বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের খসড়া ।। ‘নারীর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা হবে কি?

আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০১৬, ১১:৩৪ অপরাহ্ণ

মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে আবারো দেশ জুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার এ সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে- যা ইতোমধ্যেই আইনের খসড়া মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাভ করেছে। বাল্য বিবাহ আইনের ওই খসড়ার একটি ধারায় ”নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে” ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। গত মাসে মেয়েদের সর্বনিম্ন বিয়ের বয়স ১৮ এবং ছেলেদের সর্বনিম্ন বয়স ২১ রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তবে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে এবং বাবা-মায়ের সমর্থনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে এই আইনে।
এটা নিয়েই মূলত ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রতিক্রিয়া যে শুধু দেশে হচ্ছে তা নয়। জাতীয় সংসদে আইনটি পাস না করার জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। খসড়া আইনের তিব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের  খবর সংবাদ মাধ্যমগুলোতে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে।
খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন লাভের পর মানবাধিকার এবং নারী সংগঠন, চিকিৎসক এবং নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন দেশি বিদেশি এনজিওগুলো এর ঘোর বিরোধিতা করছে। তাদের মতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, বিশ্ব সম্মেলন, জাতিসংঘের ঘোষণা তার সঙ্গে সরকারের আইনের এ ধারা কন্ট্রাডিক্টরি”। এইচআরডব্লিউ  এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া খসড়া আইনটি পাস হলে মেয়েদের আরও বেশি বাল্যবিয়ের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হবে। রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে ওই বিল বাতিল করা সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব।
ইউনিসেফের সবশেষ হিসেবে বাংলাদেশে ৫২.৩% মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। আর ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয় ১৮.১ শতাংশের। ১৮ বছরের আগে বিয়ের দেয়ার ক্ষেত্রে পৃথিবীর শীর্ষে অবস্থানকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম এবং ১৫ বছরের আগের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ৬ষ্ঠ অবস্থানে। ইউনিসেফের তথ্য বলছে কুড়ি বছরের আগে মেয়েরা সন্তান জন্ম না দিলে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৩ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা পাবে।
বাংলাদেশের সামাজিক অনেক সূচকেই গর্ব করার মত সাফল্য রয়েছে। তবে বাল্য বিয়ের ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই হতাশাজনক। এটা কর্মপরিকল্পনা এবং কৌশলের কোনো ব্যত্যয় হতে পারে। জনমানুষের কাছে স্বাস্থ্য শিক্ষার মত তথ্য-উপাত্ত সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় নি। তারপরেও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্কট সমাজে রয়েই গেছে। মানুষের মধ্যে সামজিক আস্থা সৃষ্টির জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সদিচ্ছার প্রয়োজন ছিল তা বার বার ব্যাহত হয়েছে। সমাজে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছেÑ একাই সাথে ধর্মীয় গোড়ামি সামাজিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির  সৃষ্টি করেছে। এখান থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করাই হবে সঠিক গন্তব্যের ঠিকানা। কিন্তু নৈতিক অবস্থান যদি ভঙ্গুর হয় তা হলে বিপর্যয়- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সমূহ আশংকা থাকে। জ্ঞাতসারেই আইনের ফাঁকফোকর রেখে দেয়ার অর্থই হলো যে, যারা আইনটি মানবেন না তারা ওই ফাঁকফোকরের মধ্যেই সমঝোতা-মীমাংসার পথ খুঁজে নিবে। নারীর সর্বোত্তম স্বার্থকেই যদি সুরক্ষা দিতে চাই, তাহলে এই ফাঁক ফোকেরের মধ্যে কাউকে সুযোগ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে গন্য হতে পারে না। নৈতিক অবস্থান সটান রাখাটাই স্বাভাবিক ও উত্তম। কিন্তু ”নারীর সর্বোত্তম স্বার্থ” রক্ষার নামে নৈতিক অবস্থানকে শিথিল করে কাক্সিক্ষত ফল আশা করাটা ঠিক হবে না। বরং এর মধ্যে দিয়ে অনৈতিক প্রবণতাই উৎসাহিত হতে পারে। নিশ্চয় এই পরিস্থিতি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