বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রতি পূর্ণ সমর্থন ভাসানীর

আপডেট: মার্চ ১২, ২০২২, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


১২ মার্চ ১৯৭১: পূর্ব বাংলায় পিআইএ বিমান চলছিল না। কারণ প্রতিটি বাঙালি কর্মচারী অসহযাগ আন্দোলনে একাত্ম ছিলেন। মেশিনগান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত শত শত সৈন্য পরিবৃত অবস্থায় পাকিস্তানি কর্মচারীরা তেজগাঁ বিমান বন্দরে অথবা সেনানিবাসে অবস্থান করে বিমান পরিচালনার কাজ করে যাচ্ছিল। করাচি থেকে বিমান আসতো যাত্রীশূন্য।

ফিরতি ফ্লাইট পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ে যেত। এর আগে শ্রীনগর থেকে ইন্ডিয়ান এয়ার লাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে লাহোরে নামানো হয়েছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টো বিমান দস্যুদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

ভারত সরকার বিমান হাইজ্যাকের প্রতিবাদে ভারতের আকাশসীমা দিয়ে পূর্বের মত পিআইএ বিমানের আকাশে ওড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ফলে পিআইএ বিমানকে শ্রীলংকা হয়ে করাচি যেতে হত। এজন্য সময় লাগাতো ২ ঘণ্টার স্থলে ৬ ঘণ্টা। এ সময় ভারত ও শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যথাক্রমে ইন্দিরা গান্ধী ও শ্রীমাভো বন্দর নায়েকে। স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় পরিষদের চারনেতা এক বিবৃতিতে করাচি থেকে ঢাকায় যাত্রীশূন্য পিআইএ বিমানে পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদের বহনের দাবি জানান।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত একটি খবরের প্রতিবাদ করেন। এদিন প্রচার করা হয়েছিল যে, পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি ইয়াহিয়ার একটি বার্তা নিয়ে ঢাকায় পার্টি প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন। অপরদিকে খবর ছিল: পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে করাচি থেকে জুলফিকার আলী ভূট্টো কর্তৃক শেখ মুজিবের নিকট প্রেরিত তার বার্তা আওয়ামী লীগ পরীক্ষা করে দেখছে। দু’টো খবরই জনাব তাজ উদ্দিন মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন।

এদিন সংবাদ সংস্থার প্রেরিত খবরে বলা হয় যে, পিপলস্ পার্টি প্রধান জনাব ভূট্টো লাহোরে বলেছিলেন ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে তাঁর পার্টির অনুসৃত নীতি যে অযৌক্তিক নয় এবং আমরা যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই তা করেছি ইতিহাসই সেটা প্রমাণ করবে।’

কিন্তু জনাব ভূট্টো যা-ই বলুন না কেন দেশের পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি তখন সামরিক কর্তৃপক্ষের আওতার বাইরে চলে গেছে। ওয়ালী ন্যাপের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় এদিন স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরো সুগঠিত ও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে প্রতিটি মহল্লা, শিল্প এলাকা ও গ্রামে ঐক্যবন্ধ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে সুশৃংখল গণবাহিনী গড়ে তোলার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান হয়।

বাংলার সার্বিক মুক্তি সংগ্রামকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে সহায়তা ও সংগ্রামে জনতার সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য পূর্ব বাংলার লেখক চারুকলা শিল্পী ও পটুয়ারা তিনটি পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেন। লেখক সংগ্রাম শিবির নামে এটি গঠন করা হয়। ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির আহ্বায়ক নিযুক্ত হন হাসান হাফিজুর রহমান। উল্লেখযোগ্য সদস্যের মধ্যে ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল, সিকান্দার আবু জাফর, শামসুর রাহমান, বদরুদ্দিন উমর, জহির রায়হান, আব্দুল গনী হাজারী, ড. আহমদ শরিফ, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, আহমেদ হুমায়ুন প্রমুখ।

চারু ও কারু শিল্পী কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন, মর্তুজা বশীর ও কাইউম চৌধুরী। পটুয়া গোষ্ঠী গঠিত হয়। পটুয়া কামরুল হাসানকে নিয়ে। পটুয়াদের সভায় লাল শাপলাকে সংগ্রামী বাংলার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

এদিন ময়মনসিংহ সার্কিট হাউস চত্বরে এক বিশাল জনসভায় মাওলানা ভাসানী বলেন, জনগণ কাউকে পাকিস্তানিদের সাথে আপোষ করতে দেবে না। বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। শেখ মুজিব ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ করতে পারেন বলে যে, গুজব কয়েকটি মহল থেকে রটনা করা হচ্ছে, তাতে বিশ্বাস করে শেখ মুজিবের ওপর থেকে আস্থা না হারানোর জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাঙালি জাতির আপোষ করার সময় আর নেই।

এদিন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রাক্তন অধ্যক্ষ এয়ার মার্শাল আসগর খান শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা শেষে করাচি গিয়ে বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দ্রুত ক্ষীয়মান সম্পর্কের শেষ সংযোগ হচ্ছেন শেখ মুজিব। জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে বলে তাঁর আশংকা। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর দপ্তর ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা তিনি দেখতে পাননি বলে তথ্য প্রকাশ করেন।

বগুড়া কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙ্গে ও কারাগারের দেয়াল টপকে ২৭ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। রক্ষীদের গুলিতে একজন কয়েদি নিহত হয়। ঢাকায় কর্মরত জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ব্যতিত তাদের পোষ্য ও পরিবারের ৬৫ জন সদস্য এদিন ঢাকা ত্যাগ করে চলে যান। অপর একটি বিমানে জাপানের বহু সংখ্যক বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়াল টোকিও রওনা হয়।