বাজেট ২০১৭ – ১৮ ও কিছু প্রসঙ্গ কথা

আপডেট: জুন ১৯, ২০১৭, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

মো. নূরল আলম


সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষিতে প্রতি বছরের মত এ বছরেও ১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের ২০১৭ – ১৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়েছে। সংসদে বাজেটের বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা, পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন, সংশোধন ও পরামর্শ প্রদানের মধ্যদিয়ে তা সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হলে সেই চূড়ান্ত বাজেট দ্বারা দেশ পরিচালনা করা হয়। এটাকে গণতান্ত্রিক বাজেট চর্চা বলা হয়। বাজেট সরকারের একটি অর্থনৈতিক দলিল যার মধ্যে দেশের উন্নয়নের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে ও তার রোড ম্যাপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিবৃত থাকে। দলীয় সরকারের দ্বারা বাজেট প্রণীত হলেও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সার্বিকভাবে জনকল্যাণমুখি। অর্থনৈতিক বিষয় ছাড়াও বাজেটের একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র থাকে যা দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, উন্নয়নের নীতি কৌশল ও জনমানুষের প্রত্যাশা বা চাহিদার সাথে সম্পৃক্ত। সম্ভবত এ কারণেই একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের দ্বারাই পরীক্ষা- নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই ও তাদের মতামতের ভিত্তিতেই বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদন নির্ভর করে। বাজেটকে উন্নয়নমুখি ও জনকল্যাণমূলক দাবি করা হলে তাতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের স্বার্থ – সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রতিফলন থাকা আবশ্যক।
বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লক্ষ ২৬৬ কোটি টাকা যা গত বছরের মূল বাজেট অপেক্ষা ১৭.৫ শতাংশ বেশি। প্রস্তাবিত মোট আয় ২ লক্ষ ৯৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে ১ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণের উৎসগুলো হলো বৈদেশিক ঋণ ৪৬ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, অন্যান্য উৎস্যের মধ্যে দেশে ব্যাংক বহির্ভুত ঋণ ৬২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা এবং ব্যাংক থেকে ঋণ ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। এবার মূল বাজেটের আকার দেশের জিডিপি’র ১৮% ( গত বছর প্রস্তাবিত বাজেট ছিল জিডিপি’র ১৭.৩৪ শতাংশ)। বাজেটের প্রস্তাবিত আয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ১৩ কোটি টাকা যার মধ্যে ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য। বাজেটে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৪ শতাংশ। দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য বর্ধিত উন্নয়ন ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা, সরকারি পরিসেবা প্রদানের পরিধি বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে এ বাজেটকে উচ্চাভিলাষী ও একেবারে বাস্তবায়ন অযোগ্য বলা ঠিক হবে না, যদিও বাজেটের বাস্তবায়ন সম্পর্কে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। বাজেট বাস্তবায়নের মাত্রা বাড়াতে হলে কয়েকটি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হবে।
১.
রাজস্ব আহরণ : বাজেটে ২ লক্ষ ৯৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকার প্রস্তাবিত আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো ৯৯ হাজার ২৫৪ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট যা মোট রাজস্ব আয়ের ৩৩.৮২ শতাংশ। এর পরে রয়েছে মুনাফা ও আয় থেকে কর ৮৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৩৮ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। এর পর রয়েছে কর ব্যতিত আয়। এত বড় আকারের প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় সংগ্রহ নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। দেশব্যাপি ভ্যাট আদায় কার্যক্রম দক্ষতা ও কার্যকর নজরদারির সাথে সম্পন্ন হওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর-এর যে সক্ষমতার অভাব রয়েছে তা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর অজানা নয়।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশে ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত সাড়ে আট লাখ শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার মধ্যে ভ্যাট দিচ্ছে মাত্র ৩২ হাজার প্রতিষ্ঠান। অর্থমন্ত্রীর হিসেবে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে ৮ লাখ ৩২ হাজার প্রতিষ্ঠান। এনবিআর এ পর্যন্ত ৩০/৩২ হাজার প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভ্যাট আদায়ের সফলতা দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ বাজেটে প্রস্তাবিত আয়তনের ভ্যাট আদায় করতে গেলে এনবিআর-এর বড় রকমের সক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তা না হলে জনগণের পকেট থেকে নেয়া ভ্যাটের অর্থ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কীভাবে আদায় করা যাবে- সেটা একটা প্রশ্ন। তা হলে ভ্যাটের নামে জনগণের কাছ থেকে পণ্যের বাড়তি দাম নিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেয়া হবে না কি?

দেশের মানুষ ভ্যাট দিচ্ছে ১৯৯১ সাল থেকে। অসাধূ ব্যবসায়ীরা যাতে ভ্যাটের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে পকেটে ভরতে না পারে সেজন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলে আসছে এনবিআর। তবে এ ব্যাপারে সংস্থাটির প্রস্তুতি যে এখনও কার্যকর স্তরে আসেনি তা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট বোঝা যায়।
ব্যাংকে গচ্ছিত জনগণের ন্যূনতম এক লাখ টাকা আমানতের ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়েছে (বছরে ৫০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা) এক লাখ টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা আমানতকারীরা বর্তমানে মোটেই সম্পদশালী না, কারণ এখন অপেক্ষাকৃত কম আয়ের বিপুল সংখ্যক চাকরিজীবি ও সমরূপ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও নিরাপত্তার কারণে কোনোভাবে এক দুই লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন। নতুন প্রস্তাবে এই শ্রেণির বহু সংখ্যক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ব্যাপারে বাইরে এবং সংসদের  ভেতরেও আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত আর একটি বিষয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হলেও অর্থমন্ত্রী কয়েকবার বলেছেন- তা হলো সঞ্চয়পত্রের সুদের হার হ্রাস। উল্লেখ করা অত্যাবশ্যক, এ দেশে যে সব ব্যক্তি স্বল্প আয়ের চাকরি করে, চাকরির বাইরে কোনো আয় ও উল্লেখযোগ্য সম্পদ নাই এবং যে সব ব্যক্তি ২০০৭/২০০৮ সাল পর্যন্ত উচ্চ বেতনে চাকরি করেও এখন স্বল্প অংকের পেনশন লাভ করেন অথবা অবসর গ্রহণের সময় যারা সমগ্র পেনশন সমর্úণ করে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন তারা মধ্যবিত্ত হিসেবে প্রধানত সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত সুদ বা মুনাফার দ্বারা কষ্ট করেই সংসার চালান। অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন বলেছেন, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটির মধ্যে ২০ শতাংশ অর্থাৎ চার কোটি মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে। তাঁর মতে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর পরে মধ্যবিত্তের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২৫ থেকে ৩০ ভাগে উন্নীত হবে।
২.
বিশ্লেষকগণ বলছেন, দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে থেকে বড় ভূমিকা রাখে এই শ্রেণির জনগোষ্ঠি। বাজেট ঘোষণা বা অন্য কোনো কারণে পণ্য ও সেবার দাম বাড়লে এবং তাদের মূল আয়ের উৎস সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো হলে এরা প্রচ- চাপে পড়বে। কাজেই মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত দেশের এই শ্রেণির (অতীতে রাষ্ট্র ও সরকারে গুরুত্বপূর্ণ সেবাদানকারী) মানুষকে অসহায় ও মানবেতর অবস্থায় ঠেলে দেবে। তাছাড়া সঞ্চয়পত্রে মুনাফা হ্রাসের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা বাজেটে বর্ণিত সরকারের সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি কার্যক্রমের পরিপন্থি বলে বিবেচিত হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা না কমিয়ে বরং নারী, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য তা আরো বৃদ্ধির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করেছে। একই সঙ্গে পেনশনার ছাড়া অন্যান্য সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের উর্ধসীমা কমিয়ে ২৫ লক্ষ টাকা পুননির্ধারণ করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
অনেকের মতে পরিবার ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উর্ধসীমা ৩০ লক্ষ টাকার বেশি করা ঠিক নয়। সঞ্চয় অধিদপ্তেরের মতে, সঞ্চয স্কিমগুলোতে প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ করতে দেয়া ঠিক না। সঞ্চয় অধিদপ্তরের উল্লিখিত প্রস্তাব একদিকে সরকারবান্ধব, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভাগ্যবান্ধব। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত এ প্রস্তাবের একটি অনুলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে (কালের কন্ঠ, ১১ জুন, ২০১৭) বিষয়টি বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন- জীবিকার প্রশ্ন বিধায় এ বিষয়ে ইতিবাচক ও সহৃদয় দৃষ্টি দেয়ার জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ রাখছি। ভ্যাট নিয়ে আর একটি কথা, গত বছরের তুলনায় এ বছরে বাজেটে কিছু অপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ ভ্যাটমুক্ত পণ্যের তালিকা বড় করা হয়েছে। কিন্তু ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বসানো সাবান, শ্যাম্পু, শেভিং আইটেম, মশার কয়েল, অ্যারোসল, গুড়া দুধ, শিশুখাদ্য, তাজা ফল, লবণ, জ্বালানি তেল, ডিটারজেন্টসহ নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যকে ভ্যাট ও শুল্কমুক্ত রাখা হয়নি। বিশ্লেষকদের ধারণা, অর্থমন্ত্রী সাধারণ মানুষের ওপর যে ঘন করজাল ফেলেছেন তা থেকে চুনোপুটিদেরও রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই। অর্থাৎ নি¤œ মধ্যআয়ের মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা যায়। পক্ষান্তরে সমাজের উচ্চবিত্তসহ অসাধু ব্যবসায়ী বাঘববোয়ালদের আটকানোর কোনো চেষ্টা লক্ষ্য করা যায় না প্রস্তাবিত বাজেটে।
বরং অন্য পেশাজীবীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। তবে ভ্যাট সম্পর্কে একটি ভাল সিদ্ধান্ত হচ্ছে ছোট ব্যবসায়ীদের ভ্যাটে অর্থমন্ত্রী কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। ভ্যাটমুক্ত টার্নওভারের পরিমাণ ৩৬ লাখ এবং ৪ শতাংশ হারে টার্র্নওভার ট্যাক্স দেয়ার পরিমাণ ৩৬ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা নির্ধারণ করে মন্ত্রী বলেছেন, ‘এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি অনন্য সুযোগ যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে নেই।’
ব্যয় বরাদ্দ : বাজেটের অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের দুস্থ, অবহেলিত, সমস্যাগ্রস্ত ও পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠির জন্য বিভিন্ন প্রকার ভাতা, তার পরিমাণ ও উপকারভোগিদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারী, বয়স্ক ও অসচ্ছল ব্যক্তি, মুক্তিযোদ্ধা, চা শ্রমিকসহ হিজড়া জনগোষ্ঠি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সামাজিক অর্থনৈতিক সুরক্ষা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
৩.
