বাধা অতিক্রম করে ফুটবল নিয়ে ছুটছে ক্ষুদে মেয়েরা

আপডেট: নভেম্বর ২৯, ২০২০, ৯:৪১ অপরাহ্ণ

কুলসুম সাফরিন:


১৯৯১ সালে মেয়েদের ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার মধ্যে দিয়েই বিশ্বে মেয়েদের ফুটবল খেলার যাত্রা শুরু হয়। এরই পেক্ষিতে ২০০৪ সালে বাংলাদেশে মেয়েদের প্রথম টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়। মেয়েদের ফুটবল খেলা এতটা সহজ ছিল না। প্রত্যেক মেয়ে খেলোয়াড়কে পার করতে হয়েছে অনেক বাধা বিপত্তি। কারো জীবন স্বপ্নের মতো, আবার কারো জীবন হয়েছে রঙ্গিন। অনেকে ঝরে পরেছে, আবার অনেকে বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে। আগে তেমন সহজ না হলেও আজও অনেক পরিবার সমর্থন করে না মেয়েদের ফুটবল খেলা। শুনতে হয় সবার তিক্ত কথা। সমাজের তিক্ত কথার চাপে অনেক পরিবার মেয়ে বালিকা হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয় যেন সে ফুটবল না খেলে। রাজশাহীতে জেএফএ অনূর্ধ্ব ১৪ মেয়ে ফুটবল চ্যাম্পিয়ানশিপ ২০২০ খেলতে আসা মেয়ে খেলোয়াড়দের জীবনও কিছুটা একই। অনেক বাধা পার করে তারা এখানে এসেছে। পথে যেন বাধার কমতি নেই তাদের।
রোববার (২৯ নভেম্বর) নগরীর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জেলা স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব ১৪ মহিলা জাতীয় ফুটবলে খেলতে আসা ক্ষুদে মেয়েদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহের কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল সোনার দেশের পক্ষ থেকে।
রংপুরের খেলোয়াড় সীমা আক্তার জানায়, বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি ছোট থেকে। অনেক ছোট থেকে খেলা শুরু করি। খেলায় অনেক বাধা পার করতে হয়েছে আমাকে। নিজের বাবাও কখনো সমর্থন করেনি আমার খেলায়। মায়ের সহযোগিতায় এতদূর আসা আমার। নয়তবা প্রথমে আমি খেলবো শুনে বাবা আমারও বিয়ে দিয়ে দেয়ার কথাও ভেবেছিল। কিন্ত আমি খেলায় ভালো হওয়ায় মা তা হতে দেয়নি। আমি ২ বছর থেকে ফুটবল খেলছি। আমরা যখন মাঠে অনুশীলন করি, অনেক মানুষ আমাদেরকে অনেক কটু কথা শোনায়। আমরা খেলি বলে আমরা ভালো না, আমাদেরকে কখনো সমাজ ভালো চোখে দেখবে না। আমাদের আশেপাশে যারা আছে, তারাও অনেক বাজে কথা শোনায় আমাকে। বলতে গেলে বাসা থেকে বল বের করাও কঠিন হয়ে যায় আমার। তবে এই বাধাকে পেরিয়ে একদিন আমি বড় খেলোয়াড় হবো। কোনো বড় জায়গায় যেতে হলে অনেক বাধাই পেরোতে হবে।
রংপুরের আরেক খেলোয়াড় চতুর্থ শ্রেণির সায়রা খাতুন জানান, খেলা তার ভালো লাগে। ছোট হওয়ায় বাবাই শখ করে খেলায় নাম দিয়েছে। বছর খানেক হয়ে গেছে তার খেলা। এর মধ্যে আশেপাশের মানুষ নানান বাজে মন্তব্য করে থাকে। কিন্তু জীবনে বড় কিছু হতে পারলে সব কষ্ট যেন মুহূর্তের মধ্যে সার্থক হয়ে যাবে।
এই জাতীয় আসরের আরেক খেলোয়াড় শাম্মী আক্তার ফুটবলে আসার গল্প শুনালেন, তাদের দিকে যে সব মেয়েরা খেলা করে তাদেরকে সমাজের কাছে আবার কাউকে পরিবারের কাছ থেকে অনেক বাধা অতিক্রম করে আসতে হয়েছে। আমি মেয়ে হয়ে খেলছি বলে এটা আমার সমাজ ও পরিবার প্রথমে মেনে নিতে চায়নি। তবে বাধা অতিক্রম করে যখন খেলে পরিবারকে কিছু উপহার দিচ্ছি, তখন পরিবার উৎসাহ দেয়। কিন্তু সমাজ এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শুধু আমি এক না, আমার মতো অনেকেরই এরকম বাধা অতিক্রম করে সামনে দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক বড় আপুদের খেলতে দেখি, আমার অনেক ভালো লাগে তাদের খেলা। আমিও তাদের মতো বড় পর্যায়ে খেলতে চাই।
কিশোরগঞ্জ জেলার মেয়ে ও এই আসরের খেলোয়াড় উসমিতা সুমাইয়া জানান, আমরা গ্রামের দিক থেকে এসেছি। সেখানে মেয়েদের খেলা তেমন সবার কাছে গ্রহণ যোগ্য নয়। আর তা যদি ফুটবল হয় তাহলে তো আমাকে শুধু না আমার পরিবারকেও অনেক খারাপ কথা শুনতে হয়। প্রথমে বাসায় কেউ রাজি ছিল না আমার খেলা নিয়ে। পরে আমাদের কোচ তাদের সাথে কথা বলে খেলা সম্পর্কে তাদেরকে বোঝায়। আর খেললে আমাদের জীবন অনেক বদলে যাবে। বোঝানোর পরে পরিবার কিছুটা রাজি হয় মাঠে ফুটবল খেলাতে। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশিরা তার সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। এরপরও অনেক বাধা অতিক্রম করে দুই বছর ধরে খেলছি। কতদিন এভাবে খেলতে পারবো- তা বলতে পারছি না।
আরেক খেলোয়াড় সুস্মিতা খান জানান, খেলা জগতে আমার আসা ৩ বছরের মতো। অনেক জায়গায় খেলেছি আমি। স্বপ্ন অনেক বড় দেখি- যেন জীবনে সেরা খেলোয়াড়ের মধ্যে আমার পরিচয় ফুটিয়ে তুলতে পারি। এখানে এই পথে আসা আমার জন্য খুব সহজ ছিল না। মেয়ে হয়ে বড় হওয়া আর খেলার সাথে যুক্ত হওয়া অনেক কঠিন বিষয়। সমাজে আমার ক্ষেত্রেও একই বাধা পেরোতে হয়েছে।