
বৃটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী বাঙালি হিসেবে বিবেচিত শহিদ মীর নিসার আলী তীতু মীর এক অসমসাহসী বীর। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তিনি ভীষণ অনুশীলনের মাধ্যমে সহস্রাধিক লড়াকু তৈরি করেছিলেন এবং নারিকেলবাড়ীয়ায় শক্ত বাঁশের কেল্লা তৈরি করেছিলেন। তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ করতে করতে তীতুমীর জীবন দিয়েছিলেন কিন্তু আত্মসমর্পণ করেননি। সেদিন যদি এই লড়াইটা নারিকেলবাড়ীয়ায় কেন্দ্রিভুত না করে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিতেন তাহলে হয়তো ১৮৩১ সালেই দেশকে স্বাধীন করে যেতে পারতেন।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ক্ষুদিরাম সুর্যসেন প্রীতিলতা অদ্দার সহ অনেকের নাম স্বর্র্ণাক্ষরে লেখা আছে। সুভাষচন্দ্র বোস একজন আইসিএস অফিসার হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজদের অধীনে চাকরি করেননি। বরং তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। সময় ও সুযোগ পেলে ভারত স্বাধীনতায় তারই মুখ্য ভূমিকা থাকতো। কিন্তু অকালেই তিনি হারিয়ে যান। বাঙালি জাতি তার ত্যাগকে গর্বের সাথে স্মরণ করে। এদের মত আরও অনেক বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন দান করে গেছেন- যা ম্লান হবার নয় ।
বৃটিশ আমলে সমাজ সংস্কারক হিসেবে রাজা রাম মোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখনি বৃটিশ সরকারকে ভীষণভাবে বিব্রত করতে পেরেছিল বলে তাকে কয়েকদফা জেল খাটতে হয়েছিল। গণজাগরণে তার অসাধারণ ভূমিকার তুলনা হয়না। আজ তিনি আমাদের জাতীয় কবি। ধর্ম প্রচারে জ্ঞান অতীস দীপঙ্কর এবং বিজ্ঞানের আবিষ্কারে জগদিসচন্দ্র বসু এই বাংলার সম্পদ। আমাদের গর্ব ।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচাইতে গর্বিত অধ্যায় ভাষা আন্দোলন। পৃথিবীর কোনো জাতিকে ভাষার জন্য আন্দোলন করতে হয়নি, জীবনও দিতে হয়নি। এই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে তথা মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা করতে জীবন দিতে হয়েছে সালাম, রফিক, বরকত, জাব্বারের মত তরুণ প্রাণ। আজ অত্যন্ত গর্বের সাথে বলতে পারা যায় বাংলাভাষা আমার প্রাণের ভাষা। সেই ভাষা আজ আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।
এর পরই হচ্ছে বাঙালির স্বাধীনতা। যার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বে এ জাতি ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। এই অর্জন বাঙালিকে জাতি হিসেবে অনন্য সম্মানের অ:িকারি করেছে। বাঙালি হিসেবে ৩ জন নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমার্ত্য সেন, ও ড. ইউনুস। বিশ্ববাসীকে চমকে দেবার মত এ অর্জন এ বং জাতির জন্য এগুলো বিশাল বড় প্রাপ্তি । এছাড়া ২০০৪ সালে বি বি বিবিসির জরিপে ২০ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকা করা হয়েছে এরা হচ্ছেন-
১। শেখ মুজিবুর রহমান ২। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর ৩। কাজী নজরুল ইসলাম ৪। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, ৫। নেতাজীসুভাষ চন্দ্র বোস, ৬। বেগম রোকেয়া। ৭। জগদিসচন্দ্র বসু, ৮। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, ৯। মাওলানা ভাসানী, ১০। রাজা রাম মোহন রায়, ১১। তীতুমীর, ১২। লালন ফকির, ১৩। সত্যজিত রায়, ১৪। অমর্ত্য সেন, ১৫। ভাষা শহিদ, ১৬। ড মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ১৭। বিবেকানন্দ, ১৮। জ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, ১৯। জিয়াউর রহমান, ২০। সোহরাওয়ার্দী।
সুতরাং বাঙালিকে যে যেভাবেই দুর্নাম করুক না কেন তাদের গৌরব করার মত অনেক কিছুই আছে।
লেখক : সাংবাদিক