বালিরথের দুলদুল

আপডেট: জানুয়ারি ৩১, ২০২০, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

সুখেন মুখোপাধ্যায়


তালসারা গ্রামের বালিসাহেব একজন মস্ত বড় জোদ্দার। ডাকসাইট ঘোড়সওয়ার। সারা জেলাতে তার জুড়ি নাই। শোনা যায় তার পরদাদা ইন্দোনেশিয়ার বালিদ্বীপ থেকে এখানে এসে বসত গড়েছিল। তাই মনে হয় তাদের নামের ধরণ এমন।
পাথরে খোঁদা বেঁটে কালো শরীরের বালিসাহেব যখন লাফ দিয়ে তার প্রিয় ঘোড়া দুলদুলের পিঠে চড়ে বসে, তখন তার হাতের পেশিগুলো সাপের মত কিলবিল করে ওঠে। দৌড় প্রতিযোগিতার দৌড় শুরু হলে, দুলদুল আর বালিসাহেবের কারো কোনদিকে হুঁস থাকে না। ওদের একটাই লক্ষ্য ঘোড়দৌড়ে প্রথম হতে হবে। জগৎ সংসার উল্টে গেলে যাক। মাথায় পাগড়ি এঁটে বালিসাহেব যখন দুলদুলের পিঠে সওয়ার হয়, তখন তাকে বাদশাহ শেরশাহ বা রানা প্রতাপ-যা কিছু ভাবা যায়। কিন্তু বালিসাহেব তো একজনই। আর দুলদুলও তো একটাই। ওদের মত তো আর কেউ নেই।
প্রতিযোগিতা শুরুর আগে দুলদুল তার জোড়া পায়ে মাটি ঠোকে তিন বার। তারপর চিঁহিঁ রব তুলতেই, বালিসাহেব লাফিয়ে উঠে বসে দুলদুলের পিঠে। কিন্তু কি আশ্চর্য সব সওয়ারীদের হাতে চাবুক থাকলেও তার হাত শূণ্য। সবাই যখন ঘোড়ার পেছনে গুঁতো দিতে প্রস্তুত, তখন সে দু হাতে দুলদুলের গলা জড়িয়ে ধরে, ওর কানে কানে কি যেন মন্তর দেয়। দুলদুলও চিঁ হিঁ হিঁ শব্দে দর্শক মাতায়। এ শব্দতো দর্শকদের কাছে আগাম বিজয় বার্তা। স্টার্টারের সংকেত পেতেই উল্কার বেগে দৌড় শুরু করে দুলদুল।
এবারেও বাজী দৌড়ে প্রথম হয়েছে দুলদুল। প্রতিযোগিতা শেষে বালিসাহেব অনুষ্ঠান মঞ্চের কাছ ঘেঁসে দাঁড়াতেই, চারদিকে তার নামে জয়ধ্বনি। প্রচন্ড করতালির মধ্য দিয়ে যখন প্রথম পুরস্কারের মেডেলটা দুলদুলের গলায় ঝোলাবে বলে পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই আর একটি ঘোষনায় থমকে দাঁড়াল ও। তার বারো বছরের ছেলে বালিরথ ২০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হয়েছে। ঘোষণাটা শুনে বালীসাহেব দুলদুলের পিঠে একটা তাল ঠুকে বলল-শুনলি তো তোর ছোট ভাই প্রথম হয়েছে। ঘোড়াটাও বোঝে সব। আনন্দে রব তুলল। তারপরই দু পায়ে মাটি খোঁড়া শুরু করল। বালিসাহেব বুঝতে পারল ওর বকশিশ চাই। অদূরের মাঠে একটা গাধা চরছিল, তাকে দেখিয়ে বললো-তুই একটা গাধা। আর যাবে কোথায়। দু পায়ে ভর দিয়ে শূন্যে মাথা তুলে তিড়িং বিড়িং লাফ শুরু করে দিল। বালিসাহেব তখন তাড়াতাড়ি তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তোয়াজ শুরু করে দিলÑ বাড়ি চল বাপ্। আজ তোর জন্যে ১৫ ছড়ি কেলা আর দু কেজি মিষ্টান্ন ভান্ডারের রসগুল্লা বকশিশ। দুলদুলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে যেই ওর পিঠে বসতে যাবে, তখনি মাকে সাথে নিয়ে বালিরথ এসে হাজির-ুবাপু আমি দৌড়ে ফাস্ট হোয়েছি। শুনলাম তো, মাইকে ঘোষণা হল। কিন্তু তু হামাকে জানাস নাই।
– আপনি তো দুলদুলকে লিয়ে ব্যস্ত থাকেন, বুলবো কখুন?
– এ্যার ভিত্রেই বুলতে হতো। ঠিক আছে, এখুন এই টেকা লিয়ে ১৫ ছড়ি কেলা আর দু কেজি রসগোল্লা কিনে এনে দুলদুলকে খিলাবি।
– বাপু আমি?
– ও হ্যাঁ, তুই দুইটা কাঠি লজেন্স কিনে লিস। এই বলে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল বাড়ির পথে। বালিরথ তখন মাকে জিজ্ঞেস করেÑমা আমি তুমার পেট থেকে হোয়ছি না দুলদুল?
-কেনো বেটা ই কথা কেনো বুলছিস?
-না, বুলো না।
– তুই হামার পেট থিকা হোয়ছিস।
-তাহলে বাপু আমার সাথে এমুন করে কেনো?
মা হেসে বলে- এই কথা? শুন দুলদুল তোর বাপুর জান। দুলদুলের মা জ্যোতি, দুলদুলকে পয়দা করতে গিয়ে মারা যায়। সেই থিকে ওকে কোলে পিঠে করে বড় করছে । এই লে, আমি টেকা দিচ্ছি, তুই রসগুল্লা কিনে খাস।
-তোমাকে টেকা দিতে হবে না। আমি ব্যবস্থা করে লিব। তুমি বাড়ি যাও। আমি গঞ্জে গেলাম।
ঠিক বিকেলে বালিরথ কলা আর রসগোল্লা নিয়ে ফিরে আসে। দেখে উঠোনে দুলদুল গা মোড়া দিচ্ছে। কলার ছড়ি আর রসগোল্লার হাঁড়ি নিয়ে পাশে বসতেই দুলদুল হাঁ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বালিরথ ওকে খাবার না দিয়ে, দেখিয়ে দেখিয়ে টপাটপ দুটো রসগোল্লা মুখে পুরতেই দুলদুল ঘোঁত ঘোঁত করে উঠে। পাত্তা না দিয়ে ও কলার ছড়ি ভেঙে কলার খোঁসা ছাড়ান শুরু করতেই দুলদুল চিঁ হিঁ চিঁ হি করে লাফিয়ে উঠে। ভয় পেয়ে দূরে সরে গিয়ে ও জিভ ভেংচিয়ে বলে-তুইও ফাস্ট আমিও ফাস্ট, তাই ভাগ বসালাম। দুলদুল তখন ক্ষেপে অস্থির হয়ে মাটিতে খুরের আঘাতে তাল ঠুকতে শুরু করে দেয়। শব্দ শুনে বালিরথের বাবার ঘুম ভেঙে যায়। ছুটে এসে দুলদুলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে- কি হয়েছে বাপধন? ঘোড়াটার গায়ে পরম আদরে হাত বুলাতে থাকে বালিসাহেব। মনিবের আদরে অভিভূত দুলদুল তার বুকে মুখ ঘষতে থাকে। দূরে দাঁড়িয়ে ওদের ভাব বিনিময় দেখে বালিরথ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে- যে করেই হোক দুলদুলকে হারিয়ে, বাপের মন জয় করতেই হবে। এমন সময় বালিসাহেব, বালিরথকে কাছে ডেকে বলে-কেলাগুলা খিলাতো বাপধনকে। বালিরথ কলা নিয়ে কাছে যেতেই দুলদুল চরকি নাচন শুরু করে দেয়। কিছুতেই তার হাত থেকে কলা খাবে না।
বালিসাহেব ঘোড়াকে শান্ত করতে গিয়ে পেরেশান। হঠাৎ তার মনে হল বালিরথ তাকে বিরক্ত করেনি তো- কি রে তুই জ্বালাতন করিসনি তো? বালিরথ কখনো মিথ্যে কথা বলে না। সে অকপটে স্বীকার করে-হ্যাঁ বাপু, ওর থেকে দুটো রসগুল্লা খেয়েছি,তাই ওর রাগ। বালিরথের উত্তর শুনে বালিসাহেবের সে কি অট্টহাসি। দুলদুল থমকে গেল, বালিরথও ভয়ে জড়সড়। মা জুলেখা বেগম ছুটে এল-কি হয়েছে, এত হাসছ কেনো?
– আরে তুমার বেটা দুলদুলের খাবারে ভাগ মেরেছে। উ তো বুলতে পারত, উঁই ও খাবে। তা না বুলে উ চুরি করেছে।
-কি বুলছো তুমি?
-হ্যাঁ, সাচ কথা। এর শাস্তি অকে লিতে হবে। হররোজ ওকে দুলদুলের সাথে দৌড়ে পাল্লা দিতে হবে। হ্যাঁ, পাল্লায় হার হলেও উ দুলদুলের সাথে কেলা রসগুল্লাও পাবে। তবে হ্যাঁ, এককিলো রান দিতেই হবে। মা ভাবল- এতো ভারি জুলুম। বেটা ভাবল- ভালই হলো। দুলদুলকে হারানোর একটা সুযোগ পাওয়া গেল। ওদের দুজনকে নিশ্চুপ দেখে বালিসাহেব হাসতে হাসতে হঠাৎ যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর উঠতে পারছে না। দুলদুল নাচ থামিয়ে মনিবের কাছে এসে গা ঘষতে লাগল। মাÑবেটা দু’জনে মিলে যন্ত্রণাবিদ্ধ বালিসাহেবকে উঠিয়ে দাওয়ায় বসিয়ে দিল।
দাওয়ায় বসে বসেই সে দুলদুল আর বালিরথের দৌড়পাল্লা দেখে আর মনে মনে ভাবেÑ কবে বালিরথ বড় হবে, কবে তার মত বড় হয়ে দুলদুলের কেশর ধরে, বাজিতে ঝাঁপাবে। এই ভাবে সে যন্ত্রণায় কাতর হয় প্রতিদিন প্রতিরাত।
প্রতিদিন বিকেলে দুলদুল প্রস্তুত পাল্লার জন্যে। প্রতিপক্ষ বালিরথ তার চোখের বালি। তাকে কোন ছাড় দেয় না দুলদুল। ওকে পেছনে ফেলে রেখে চিঁহিঁ শব্দ তুলে প্রতিদিন মনিবের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। এতে বালিসাহেবের হা-হুতাশ বাড়ে বৈ কমে না। দুলদুলের সাথে তার বেটার কবে যে বনিবনা হয়, কবে যে দু’ভাই মিলে লড়াই জেতে, সে স্বপ্নে সে বিভোর।
দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল। আজ ১লা বৈশাখ, নববর্ষ। আজ আবার মেলা, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। স্মৃতি পীড়নে পর্যুদস্ত বালিসাহেব বৌ এর কাঁধে ভর দিয়ে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার দর্শককাতারে সামিল হয়েছে। একে একে সব সওয়ারীরা লক্ষ্যভেদে লাইন দিচ্ছে। তা দেখে দেখে বালিসাহেবের আবেগ আর বাঁধ মানে না।
বালিরথ সেই দুপুরেই দুলদুলের সাথে পাল্লায় নেমেছে। কিন্তু পারছে কই! দুলদুলের পা টগবগ করে ছুটছে। আর সে আজও ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এমন সময় ওদের দুজনেরই কানে এলো বৈশাখী বিউগল। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার বাঁশি। বালিরথ তাতে কর্ণপাত না করে এক মনে দৌড়ে চলেছে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে মাইল ফলক ছুঁয়ে ফেললো। কিন্তু দুলদুলের পাত্তা নেই। পেছনে তাকিয়ে দেখে দুলদুল অনেকটা পেছনে। বিজয়গর্বে চিৎকার করতে গিয়েও থেমে যায় সে। ভাবে দুলদুলের হল কী! ছুটে গিয়ে কাছে দাঁড়াতেই, ঘোড়াটা চিঁহিঁ রব তুলে মাটিতে পা ঠুকতে লাগল। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় বালিরথ বুঝল, দুলদুল তাকে পিঠে সওয়ার হওয়ার জন্য ইশারা করছে। কালবিলম্ব না করে লাফিয়ে পিঠে উঠে বসতেই, দুলদুল রথ ছুটিয়ে দিল প্রতিযোগিতা স্থল লক্ষ্য করে।
ঘোড়দৌড়ে অংশগ্রহণকারী সওয়ারীদের মধ্যে বালিসাহেব নেই বলে ওদের খুশির অন্ত নেই। এবার তাদেরই কেউ একজন চ্যাম্পিয়ন হবে। স্টার্টার বাঁশী ঠোঁটে ঝুলিয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। দৌড় শুরুর বাঁশী বাজাতে গিয়েই তীব্র এক চিকৎকার শুনে সে থমকে দাড়ালো। অবাক হয়ে সবাই দেখল, দুলদুলের পিঠে বসে এগিয়ে আসছে বালিসাহেবের ছেলে বালিরথ। সত্যি দুলদুল যেন বালিরথের রণ পা। আনন্দে উদ্বেল বালিসাহেব বউয়ের হাত খামচে ধরে বলল-দেখো, দেখো বালিরথের কান্ড দেখো। জুলেখাও উৎফুল্ল, উত্তরে বলল-হ্যাঁ, ও তো ছোট বালিসাহেব।
অজস্র করতালি, উৎসাহ আর ভরসার মধ্য দিয়ে দৌড় শুরু হলো। বালিসাহেবের ভাবনার অন্ত নেই। পারবেতো তার দুই পেয়ারা লাল বিজয় কেতন উড়াতে। উত্তেজনায় সে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনায় বিভোর হলো। এমন সময় দুলদুলের নামে জয়ধ্বনি। উলকার বেগে সব সওয়ারিদের পিছনে ফেলে বিজয় নিশানা ছুঁয়ে ফেললো দুলদুল। বালিসাহেবও চিৎকার শুরু করে দিল-শাবাস দুলদুল! শাবাস বালিরথ! বালিসাহেবের চিৎকার শুনে জুলেখা অভিভূত, অবাক বিষ্ময়ে দেখে, বালিসাহেব নেচে নেচে বালিরথ আর দুলদুলের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে।