বাল্যবিবাহ

আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০১৯, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


( পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ব্রিটিশ আমলে আমি দেখেছি কোনো পাড়ায় বা গ্রামে কোনো মেয়ে সাবালিকা হয়ে উঠলে গ্রামের মোড়ল-মাতব্বরেরা তাদের উপর নজর দেয়। ভাল করে দেখে এবং জিজ্ঞাসা করে”। এটা কার মেয়েরে?’ “হুজুর জানেন না, এটা তো জলিল মিঞার মেয়ে’ উত্তর দেয় মোড়লের দফাদার।” মেয়েটা তো বেশ সুন্দর হয়েছে। ওর বাবাকে খবর দে,” মোড়ল সাহেব হুকুম দেন। যেই আদেশ, সেই কাজ। জলিল মিঞা এসে হাজির। জলিল মিঞাকে উদ্দেশ্য করে হুজুর বললেন, “জলিল তোমার মেয়ে দেখলাম বেশ বড় হয়েছে, সুন্দরও হয়েছে, তুমি এর বিষয়ে খেয়াল দিচ্ছনা কেন? তোমার মেয়ে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ায়, আম বাগানে দোলনায় দোল খায়, সঙ্গে অন্যান্য ছুঁড়িও ছোঁড়াদের দেখি। কী ব্যাপার? দেশ থেকে কি পর্দা পুশিদা সব উঠে গেলো না কি? আমরা এ সব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। আমাদেরই লজ্জা করে। আর তুমি বাপ হয়ে কিছুই করছো না? জলিল মিঞা ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়, “হুজুর কী করবো, বলুন। মেয়ের বিয়ে দেয়া তো ততো সহজ ব্যাপার না। মেয়ের আমার, খাওয়া নেই, একটি ভাল কাপড়ও নেই। বিয়ে দেবো কিভাবে? এতো খরচপাতি কই পাবো”। হুজুর হুঙ্কার ছেড়ে হুকুম দেন”। তোমার মেয়ে কাল থেকে আমার বাসায় থাকবে। চব্বিশ ঘণ্টায় থাকবে। আমি তার বিয়ে-শাদির সব খরচ বহন করবো। আমারও তো একটা সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব আছে। আমি না গাঁয়ের মোড়ল”। জলিল মিঞা ভয়ে ভয়ে চলে গেলো- কী করা যায়। মোড়লের বাড়িতে মেয়ে রাখা মানেই তো শেয়ালের কাছে মুরগি পাহারা দিতে বলা। জলিল মিঞা সারা রাত ঘুমায় নি। মোড়ল সাহেবের চামচাদের অত্যাচারে মেয়েকে মোড়ল বাড়িতে রাখতে বাধ্য হয়। অবশ্য তার মেয়ের কোনো অযত্ন হয়নি। এক রাতে দেখা গেলো জলিল মিঞার মেয়ে মোড়ল সাহেবের তৃতীয় স্ত্রীতে পরিণত হয়েছে। মেয়ের বয়স হয়তো বা ১৪ বা ১৫ হবে, জামায়ের বয়স ৬০ এর কাছাকাছি। ব্রিটিশ আমলে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটতো। গ্রামের মোড়ল যা বলতেন, সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কারও কিছু বলার ছিলো না। বর্তমানে অবশ্য সে ধরনের ঘটনা অনেক কমে গেছে এবং সেই মোড়ল সাহেবের জায়গা এখন দখল করেছে বখাটে ছেলেরা। দেশে রয়ে গেছে শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী। তারা কী করবে? রয়েছে উচ্চ শিক্ষিত, শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবক। এদেরকে তাদের পিতা-মাতাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে যত সব অঘটন ঘটছে, এর কোনো সমাধান দেখছি না। বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারলে রাস্তা ঘাটে মেয়েদের আর কেউ ‘টিজ’ করতো না। ফলে বাল্যবিবাহ আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যেতো। বর্তমানে গার্মেন্টে লক্ষ লক্ষ যুবতি কাজে ব্যস্ত আছে। ফলে স্বভাবতই তারাই বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে রেহাই পেয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে।