এরকম সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে বাজেটে ২৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে- যা মোট বাজেটের ৬ শতাংশ এবং বিদায়ী অর্থ বছরের চেয়ে প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা বেশি। দেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের অব্যাহত বৃদ্ধির সাথে মিল রেখে যদি দরিদ্র মানুষের অবস্থার উন্নতি ঘটত তাহলে ‘সোশাল সেফটিনেটের’ জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন থাকত না এবং সেটাই বেশি টেকসই হতো। কিন্তু আমরা বিগত বছরগুলোতে দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ায় এ সুরক্ষা জালের মধ্যে বাইরে থেকে অনেককে নিয়ে আসতে হচ্ছে। তবে এ কর্মসূচি চালু থাকলে এবং তা সফল হলে আগামীতে অনেকে এ নিরাপত্তা জাল থেকে বের হয়ে মূল ধারায় চলে আসবে বলে আশা করা যায়।
বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় বরাদ্দ ৬৫ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১৬.৪ শতাংশ। এর মধ্যে কেবল শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ৫০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা যা বিদায়ী বাজেটের সংশোধিত বরাদ্দ অপেক্ষা ৬ হাজার ১৭২ কোটি টাকা বেশি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের জন্য রয়েছে ১৫ হাজার ১২ কোটি টাকা যা বিগত বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দের বেশির ভাগ অনুন্নয়ন ব্যয়, অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন ভাতার জন্য ব্যয় হবে। বরাদ্দের অবশিষ্ট টাকা দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে তেমন কিছু করা যাবে না বলে শিক্ষাবিদরা মনে করেন। পত্রিকার খবরে জানা যায়, বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রকল্পগুলো এ উদ্দেশ্যে ব্যয় বরাদ্দের মাত্র ৩৪ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে এ পর্যন্ত।
এসব কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে নতুন বাজেটেও শিক্ষা খাতের সার্বিক উন্নয়নে  শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব নির্মাণ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয় ও শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রকল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা অনেকদিন যাবত বলে আসছে ইউনেসকো ( টঘঊঝঈঙ )। গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বিষয় হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার পৃথক প্রকল্প/বরাদ্দ প্রস্তাবিত বাজেটে রাখা দরকার।
প্রায় স্থবির হয়ে থাকা কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির মাধ্যমেই প্রাক্কলিত ৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। এজন্য কৃষিতে সেচ ব্যবস্থার প্রসার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জমি উদ্ধার, একটি বাড়ি একটি খামার, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলা প্রভৃতি বিষয়ে বাজেট প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। এটা বাজেটের একটি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোগ ও বিনিয়োগ চাহিদা বৃদ্ধি এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যক্তিখাত বিকাশের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কথায় প্রতিবছর প্রায় ১৬ লক্ষ চাকরি সন্ধানী বেকার ব্যক্তির জন্য দেশে যে কর্মসৃজন দরকার হয় তার কোনো ব্যবস্থা বাজেটে উল্লেখ নেই। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের জন্যও কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না বাজেটে।
৪.
অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন আমাদের উন্নয়নের নীতি কৌশল। এজন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ভোগ ব্যয়, বিনিয়োগ ব্যয় ও সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নজরদারি ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনিক কাঠামো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান।
বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের আয় কিছুটা হলেও বাড়বে যদি সে ব্যয় সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমূলক হয়। ঘাটতি বাজেট আরও যেন বেশি ঘাটতি না হয়, তাহলে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়বে যার ফলে সুদ পরিশোধের চাপ ও প্রাক্কলিত ৫.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
কিছুটা নির্বাচনমুখি বাজেট। তবে সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ, প্রকল্প কার্যক্রম ও বাজার মনিটরিং এবং সর্বোপরি সরকারের প্রতিটি স্তরে সততাভিত্তিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হলে এ বাজেট থেকে সীমিত মাত্রার হলেও জনতুষ্টি পাওয়া যেতে পারে।
লেখক: প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী