বাবার কবর জিয়ারত হলো না

আপডেট: September 10, 2020, 10:14 pm

সালাম হাসেমী:


মার্চ মাসের সকাল বেলা। কনস্টেবল হায়দার আলী পুলিশের চাকরি করেন। ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। ছুটি সমাপ্তে আজ কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে তার সাইড ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ছয় বছরের কন্যা জান্নাত তার গলা জড়িয়ে ধরলো আর দশ বছরের পুত্র ফেরদৌস এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে দু’জনে সমস্বরে পিতাকে প্রশ্ন করল,‘ আবার করে বাড়ি আসবে’ পিতা তার আদরের সন্তানদের উত্তরে বলল, ‘ ২৫ মে,পবিত্র ঈদুল ফেতর হবে। হয় তো ঈদের দুই এক দিন আগে ছুটি পেতে পারি। সেই সময় আসব’ কন্যা জান্নাত পিতার কপালে চুমু দিয়ে বলল, ‘এবার ঈদে আমাকে সুন্দর এক সেট পোশাক ও একটা বড় পুতুল কিনে দিবে না বাবা ?’ ‘ হ্যাঁ দিব’ জবাব দিল পিতা। ফেরদৌস তার বোনকে পিতার নিকট আবদার করতে দেখে সে তার পিতার আরো নিকটবর্তী হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,‘আমাকে দিবে না ?’ পিতা তার পুত্রের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ , তোমাকেও দিব। ঠিক মত লেখা পড়া করো। ’ স্ত্রী ফরিদা বেগম স্বামীর পানে তাকিয়ে বলল,‘কর্মস্থলে পৌছিয়ে মোবাইলে ফোন করে জানাবে যে ঠিক মত পৌছিলে কিনা ?’ স্বামী স্ত্রীর মুখ পানে তাকিয়ে চোখ রেখে একটু মুচকি হেসে জবার দিল,‘অবশ্যই জানাব।’ বলে সাইড ব্যাগ তার বাম কাধে ঝুলিয়ে ঘর হতে বের হওয়ার সময় ঘরের দরজার চৌকাঠে আঘাত লেগে ডান পায়ের আঙ্গুলে আঘাত পেয়ে ‘উহ্ ’ করে ঊঠলেন। তৎক্ষনাত তার স্ত্রী তার কাছে এসে তাকে ধরে এনে খাটের ওপর বসিয়ে দিয়ে বললেন ,‘যাওয়ার সময় বাধা পেয়েছো একটু বিলম্ব করে যাও।’ হায়দার আলী তার হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,‘সময় বেশী নেই। এখনই ট্রেন এসে পড়বে। কাল বিলম্ব করলে ট্রেন আর ধরতে পারবো না। এ ট্রেন ধরতে না পারলে আজ আর যাওয়া হবে না। যথাসময় কর্মস্থলে পৌছাতে না পারলে চাকরি থাকবে না। এ কথা বলে স্ত্রী ফরিদা বেগমের মুখ পানে একবার দুষ্টিপাত করে আবার রওয়ানা দিলেন। পায়ে হেঁটে রাস্তায় এসে অটো-বাইকে আরোহন করে রেল স্টেশনে পৌছিলেন। যথাসময় ট্রেন এলে ওই গাড়িতে করে ঢাকা পৌছালেন। পরের দিন কর্মস্থলে যোগদান করে কাজে ব্যস্থ হয়ে পড়লেন। ঢাকায় এসে কয়েক দিন পরেই কনস্টেবল হায়দার আলী জানতে পারলেন যে , আমাদের দেশে নভেল করোনা ভাইরাস রোগ এসেছে। কয়েক জন আক্রান্ত হয়েছে। কয়েক দিন পরে দেখা গেল এ মরন রোগে কয়েক জন মারা গেছে। দিনের পর দিন আরো লোক জ্যামিতিক হারে আক্রান্ত হচ্ছে।