বাল্যবিবাহের দ্বিতীয় কারণ হলো কাজী সাহেবদের উদাসীনতাও দায়িত্বহীনতা
বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর আমি এক বিয়ের আসরে উপস্থিত ছিলাম। আমি সোজা গিয়ে বসলাম কাজি সাহেবের পাশে। উনি আমাকে দেখেই চিনে ফেলেন এবং বললেন, “কী এলতাস কেমন আছিস”? আমি কিছুই অনুধাবন করতে পারিনি। অনেক দিন পর দেখা। তাছাড়া স্যারের মাথায় পাগড়ি দেখে তাঁকে ভিন্ন জগতের মানুষ মনে হলো। তিনি ছিলেন, নবাবগঞ্জ হরি মোহন স্কুলের আমাদের আরবির শিক্ষক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল ও আধুনিক চিন্তা-ভাবনার মাওলানা। তাঁর মুখমণ্ডলে ছিল ছোট দাড়ি, কোনোদিনই টুপিও পরতেন না। পরতেন পায়জামা ও গায়ে তিন পকেটওয়ালা ফুল শার্ট। তার ঘড়ি থাকতো শার্টের পকেটে। মাঝে মাঝে হাফ শার্টও পরতেন। তাঁর শরীর স্বাস্থ্য ছিল বেশ ভাল। শিক্ষক হিসেবেই খুব ভাল ছিলেন সন্দেহ নেই। তিনি আবার ভাল ফুটবলও খেলতেন এবং মাঝে মধ্যে আমাদের শারীরিক শিক্ষার ক্লাস নিতেন, স্কুল বাগানে। তিনি যদি মাথায় পাগড়ি বেঁধে বিয়ের মজলিশে গিয়ে বসেন তা হলে, তাকে আমি চিনবো কিভাবে? পরে বললেন, “তুই কোন পক্ষের মেহমানরে।” আমি বললাম, স্যার” আমি কন্যা পক্ষের। আপনি তো দু’পক্ষেরই”। ইতোমধ্যে আমি তাকে চিনে ফেলেছিলাম। তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন, বরের ও কনের নাম পরিচয় লিখেছেন। স্যার, জিজ্ঞাসা করলেন, “মেয়ের বয়স কত?’ কনের বাবা বললেন, চৌদ্দ বছর”। স্যার তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “আহম্মকের মতো কথা বলো না। মেয়ের বয়স আঠারো বছর”। তিনি আঠারো বছরই লিখলেন। এবার ছেলের বয়স জিজ্ঞাসা করাতে অভিভাবক বললেন, আঠারো বছর”। স্যার চেচিয়ে বললেন, “ওসব বাজে কথা বলিও না। ছেলের বয়স একুশ বছর কয়েক মাস।” স্যার বেশ হুঁশিয়ার মানুষ। বয়সটা ঠিক মতই সাজিয়ে লিখলেন। কয়েক মাস করে বেশি লিখলেন। যাক বিয়ে তো হয়ে গেলো। খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হচ্ছে। এই ফাঁকে আমি স্যারকে জিজ্ঞাসা কলাম, “স্যার, কাজটা কি ঠিক হলো”। উনি যা বললেন, “দেখ, এলতাস” এটা আমার ব্যবসা’। তাছাড়া আমাদের কারও কি জন্ম তারিখ ঠিক আছেরে? যার যা খুশি লিখছে। এই যে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় শিক্ষকরাই বয়স নিধারণ করেন এবং একাটা বয়স লিখে দেন। আমাদের কারও কিছু জন্ম তারিখ ঠিক আছে রে। আমার ক্ষেত্রে নেই। তোরও তেমনি নেই।” বর্তমানে অবশ্য জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও কে শোনে কার কথা। আমাদের দেশে আইন না মানার প্রবণতা খুব বেশি। আইন মানবেই বা কেন? যারা আইন মানছে, তারা তো ঠকছে, আর যারা না মানছে, তারাই সমাজের মানুষ। বুদ্ধিমান ছেলেই বটে। সবকিছু ম্যানেজ করতে পরে। আর যে আইন মানবে, সে তো আহাম্মক; তার সঙ্গে কেউ মেয়ের বিয়েও দিতে চায় না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার জামাই মানুষ কেন খোঁজে। কারণ তাদের আয়-রোজগার