বাবা দিবস – স্মৃতিতে বাবা

আপডেট: জুন ১৮, ২০১৭, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

আহাসান


১৯৭৪ সাল। আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। সপুরা ছয়ঘাটি পাড়ায় ভাড়া থাকতো আ. সামাদ সাহেব। তিনি নিজে ওষুধ বানাতেন আর বিক্রি করতেন। তার ওষুধ কোম্পানির একটা নামও ছিলো। তার বড় ছেলে এনামূল হক বুলু আমার সাথে সিরোইল সরকারি বিদ্যালয়ে পড়তো। সহপাঠী সুবাদে বন্ধুত্ব। বুলুরা কয়েক ভাই। বুলু, দুলু, টিপু, বাচ্চু। একদিন হঠাৎ শুনি বুলুর ইমিডিয়েট ছোট ভাই দুলু মারা গেছে। শুনেই দৌড়ে গেলাম তার বাসায়। কেবল দশম শ্রেণিতে পড়ি। কীভাবে-কেমন করে-কেন মারা গেল প্রশ্ন মাথায় আসলেও উত্তর চাইতে পারি নি। শুধু বুলুকে বললাম, “কীভাবে এমন হলো?” উত্তরে বুলু ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। কিছু বললোা না। এদিক ওদিক থেকে কানে আসলো রাতে দুলুর বাবার সাথে দুলুর ঝগড়া হয়েছে। রাগের মাথায় নাকি তার বাবা তাকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়েছে। কেউ কেউ বলছে তাতেই দুলু মারা গেছে। একটু পরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ঢুকলেন এক নারী। সাথে আরও কয়েকজন। বুলু তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। জানলাম উনি বুলু-দুলুর মা। আরও জানলাম বুলুর বাবার দুই পক্ষ। বুলু-দুলু-টিপু-বাচ্চু ১ম পক্ষের। তাদের মাকে তালাক দিয়ে সামাদ সাহেব ২য় বিয়ে করেছেন। ছেলেরা বাবার কাছে থাকলেও তাদের মাকে বিদায় করে দিয়েছেন তাদের বাবা। বুলুর মা নওগাঁর অজপাড়া গায়ে বাপের বাড়িতে থাকেন। মলিন দশা। বুলুর মা-এর এই কাহিনিটা ওই দিনেই প্রথম শুনলাম। কিছুক্ষণ পরে বুলু  এসে আমাকে বললো, ‘আহাসান, বাবাতো মাকে থাকতে দিবে না, এখন কী করি।’ আমি উত্তরে বললাম, ‘আমাদের বাসায় নিয়ে চল।’ আমাদের বাসা সপুরাতেই গোরস্থানপাড়ায়। ভাড়া বাসায় থাকি। এখন যেটি চৌধুরী ভিলা। আমরা ৬ ভাই-বোন। বাবা-মা। রুম মাত্র ৩ টা। বলে তো বসলাম আমাদের বাসায় নিতে, ইমোশানে আগেপিছে কিছুই ভাবিনি। বুলু আমার প্রস্তাব পেয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। অনেক কষ্ট করে মৃত ছেলের মরাদেহের পাশ থেকে বুলুর মাকে নিয়ে আসলাম আমাদের বাসায়। আশেপাশের কয়েকজন নারীও ছিলো। কিন্তু সবচাইতে কাজের কাজ করতে পারলো। ফেন্সী। বয়স তার তখন ১৩। বুলুদের বাসার তিন বাড়ি দক্ষিণে তাদের বাড়ি। ফেন্সীর বাবা মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুল হাকিম সাহেব তখনকার আওয়ামী লীগের দুর্দান্ত প্রতাপশালী নেতা। ফেন্সীকে আমি চিনি। তার সাথে আমার ভালবাসার আদান প্রদান সবে শুরু হয়েছে। ফেন্সীই সাথে করে বুলুর মাকে সাথে নিয়ে আমাদের বাসায় আসলো। মাকে বুঝিয়ে বললাম। বাসায় বড় বোন আছেন- অন্য ভাইও আছেন। বাবা বাসায় নেই। পুলিশে ডিএসপি পদে চাকরি করেন। তিনি বিকাল ৫টার দিকে আসলেন। আমি কাচু-মাচু হয়ে আব্বাকে ঘটনা বললাম। আব্বা শুনে বললেন, “ভাল করেছিস।”
আমি বাবার সাপোর্ট পেয়ে আশ্বস্ত হলাম। আমাদের পরিবারের সকলেই বুলুর মার সেবায় ব্যস্ত। ফেন্সী সারাদিন বুলুর মায়ের মাথার কাছে বসে থাকলো। বুলুর মা মুর্ছা যায়, ফেন্সী-আমার বোন-মা মাথায় পানি ঢালে। জ্ঞান ফিরলেই কাঁদতে থাকেন। আবার মুর্ছা যান। এই ভাবেই সারাদিন চললো। বুলু একবার বাজার করার কথা বলছিলো। আব্বা কথাটা শুনেই বুলুকে ডেকে বললেন, ‘শোন বাবা। আমার বাসায় আছ। সব দায়িত্ব আমার- তোমার কিছুই চিন্তা করতে হবে না।’ আমি আব্বার কথা ও  আচরণে এতই মুগ্ধ হচ্ছিলাম যে, ভাবতে শুরু করেছি আমার বাবার চাইতে শ্রেষ্ঠ বাবা আর কাররই নাই।
সন্ধ্যায় দুলুর দাফন-কাফন সম্পন্ন হয়ে গেলে বুলু চিন্তায় পড়ে গেল এই ভেবে যে, তার মাকে রাতে কীভাবে নওগাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবে। আবারও আব্বা বুলুর ভাই-বোন সকলকে ডেকে বললেন, ‘তোমাদের মা আজ রাতে আমাদের বাসাতেই থাকবেন। তিনি যে কদিন থাকতে চান থাকবেন। এ নিয়ে তোমরা কেউ চিন্তা করো না।’ বাবার প্রতি আমার বিস্ময় বাড়তেই থাকলো। আমাদের অভাবের সংসার। অবলীলায় আব্বা সকল দায়িত্ব নিয়ে নিলেন!
ফেন্সীর আম্মাও ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ এবং সমাজসেবি। সারাদিনে তিনি বেশ কয়েকবার এসেছেন বুলুর মাকে দেখতে। রাত প্রায় ১০ টার দিকে ফেন্সীকে নিয়ে তার মা বাসায় গেলেন। আমি সারাদিন বেশ ব্যস্ততার মাঝেই কাটিয়েছি। পরে চিন্তা করেছি। ফেন্সী সারাদিন এইভাবে বুলুর মার সেবা করলো কেন? সেকি আমার জন্য? শুধু আমার জন্য নয়, তার ভেতরে পরের জন্যও যে কাজ করে (ঠিক তার মার মতো), সেই দায়, থেকেই ফেন্সী সারাদিন সেবা করেছে।
পরের দিন খুব সকালে ফেন্সী আমাদের বাসায় আবার এসে হাজির। আবারও সারাদিন একনাগাড়ে বুলুর মায়ের সেবা-যতœ। ফেন্সী থাকাতে আমার মার অনেকটাই সুবিধাও হলো। আবারও রাত ১০ টা পর্যন্ত ফেন্সী আমাদের বাসায় থাকলো।
দুলু মারা যাবার ৩য় দিনের দুপুরে বুলুর সাথে বুলুর মা বিদায় নিলেন। অনেকেই সে সময় পাশে ছিলেন। আমাদের পরিবারের সকলে ছাড়াও ফেন্সী, তার মা, পাড়ার আশেপাশের বেশ কয়েকজন নারীও ছিলেন বুলুর মা চলে যাবার সময়।
হঠাৎ আব্বা ফেন্সীর মা’কে ডেকে বললেন,‘বুবু- আপনার মেয়েটা বড় লক্ষ্মী মেয়ে। তার তুলনা হয়না।’ আমিও পাশেই ছিলাম। শুনে আমার মনটা ভরে গেল। বাবার প্রতি হা করে তাকিয়ে থাকলাম। এমন বাবা আমার আছে ভাবতেই উৎফুল্লতায় মনটা আরও বড় হয়ে গেল।
ফেন্সীই আমার স্ত্রী। বাবা নেই। তাঁর আশির্বাদ আছে। আজকের (১৮ জুন, ২০১৭) বাবা দিবসে বাবাকে বিশেষভাবে মনে করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আল্লাহ বাবাকে অবশ্যই বেহেস্তে দিবেন।