সরকার দেখলেন করোনা ভাইরাসহলো একটি ছোঁয়াছে রোগ। একজন সংক্রমিত হলে তার স্পর্শে যে লোক আসবে সেই এ রোগ আক্রান্ত হবেই । রোগীর হাঁচি কাশি থেকে এ রোগ হয়। দেশের এই অবস্থা দেখে সরকার সারা দেশে ‘ লক ডাউন ’ ঘোষণা দিয়ে দেশের লোককে সরকার টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, দেশের সকল লোক জনকে তাদের নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে কেউ ঘরের বাহির হলে মুখে মাস্ক ও হাতে হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ এক ব্যক্তি হতে অপর ব্যক্তির দূরত্ব হবে এক মিটার বা তিন ফুট। এ ছাড়া কোন ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত হলে তৎক্ষনাত কতৃপক্ষকে অবগত করাতে হবে। বিদেশ হতে কোনো ব্যক্তি নিজ দেশে আসলে সেই ব্যক্তিকে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের হতে তাকে আলাদা থাকতে হবে। এ জন্য সে ১৪ দিন হোমকোয়ারেন্টাইনে থাকবে। লোক জন এ সময় এক জেলা হতে অন্য জেলায়, এক উপজেলা হতে অন্য উপজেলায় যেতে পারবে না। এ ঘোষনা যাতে দেশের জনগন যথাযথ ভাবে পালন করে তা দেখা শুনার জন্য সারা দেশে সরকার পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার
গার্ড, আর্মি, আনসার নিয়োগ করেছেন। তারা দেশের জনগনের আইন শৃংখলার কাজে মনোনিবেশ করলেন। সারা দেশে মানুষকে ঘরে অবস্থান করতে বললেন। সারা দেশের রাস্তা-ঘাটে, শহর বন্দরে গাড়ি-ঘোড়া চলা চল ,অফিস আদালত ও মিল কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। শহরের রাস্তা গুলো ফাঁকা। এই লক ডাউনের ফলে দেশের সাধারণ দিন মজুর লোক গুলো বেকার হয়ে পড়ল। তারা আয় রোজগার করতে পারে না বলে তাদের না খেয়ে থাকতে হয়। সরকার এই হতদরিদ্র লোকগুলোকে কিছু ত্রাণ দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। সেই ত্রাণের কিঞ্চিৎ হতদরিদ্রদের হাতে পৌছাল। বাকি ত্রান সব রাঘব বোয়ালেরা গ্রাস করতে শুরু করল। সরকারের প্রশাসনের লোাকেরা এ সব রাঘব
বোয়ালদের ধরে সাজা প্রদান করলেন। এই রাঘব বোয়ালেরা করোনার এই সময় হয়ে দাঁড়ালো করোনার চেয়ে বড় করোনা। যুগে যুগে এ রাঘব বোয়ালেরা ছিল, এ করোনার সময়ও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। এ রাঘব বোয়ালদের গ্রাসের মাঝে আমাদের সমাজের হতদরিদ্রেরা রাঘব বোয়ালদের গ্রাসের খাদ্য হয়ে ক্ষীণ নিঃশ^াস নিয়ে বেঁচে থাকবে। প্রতিদিন টেলিভিশনে আমাদের দেশের ও বিদেশের করোনা রোগে আক্রান্তের ও মৃত্যুর সংখ্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। করোনার এ খবর শুনে দেশের জনগণ ভীত-আতংকিত হয়ে পড়েছে। কখন কাকে আক্রমণ করে সেই আতংকেই সবার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের জনগণ যাতে অকারণে ঘরের বাহির হয়ে গায়ে গায়ে মিশে রাস্তা ঘাটে, হাটে বাজারে ঘোরাঘোরি না করে সেই জন্য সরকার দেশের লোক জনকে শৃংখলায় রাখার জন্য রাস্তায় রাস্তায় , মোড়ে মোড়ে পুলিশ,র‌্যাব, বর্ডার গার্ড, সশস্ত্রবাহিনীর লোক মোতায়েন করলেন। কনস্টেবল হায়দার আলীকে ডিউটি দেয়া হল পুরানো ঢাকার চানখার পুল বস্তি এলাকায়। হায়দার আলী এই এলাকায় ডিউটি

করতে এসে দেখলেন যে, এই এলাকার সাধারন লোক বিশেষ করে বস্তি এলাকার লোক জন খুবই উৎশৃংখল ও বেপরোয়া। তারা শৃংখলায় থাকতে চায় না। তাদের ঘরে থাকতে বলা হলেও তারা ঘরের বাহিরে এসে কাঁধে কাঁধ মিলায়ে, হাতে হাত রেখে, রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, ধূমপান করছে, রাস্তার পাশে পাটি বিছিয়ে লুডু খেলছে, হই চই করছে, দৌড়াদৌড়ি ও লাফা লাফি করছে, কেউ কেউ ফুসকা, বাদাম ও সিগারেট
বিক্রি করছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে এরা করোনার মেলা মিলিয়েছে। বস্তির লোক গুলো ঘরেও থাকতে চাচ্ছে না আবার রাস্তায় তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে না। কেউ মুখে মাস্ক ও হাতে হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করছে না। কনস্টেবল হায়দার আলী এই উৎশৃংখল বস্তির লোকগুলোকে শৃংখলায় ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের ডেকে বুঝিয়ে বললেন ঘরে থাকতে এবং বাহিরে এলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে , মুখে মাস্ক ও হাতে হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করতে । লোকগুলোকে যতই তিনি বুঝাচ্ছেন কিছুতেই তারা তার কথা শুনছে না। তারা দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে করোনার মেলা উপভোগ করছে। কয়েক দিন পরে শোনা গেল বস্তিতে কয়েক জন লোক নভেল করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ খবর শুনে বস্তিবাসিকে সরকার তাদের নিজ নিজ ঘরে হোমকোয়ারেন্টে রাখার ব্যবস্থা করলেন । কিন্তু কে শোনে কার কথা।
সৃষ্টি কর্তা বস্তিবাসীকে উৎশৃংখল স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছে, ওরা উৎশৃংখলতা দেখাইবেই। ওটা ওদের ধর্ম। ওরা আর নিজ গৃহে রইল না। করোনা ছড়ালো জন হতে জনে। কনস্টেবল হাযদার আলী প্রতিদিন ওই উৎশৃংখল বস্তিবাসিকে তার হাত দিয়ে ঠেলে ঘরে পাঠায়। ডিউটি শেষে হায়দার আলী মেসে ফিরে গিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষে শুয়ে পড়ে। গ্রামের বাড়ি হতে তার ছেলে মেয়ে ও স্ত্রী মোবাইলে ফোন করে জানতে চায় কবে তিনি ছুটিতে বাড়ি আসবেন। হায়দার আলী উত্তরে বলে করোনার ডিউটি রেখে বাড়ি যাওয়া যাবে না। এ সময় তাকে ছুটি দেয়া হবে
না। পুত্র কন্যা ও স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমিয়ে হায়দার আলী স্বপ্নে দেখেন তিনি ঈদের দিন ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছেন । ছেলেমেয়ে স্ত্রী নিয়ে ঈদের বাজার করছেন। সবার জন্য বেশ চমৎকার চমৎকার জামা কাপড় ক্রয় করেছেন। সবাই ঈদের পোষাক পেয়ে খুশি। মেয়েটি একটি বড় পুতুল কেনার জন্য বায়না ধরেছে। হঠাৎ করে কন্যা জান্নাত একটি দোকানে বড় একটি পুতুল দেখে সেই দিকে ছুটে যেতে গিয়ে পড়ে যায়। হায়দার আলী তার কন্যাকে দৌড়িয়ে গিয়ে তুলতে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে তার ঘুম ভেঙে যায়। পরের দিন তার পুত্র