বেশি। মানুষ সেটাই চায়। ন্যায়-নীতির বালাই নেই। আমার চাচা কৃষি ব্যাংক থেকে কিছু টাকা লোন নিয়েছিলেন। আমরা বলতে তিনি কষ্ট করে হলেও কর্জের টাকা শোধ করে দিলেন। কিন্তু যারা লোন শোধ করলো না, তারা সব বেঁচে গেলো। আমার চাচা আমাকে বকা দিয়ে বললেন,“ তোরা কী লেখাপড়া শিখেছিসরে। যারা লোনের টাকা শোধ করলো না, তারা সব মাফ পেয়ে গেলো, আর তোদের কথা শুনে, আমি ঠকলাম, লোনের টাকা শোধ করে।” তোদের আর কোনো কথা শোনা হবে না। তোদের মতো লেখাপড়া জানা আদর্শবাদী লোকেরা বর্তমানে সমাজে অচল। চাচার কথার সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ আছে কি?
মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছিল। এমনকি সংসদেও এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, আমাদের দেশের পরিবেশ ও আবহাওয়াতে মেয়েরা একটু কম বয়সেই সাবালিকা হয়ে উঠে। কাজেই বিয়ের বয়স একটু কমিয়ে আনা হোক। ষোল না হলেও অন্তত সতেরো বছর করা যায়। এ নিয়ে তর্কবিতর্ক নেহাৎ কম হয়নি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় বয়স ১৮ বছরই থাক। কিছু তো ম্যানিপুলেশন হবেই, তাতে অবশ্য খুব বেশি বয়সের তারতম্য হবে না। ১৬ বা ১৭ বছরকে মোড়ল মাতব্বর, এমনকি কাজী সাহেবরাও ১৮ বছর বানিয়ে নেবে। আর যদি মেয়েদের জন্য বিয়ের বয়স ১৮ বছরের কম নির্ধারণ করা হয়, তবে তাঁরা ১৪ বছরের মেয়েকেও সাবালিকা বলে চালিয়ে দিবে এবং বিবাহকে জায়েজ করে ফেলবে, যা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। যা হোক কেবল আইন থাকলে তো চলবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ অবশ্যই করণীয়। এদেশের মানুষ আইনের ধারে-কাছেও কেউ যেতে চায় না। এ ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার সঙ্গে সঙ্গে তা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। কাজী সাহেবদের এককভাবে দোষ দিয়ে কী লাভ। তাঁরাও তো পরিস্থিতির শিকার। মাঝে মধ্যে তাঁরা এই বিয়ে পড়াতে বাধ্য হন। তাঁরা তো মানুষ, তাদেরও তো জীবন আছে। তাঁদের উপর কেউ আঘাত করলে আইন কি তাঁদের রক্ষা করতে পারবে? এ প্রশ্ন রয়েই গেছে। চাচা আপন জান বাঁচা। বর্তমানে এ অবস্থা বিরাজ করছে।
তৃতীয় কারণ হলো: সমাজ সচেতনার অভাব
মানুষকে নিয়েই সমাজ, সমাজ মানুষের জন্যই। তবে সেই সমাজ ব্যবস্থা যদি ঘুণে ধরা হয়, তা হলে সমাজবদ্ধ জীবের লাভ থেকে ক্ষতি হবে বেশি। সমাজের নেতৃত্বে একাধিক ব্যক্তি থাকে না। ব্রিটিশ আমলে দেখেছি, মোড়ল মাতব্বরদের দিয়েই বিচার-আচার হয়েছে। সকলেই এই নেতৃত্ব মেনেই নিয়েছে। তবে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব যে একেবারে ছিল না এমনটি চিন্তা করার কোন কারণ নেই। এই নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে পড়ে খুন খারাবিও হয়েছে, যদিও তা ছিল ন্যূনতম। বর্তমানে সেই নেতৃত্বের হাতবদল হয়েছে। মোড়ল মাতব্বরদের কেউ মানতেই চায় না। যেহেতু তাদের হাতে কোনো লাঠি নেই। যার হাতে লাঠি নেই তার কোনো ক্ষমতাই নেই। মনসা পূজার উৎপত্তি হয়েছিল ভয় থেকে। এই ভয় থেকেই সর্বপ্রথম উদ্ভব হয়েছিল সর্পপূজার। কাজেই নেতৃত্বের শক্তি এখন লাঠি নির্ভর। ফলে