বাবলু : দেখে যাওয়া হলোনা যার আলোর পাতা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২, ১১:০২ অপরাহ্ণ

এস এম তিতুমীর:


কবির ‘বাঁচার আর্তনাদ’ কবিতায় এসেছে- ‘মন প্রাণ বিদীর্ণ করে / ক্যান্সারের নিরব ক্ষরণ ও হাহাকার / সবুজ ধানক্ষেতে শুধু ইট বিছানো পথ / তবু দৃঢ় বিশ্বাস স্বপ্ন ভাসা চোখে / বাঁশবনে রাজকন্যার খোঁজে / সঞ্চরারিত প্রাণের উচ্ছ্বাস’। প্রাণের আবর্তে প্রাণের কথা হয়তো সবটাই বল হয়ে ওঠে না। কিছু কথা বাকিই থেকে যায়। রেখে চলে যেতে হয় হাজারো কাজ। তবে এ কাজের মাঝেই বেঁচে থাকে মানুষ। জীবন থেকে চির বিদায় নেওয়া এ পৃথিবীর এক অমোঘ নিয়ম। একে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না।

কান্নার সাগরে ভাসিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রি; আব্দল্লাহ আল মাহমুদ বাবলু চির বিদায় নিয়ে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। ভাই সম্বোধনে যার ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি তকন তিনি উপাচার নামক একটা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত। সেসময় তার সাথে আমার পরিচয়। কৃষকের অধিকার শিরোনামে একটা আর্টিক্যাল নিয়ে সাহেব বাজার জিরোপয়েন্টে উপাচার অফিসে অনেক কথা হলো। সেই থেকে ঘনিষ্ঠতা, হৃদ্যতা। পরে রানীবাজার অফিসে চা খাওয়া। তবে এবার দৈনিক উত্তরা প্রতিদিন নামের এই অফিসে। তার অফিসে গেলে চা না খেয়ে উঠে আসার উপায় নেই। সেখানেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

এরপর তিনি মৌমিসি এই নামে তার একটা প্রকাশনা প্রেস ঝাউতলা মোড়ে স্থাপন করলেন। সেখানেও দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবি বিদগ্ধজনের আনাগোনা। তিনি কাজের প্রতি খুবই দায়িত্বশীল ছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে রাজশাহী রেতার ভবনে তার সাথে দেখা। বাহ আপনি এখানেও ! হাঁ ভাই এখানে ক্রীড়াঙ্গন করি সাথে সাথে নাট্যশিল্পী হিসেবেও আছি। এমন সহজ-সরল সাবলীল খোলামেলা মনের মানুষটি আমার স্মৃতিতে খুবই জীবন্ত। মৃত্যু না থাকলে জন্মের স্বাদ হয়তো এতো উপভোগ্য হতো না। আর জগৎ সংসারও এতো গতিশীল হতো না। মৃত্যুর সত্য অমোঘ ডাকই জন্মের পরিপূর্ণতা এনে দেয় মানব জীবনে। তাই বেঁচে থাকার সময়টুকুকে সঠিকভাবে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে নানাবিধ বিদগ্ধ ভাষায়।

আপনি যদি জীবনকে উপভোগ করতে চান তাহলে অবশ্যয় মৃত্যুকে স্মরণে রেখে তা করতে হবে , মৃত্যু নিয়ে এমন অনেক ক্ষুরধার তত্ত্বকথা পাওয়া যাবে। তবে কর্মের মধ্যে যে মৃত্যুর অনন্যতা বিরাজ করে তা তার কর্মপাঠেই উপলব্ধি করা যায়। মরণব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এলেন তিনি। বললেন, ভাই এতোদিন অনেক যন্ত্রণা ভোগ করলাম। ভারত থেকে চিকিৎসা করিয়ে এলাম। কেমো থেরাপির কি যে যন্ত্রণা তা বলে বোঝাতে পারবো না। দেখছেননা মাখার সব চুল উড়ে গেছে। তারপর পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে আমার গাতে দিলেন, তাতে লেখা আছে ‘স্বপ্নভুক ভাবনায় শ্যামল জল’ বললাম এতো দারুণ নাম। কি, কবিতার বই করবেন নাকি। বলতেই বললেন, হ্যাঁ। তবে এর একটা প্রচ্ছদ আপনাকে করে দিতে হবে।

বললাম, আমিতো এ কাজের কাজী নই। আপনি যখন বলছেন তখন চেষ্টা করে দেখবো। কিন্তু আমি পারিনি। হয়তো এই বই প্রকাশটাই জীবনের শেষ ইচ্ছে ছিলো। মেডিকেলের বেডে শুয়ে এ স্বপ্নই হয়তো তাকে ঘিরে রেখেছিলো, তাই কবি তোতা ও সুমনের সামনে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। তারা দু’জন কবি সিরাজুদৌলা বাহারকে সাথে নিয়ে বই করার উদ্যোগ নিলেন। সব কাজ শেষও হলো, বই বাঁধায় প্রেসে। খবর এলো বাবলু ভাই আইসিইউ’তে। ১৪ ফেব্রুযারি বাাঁধায় শেষ, পরেরদিন সকাল সাতটায় খবর এলো তিনি নেই। এই, নেই নিয়েই জীবন। লেখক কোলরিজ’র ব্যাখ্যায়- ‘আমাকে সব সময় মনে রাখতে হবে, আমার জীবনটা যেন মৃত্যুর মধ্যেই শেষ হয়ে না যায়।’ বোধকরি তিনি সেভাবে শেষ করেননি, রেখে গেছেন অকুণ্ঠ ভালোবাসা।

কবিগুরু’র কথায় -‘মৃত্যু এক প্রকার কালো কঠিন কষ্টিপাথরের মতো. ইহাই গায়ে করিয়া সংসারের সমস্ত খাঁটি সোনার পরীক্ষা হইয়া থাকে।’ মৃত্যুর এমন নানা উপমা, সংজ্ঞা থাকলেও মৃত্যুর চেয়ে মহাসত্য যে কিছু নেই, এ কথার বিপরীতে বোধকরি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে পাওয়া যাবে না। মৃত্যু, এ মৃত্যু, একজন কবি, সম্পাদক, সংগঠক ও কর্মনিষ্ঠ উদারচেতা মানুষের মৃত্যু। যিনি জীবনটাকে মৃত্যুর মধ্যেই শেষ করে দেননি, দেননি পাঁশুটে পলির পৃথিবীেেত নিজেকে বৃথায় হারিয়ে যেতে। তিনি মৃত্যুর কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত এক খাঁটি সোনারূপে কর্মজগতে নাম লিখিয়েছেন।

এই জগতে অনেকেই এসেছেন আবার অনেকেই আসবেন। তবে যারা আসবেন সেই অনাগত আগামীর কথা বলার মতো দূরদৃষ্টি আমার নাই। কিন্তু যারা এসেছেন আবার কর্মস্বাক্ষর রেখে চলেও গেছেন তাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছেন বাবলু ভাই। যার হৃদয় জাগতিক আর সব হৃদয়ের সাথে একাত্ম হয়েছিলো। তিনি চলে গেলেন চির ঘুমে। আমাদের জীবনে যে একদিন সেই ঘুম আসবে, সেই ঘুমে যে শান্তি আছে তা জীবনের কর্মপক্ষেপেই লুকিয়ে আছে, লুকিয়ে আছে দেশপ্রেম আর প্রকৃতি দেখার আকুলতায়।

-‘আমি বারবার কখন বা প্রতিদিন / নিরন্তর বয়ে চলা পদ্মা পাড়ে-/ খুঁজি প্রকৃতির রূপ।’ এই রূপ খোঁজার মধ্য দিয়েই বাবলু ভাইয়ের কাব্যজাগৃতি অনুমেয়। সব কিছু পিছনে ফেলে তিনি চলে গেলেন। ‘যেই ঘুম ভাঙে নাকো কোনোদিন ঘুমাতে ঘুমাতে / সবচেয়ে সুখ আর সবচেয়ে শান্তি আছে তাতে’ জীবনান্দের এই কথার মত এককীত্বকেও রবণ করে নিয়েছেন বাবলু ভাই। তিনি দেখে যেতে পারলেন না নিজের কাব্যগ্রন্থ। অনিবার্যরূপে আসা মৃত্যু, পরিণতিকে ট্রাজিক নিয়তিতে অবস্থান করে দিয়েছে। মৃত্যুকে আপন করে নিয়েও তিনি ছড়িয়ে গেলেন ভালোবাসা। এই গুণিজনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।