কন্যার কথা ভাবেন আর করোনার ডিউটি করেন। একদিন তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শর্দি, কাশি, জ¦র ও গলা ব্যথা হয়। বুকের মধ্যে ব্যথা করে , নিঃশ^াস নিতে কষ্ট হয়। করোনা পরীক্ষা করে তার রিপোর্ট পজিটিভ হয়। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। করোনার সাথে যুদ্ধ করে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হওযার ৯দিন পরে দূরে বহু দূরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। তার প্রাণহীন দেহকে সাদা পোষাক পরিহিত চারজন লোক এসে নিয়ে গেলো গাড়িতে তুলে। করোনা’র বিধান মোতাবেক তাকে সমাহিত করা হল।

হায়দার আলীর বাড়িতে তার স্ত্রীর নিকট মোবাইল ফোনে তার মৃত্যুর খবর দেয়া হল। তার স্ত্রী সংবাদ প্রেরণকারীর নিকট তার স্বামীর লাশ সম্পর্কে জিঞ্জসা করলে তাকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, করোনায় আক্রান্তে মৃত দেহকে যে নিয়মে কবরস্থ করা হয় সেই বিধানেই তার শেষকৃত করা হয়েছে। তাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে এ ব্যাপারে তার স্ত্রী জানতে চাইলে সংবাদ প্রেরণকারী বলতে পারি না বলে ফোন বন্ধ করে দিলেন। কনস্টেবল হায়দার আলীর ইহলোক ত্যাগ করার কথা শুনে তার বাড়িতে শোকের ছায়া পড়ল। স্ত্রী পুত্র কন্যা ও স্বজনেরা কান্ন্ায় ভেঙে পড়ল। তিন দিনের মিলাদ মাহফিল সমাপ্তে হায়দার আলীর পুত্র ফেরদৌস লক ডাউনের মধ্যে ঢাকা পথে রওয়ানা হল । কিছু পথ পায়ে হেঁটে, কিছু পথ রিকশায়, কিছুপথ চাল বোঝাই ট্রাকে করে সন্ধ্যায় ঢাকা পৌছিল। সারাদিন খাওয়া হয়নি। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। ঢাকার শহরে কোন হোটেল খোলা নেই। লক ডাউনে সব দোকান হোটেল বন্ধ। রাত হয়ে গেছে । সে এখন কোথায় যাবে ? এ কথা ভাবতে ভাবতে রাস্তায় কর্তব্যরত এক পুলিশের নিকট গিয়ে তার পরিচয় দিল। সেই কর্তব্যরত পুলিশ তাদের মৃত্যু স্টাফ এর পুত্র ফেরদৌসকে সংগে করে তাদের ম্যাচে নিয়ে গেল। সেখানে তার নৈশ ভোজনে ব্যবস্থা করল। পরের দিন তাকে নিয়ে তাদের অফিসে তার বাবাকে কোথায় কবর দেয়া হয়েছে তার তথ্য জানার জন্য। তার বাবাকে কোথায় কবর দেয়া হয়েছে সেই সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারলো না। ওই অফিস ফেরদৌসকে বলে দিল তার বাবা কোন হাসপাতালে ভর্তি ছিল সেই হাসপাতালে গিয়ে হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তার বাবাকে কোথায় কবর দেয়া হয়েছে তা জানতে। হাসপাতালে গিয়ে নার্স ও ডাক্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তার বাবাকে কোথায় কবর দেয়া হয়েছে তা জানা গেল না। তারা তাকে পাঠালো করোনায় মারা যাওয়া লাশ যারা মাটি দেয় তাদের কাছে। তারা ফেরদৌকে বলল যে, তারা হাসপাতাল হতে করোনায় মারা যাওয়া মানুষ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে দাফন করেছে। কারো নাম পরিচয় তারা জানে না। কাজেই এ পর্যন্ত তারা যত মানুষ দাফন করেছে তাদের কে ফেরদৌসের বাবা হায়দার আলী ছিলেন তারা তা বলতে পারবে না এবং কোথায় তাকে দাফন করেছেন তাও তারা বলতে পারবে না। এ কথা শুনে ফেরদৌসের দু’নয়ন অশ্রু সজল হল । সে তার বাবার কবর খুঁজে পেলো না বলে মনের দুঃখে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির পথে পা বাড়াল।