বারান্দায় অন্য রোগীর সঙ্গেই নিপা সাসপেক্টেড রোগী! কাঁচা খেজুর রস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা

আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০২৪, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ


মাহাবুল ইসলাম:শীত এলেই খেজুর রস খাওয়ার ধুম পড়ে গ্রামে-গঞ্জে। উৎসবমুখরভাবেই খাওয়া হয় এ রস। আর প্রক্রিয়াকরণ ছাড়া কাঁচা খেজুরের রস ঝুঁকি বাড়াচ্ছে নিপা ভাইরাসে আক্রমণের। দেশে নিপা আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যু হার ৭০ শতাংশের বেশি। সম্প্রতি রাজশাহীতে সন্দেহভাজন নিপা ভাইরাস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের রোগরোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর একাধিক টিম রাজশাহীতে ভিজিট করেছেন। সতর্ক থাকতে দিয়েছেন নানা নির্দেশনা। এর ফলশ্রুতিতে কাঁচা খেজুর রস বিক্রেতাদের রস নষ্ট করতে অভিযানও চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন। অথচ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সঙ্গেই খোলা বারান্দায় দেয়া হচ্ছে নিপা সাসপেক্টেড রোগীর চিকিৎসা!

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২-২৩ সালের গত মৌসুমে দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত ১৪ জনের মধ্যে ১০ জনই মারা যায়। এ রোগে মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। তাই আগেই প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে আইইডিসিআর। যদিও মাঠ পর্যায়ে এটা নিয়ে অবহেলা থাকছেই।

রামেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, ১ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেলে ১৫২ জন নিপা সাসপেক্টেড রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এরমধ্যে ৮ জনের রিপোর্ট এখনো আসে নি। বাকি ১৪৪ জনের নিপা ভাইরাস পরিক্ষা-নিরিক্ষায় নেগেটিভ এসেছে। অর্থাৎ পরিক্ষা-নিরিক্ষায় আক্রান্তের হার ‘শূন্য’। পরিক্ষা-নিরিক্ষায় আক্রান্ত ‘শূন্য’ হলেও নিপা ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ্ন বাড়ছে।
জেলার বাঘা উপজেলার বাসিন্দা সাবেক ছাত্রদল নেতা আবু আফজাল (৪৫) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জানুয়ারি রাতে মারা যায়। হার্টের জটিলতার পাশাপাশি নিপা ভাইরাসের লক্ষণ ছিলো এমনটা
ডাক্তার জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন মৃতের বড় ভাই বাবুল ইসলাম।

তিনি জানান, আবু আফজাল হার্টের রোগী ছিলেন। গত ১২ জানুয়ারি শ্বশুরবাড়ি দুড়দুড়িয়া গ্রামে বেড়াতে গিয়ে সে খেজুরের কাঁচা রস খেয়েছিলো। পরপরই তার অসুস্থতা বাড়তে থাকে। গত ১৪ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করানো হয়। সিসিইউ থেকে পরবর্তীতে আইসিইউতে নেয়া হয়। এরপর মারা যায়। ডাক্তারসহ সবাই ধারণা করে জানিয়েছেন তার নিপা হয়েছিলো। আর নিপা যে টেস্ট সেটা করার আগেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে, রাজশাহী মেডিকেলের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের খোলা বারান্দায় নাটোরের বাসিন্দা ইয়াসিন (১৩) ও হুমায়ুন (২৪) আপন দুই ভাই চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের বেডের উপর লিখে দেয়া হয়েছে ‘নিপা ভাইরাস বেড’। চিকিৎসক জানান, তারা নিপা সাসপেক্টেড রোগী।

রোগীর চাচা আবুল কালাম আজাদ জানান, গত ১৫ দিন আগে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নাটোর সদর হাসপাতাল ও বেসরকারি একটি ক্লিনিকের চিকিৎসায় ভালো না হওয়ায় গত ২৪ তারিখে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। খেজুরের রস খাওয়া ও লক্ষণ দেখে নিপা সাসপেক্টেড বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। এখন রোগী আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছে।

ওই ওয়ার্ড পরিদর্শন করে দেখা যায়, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বপ্রান্তের শেষের দুইটা বেডে ‘নিপা ভাইরাস বেড’ স্টিকার লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশেই বাথরুম। যেখান দিয়ে আসছে দুর্গন্ধ। খোলা পরিবেশে প্রবেশ করছে বাতাসও। অথচ ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিশেষায়িত নিপা আইসোলেশন ও আইসোলেশন অন্যান্য দুইটি রুমই ফাঁকা পড়ে আছে। কোভিড আইসোলেশনও ছিলো না কোনো রোগী। পুরো ২৯ নম্বর ওয়ার্ডই ফাঁকা। আর এ ফাঁকা ওয়ার্ডে ৮ জন নার্সসহ ডাক্তার ডিউটিরত আছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, নিপা সাসপেক্টেড হিসেবে ভর্তি থাকা শামীম নামের এক রোগী চিকিৎসা শেষ না করেই শনিবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে বাড়ি চলে গেছে।
মুঠোফোনে সে জানায়, ডাক্তার নিপা সাসপেক্টেড বলেছে। কিন্তু তার নিপা হয় নি। জন্ডিস হয়েছে। হাসপাতালে তার ভালো লাগছে না। তাই বাড়িতে চলে গেছেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ বলেন, আগে নিপা সাসপেক্টেড রোগীদের ওইখানে রাখা হচ্ছিলো। কিন্তু সারাদেশে কোভিড বাড়ছে। একারণে নিপা পজেটিভ না হওয়া পর্যন্ত অন্য ওয়ার্ডেই রাখা হচ্ছে। আর ঝুঁকি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি তিনি।

এ বিষয়ে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও কেউ কথা বলতে রাজি হন নি। পরিচালকের অনুমতি ব্যতিত কোনো কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দেন। একারণে ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের বক্তব্যও পাওয়া যায় নি।

রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, নিপা ভাইরাস উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এরইমধ্যে খেজুর রস বিক্রিতে অস্থায়ী মৌখিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অভিযান চালানো হচ্ছে। কাঁচা রস কেউ বিক্রি করলেই তার রস ধ্বংস করা হচ্ছে। আর বাঘার বাসিন্দা আফজালের তথ্যটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিপা সাসপেক্টেড হলেই অন্য রোগী থেকে আলাদা করে সে রোগীর চিকিৎসা করা হয়। রামেক হাসপাতালেও এমনটাই হয় বলে জানি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Exit mobile version