লাঠিওয়ালাদের নেতৃত্ব দানা বেঁধে উঠেছে। সরকারের শত চেষ্টা সত্যেও সমাজে অন্যায়, অত্যাচার হচ্ছে. সমাজবিরোধী কাজ হচ্ছে আমরা সব নীরব দর্শক। কেউ কিছু বলছি না, প্রতিবাদ করছি না, প্রতিরোধ করা সে তো দূরের কথা। কাজেই বর্তমানে আমরা যে নেতৃত্বের পূজা করছি, তার উদ্ভব হয়েছে, সেই ভয় থেকে। কাজেই সমাজের মানুষ সচেতন না হলে, আপনি সমাজ বিরোধী কাজ, এমন কী বাল্যবিবাহ বন্ধ করবেন কী করে? “মিঞা বিবি রাজি তো কী করবে সরার কাজী।” বয়ঃসন্ধিকালে অনেক অঘটনও ঘটতে পারে। সেখানে বাল্য বিবাহ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। বয়ঃসন্ধিকালকে এই জন্যই বলা হয় ‘ঝড় ঝাঁঞ্ঝার কাল”। এই সময়ে যুবক যুবতিদের আচরণে বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বেশি জোরাজোরি করলে তারা হয়তো বা আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে। এ ধরনের ঘটনা নেহাৎ কম নয়।
তবে সমাজ সচেতন হলে একযোগে অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে যেকোনো কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু আমরা তা করতে পারি না, মান-সম্মানের ভয়ে। তা ছাড়া জীবনের ঝুঁকি তো আছেই। কেননা এখন তো লাঠিওয়ালারাই সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার অসামাজিক কাজ-কর্মে লিপ্ত আছে। তাদের সংখ্যা কম হলেও প্রভাব বেশি, কিছুই বলার নেই। তা না হলে খুলনার এরশাদ শিকদারের মতো সন্ত্রাসীর উত্থান হলো কিভাবে? এরশাদ শিকদার একের পর এক সমাজ বিরোধী কাজ করেছে। মানুষকে অত্যাচার করেছে, উৎপীড়ন করেছে, নির্যাতন করেছে টর্চার সেলে। মানুষ গুম হয়েছে, সে মানুষকে হত্যা করে গলায় কলসি বেধে নদীর তলায় ডুবিয়ে দিয়েছে। সে হয়েছে বিত্তশালী। এ ঘটনা কোনো মফস্বল শহরে বা গ্রামে ঘটে নি এটি ঘটেছে খাস বিভাগীয় শহর খুলনায়। তখন কি দেশে পুলিশ বাহিনী ছিল না, গোয়েন্দা ছিল না, কোন প্রশাসন ছিল না। কোথায় ছিলেন জন প্রতিনিধিরা, স্থানীয় নেতারা, আমাদের প্রিয় সন্তানেরা। কেউ কি কিছুই জানতো না। বড়ই দুর্ভাগ্য। ভাগ্যিস জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা এসেই বিষয়টি জানতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনিই হয়তো বা জানতে পারতেন না যদি না এরশাদ আওয়ামী লীগের এক নেতার স্ত্রী শোভাকে জোর করে সে বিবাহ না করতো। শেখ হাসিনার তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায়, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং তার ফাঁসির রায় কার্যকরি হয়, যা মিডিয়াতে দেখানো হয়েছিল। মৃত্যুর পূর্বে এরশাদ শিকদার আফসোস করে বলেছিল, শোভাকে বিয়ে করাই ছিল তার জীবনের চরম ভুল। সকলের টনক নড়লে, তার মৃত্যুর পর। অথচ এর পূর্বে কেউ কোনো উচ্চ-বাচ্য করেনি। সকলেই ছিলো নীরব দর্শক। যে দেশের মানুষ দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে দেশকে স্বাধীন করতে পারে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, সেই সূর্য সন্তানেরা এখন কোথায়? প্রয়োজনে আরও একটি যুদ্ধ করতে হবে, এবং সোনার মানুষ দিয়েই সোনার দেশ গড়তে হবে, তবেই না বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হবে। একাত্তরের মা জননী, কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল, “এই গানটি এখনও হৃদয়ে ঢেউ তোলে। যা হোক বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে হলে সমাজ সচেনতা তথা জন-সচেতনতা জাগরিত করতে হবে। তবে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে ততো কঠোর নীতি গ্রহণ করা কোনো দিনই সম্ভব হবে না। তার মূল কারণ আমাদের কারও জন্ম তারিখ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা এ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। পাত্র-পাত্রীর সঠিক বয়স নির্ধারণ করতে না পারলে বাল্যবিবাহের আইন প্রয়োগ হবে কী ভাবে?
বাল্যবিবাহের ক্ষতিকারক দিক
বাল্যবিবাহের নানা ক্ষতিকারক দিক আছে, অথচ প্লাসপয়েন্ট বলতে কিছুই নেই। তবে যদি ধরা যায় মুরুব্বিদের আনন্দফূর্তি ও পাড়া প্রতিবেশীর ভূরিভোজ, তা হলে সেটাকে প্লাসপয়েন্ট বলা যায়। যাদের বিয়ের বয়স হয়নি, বিবাহ কী তাও জানে না, ম্যাচুরিটি বলতে কিছ্ইু নেই, তারা বিয়ের আনন্দ উপভোগ করবে কী ভাবে? কোনো ধর্মেই বাল্যবিবাহের অনুমতি নেই। বাল্যবিবাহ দেশের অর্থই হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার শামিল। বেশির ভাগ বাল্যবিবাহই ভেঙ্গে যায়। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কনেকে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তার মধ্যে যৌতুকের বিষয়টিও এসে যায়। অন্যদিকে ছেলে মেয়ের মধ্যে মিল মহব্বতের বিষয়টিও এসে যায়। বয়ঃসন্ধিকাল ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গ পেতে চায়, মেয়েরা হয়তোবা তখনও সাবালিকা হয়নি, ফলে উপযোজনের বিষয়টি সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। আরম্ভ হয় নাবালিকা মেয়ের উপর অত্যাচার। মেয়েরা মানসিক দিক থেকে একেবারে ভেঙ্গে পড়ে, আর সহ্য করতে হয় নারকীয় যন্ত্রণা। ছেলে মেয়ের মধ্যে এই যে বিবাহের বন্ধন মিল-মহব্বত, স্নেহ ভালবাসা, মায়া-মমতা এসবই তো মহান সৃষ্টিকর্তার রহমত। এই বিড়ম্বনার মধ্যেই দেখা গেলো পাত্রী মা হতে চলেছে, যা বাড়ির কেউ খুশি মনে গ্রহণ করতে পারে না। ছেলে হয়তো বেকার, কোনো কাজকর্ম নেই, ফলে মেয়েটি হয় ঘরছাড়া। আশ্রয় নেয় বাপের বাড়ি। এমনও হতে পারে বউমা শ্বশুর বাড়ি থেকে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত হয়েছে। মা ও সন্তানের পিছনে যে খরচ হবে তা টানবে কে? ছেলে তো তখনও বেকার। এই ভাবে অসংখ্য বাল্যবিবাহের মেয়ে তালাক হয়ে যায়। মেয়ে এক বা একাধিক সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতেই কাটিয়ে দিতে হয় জীবনভর। সহ্য করতে হয় বাড়ির ভাবীদের নানা লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা। এমন কী ভাইদের মারও খেতে হয়। মেয়ের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চিত ভবিষ্যত ও ঘোর অন্ধকার। এ সবইতো বাল্যবিবাহের কুফল।
অপরিণত বয়সে সন্তান ধারণ করলে প্রসূতির মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। অল্পবয়সেই প্রসূতি শরীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায় এবং যুবতি হয়ে যায় বৃদ্ধা। শিশুও হয় দুর্বল। শিশু মৃত্যুর হারও নেহাৎ কম নয়। বর্তমানে অবশ্য বাল্যবিবাহ অনেক কমে গেছে। অদূর ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহের মতে ঘটনা আর ঘটবে না। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের বেশি অং গ্রহণের ফলে মেয়েদের বিয়ের বয়সও বেড়ে গেছে। লেখাপড়া শেষ করতে বয়স হয়ে যাচ্ছে পঁচিশের উপর এবং বিয়ে দিতে দিতে বয়স হয়ে যাচ্ছে ৩০ এর বেশি। এতে করে অবশ্য শিশুর জন্ম গ্রহণের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। ফলে যাদের সন্তান সংখ্যা বেশি হলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়- তাদের সন্তান হচ্ছে কম, আর যাদের সন্তান লালন পালনের ক্ষমতা নেই বললেই চলে, তাদের সন্তানাদি হচ্ছে বেশি। ফলে বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা ও বাংলাদেশকে দারিদ্রমুক্ত করতে বেশি সময় লেগে যাবে। এটি চিন্তার বিষয়।
বর্তমানে নারী শিক্ষার হার অনেক বেড়ে গেছে। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে এবং তারা নারী অধিকার ফিরে পেয়েছে। অন্যদিকে আবার ‘ডাইভোর্সের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে। বেশির ভাগ তালাকনামা আসছে নারীদের পক্ষ থেকে। ছেলে মেয়েরা নিজের পছন্দ মতোই জোট বাঁধছে, তবুও এই অবস্থা। কেন যেন নব দম্পতিদের উপযোজনের সমস্যা হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হয়ে যাচ্ছে ডাইভোর্স যা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এই যে মিল-মহব্বত, ভালবাসা, মায়-মমতার বন্ধন, তা তো স্বর্গীয়। অথচ সামান্য একটু ভুল বোঝাবুঝির জন্য আবেগপ্লুত হয়ে, যতসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যা কোনো ক্রমেই গ্রহণ করা যায় না।
পরিশেষে বলতে চাই, এ দেশে বাল্যবিবাহের ব্যাপারে চিন্তা-করার কোনো কারণ নেই। মেয়েরা লেখাপড়ার দিক থেকে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ফলে বাল্যবিবাহ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাবে। কেননা শিক্ষিত মেয়েরা জাতির সম্পদ। এরা নিজেরাই প্রতিবাদ করতে এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। তবে বাল্যবিবাহের জন্য অসহায় পিতা-মাতাকে দায়ী করার কোনো কারণ নেই। তারা অসহায়। তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ সবাই নিচ্ছে। তাদের জেল, জরিমানাও হচ্ছে, যা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। এ প্রসংগে একটি জরুরি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না। তা হলো এ দেশের জনসংখ্যার বিস্ফোরণ. যা নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। দেশ দরিদ্রমুক্ত করতে বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। জনসংখ্যা সীমিত রাখতে না পারলে, কোনো পরিকল্পনাই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। কাজেই এদেশের জনসংখ্যাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যের কোঠায় না আনা পর্যন্ত কোনো পরিত্রাণ নেই।
লেখক: চেয়ারম্যান (অব.), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।