বাড়ন্ত বালিকার ঘর-সংসার

আপডেট: October 2, 2020, 12:15 am

চন্দন আনোয়ার:


বোশেখের প্রথম সকালে লালচে রোদ উঠেছে। দুপুর হতেই মগজধোয়া আগুনরোদ কাউকেই ঘর হতে বেরুতে দেয়নি। সূর্য পশ্চিম আকাশে গা হেলিয়ে যে-ই না আয়েশ করতে গেল, তখনি লাটিমের মতো ঘুরেঘুরে বাতাস কুণ্ডলি পাকাতে শুরু করেছে ঝাউতলি বিলের মধ্যিখানে। মুহূর্তেই সাঁইসাঁই শব্দ তুলে কালোঝড় উঠে আসছে লোকালয়ে। অন্ধকার দ্রৌপদীর শাড়ির মতো প্যাঁচিয়ে ধরছে আকাশের দিগম্বর শরীর। সিদ্দিকের বাড়ির দুই চালা টিনের ঘর ফড়ফড় শব্দ করে ভয়ানক হুলস্থূল বাঁধিয়ে দিয়েছে। চৈতি ভামিনী সাদা চুল উড়িয়ে বিলাপ করে ঘরে ফিরছে-এই বোশেখ খাবে রে! এই বোশেখের ধাত্ ভাল না রে! এই তোরা সব সাবধান অ! সাবধান অ তোরা! হাজি বাড়ির হালের বলদেরা লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে বাতাসের আগে আগে দৌড়াচ্ছে। পিছনে হাতেম রাখাল বাতাসে বুক পেতে কুস্তি লড়াই করে উলটপালট হয়ে পড়েছে, উঠছে আর দৌড়াচ্ছে। শিমুলতলি স্কুল মাঠে মেলা বসেছে। ঝড় সেদিকেই বেশি ছুটেছে ভীষণভাবে।
ঠিক এই সময়ে গ্রামের প্রান্তসীমানার মাঠসংলগ্ন বাড়ির ছালামতের মেয়ে শাহিদা বায়না ধরেছে, ‘মাগে, হামি মেলায় যাবো।’ মাথায় হাত উঠে মা রমিজা খাতুনের ছুঁড়িটা বলে কী রে! মরতে সাধ জাগ্যাছে! তাঁর মুখ থেকে কথা পড়তে না পড়তেই দপ করে ঝড় থেমে গেল। বিস্ময়ে চোখ উলটে বলে, ‘অ্যা! ছুঁড়ি তুই মন্ত্র পড়লি নাকি?’
চুলের দুটো বেণি চাবুকের মতো দুই কাঁধে ফেলে, ঢেউতোলা কচি ঠোঁটে খয়েরি লিপিস্টিক কটকটে করে লেপটে, রমিজা খাতুনের বার হাত হলুদ শাড়ি লকলকে বাড়ন্ত শরীরে অগোছালোভাবে জড়িয়ে -প্যাঁচিয়ে উঠোনের ঠিক মধ্যিখানে এসে দাঁড়াল শাহিদা। লাজে মরমে মরতে লাগল। মার দিকে তাকাতে পারছে না। বাচ্চাদের নিয়ে মাটি হুগলাচ্ছে এক মা মুরগি, সেদিকে চোখ করে শাহিদা বলল, ‘মাগে হামি গেনু!’ রমিজা খাতুন চুলা থেকে মুখ উঁচিয়ে অ্যা বলে চমকায় ‘হাঁরে শাহিদা, তুই বউ সাজলি যে!’ চোখ টিপে ঠোঁট কামড়ে হাসে রমিজা খাতুন। লজ্জাবতী লতার মতো কুঁকড়ে বেঁকেচুরে গোল হয়ে আসে শাহিদার লকলকে শরীর।
‘মেলা যাছিস হাঁর লাইগ্যা কী আনবি?’ রমিজা খাতুন বলে।
শাহিদা আর দাঁড়াতে পারল না। হি হি হাসির বিদ্যুৎচ্ছটা ছড়াতে ছড়াতে দৌড়াল। সেই হাসি তোলপাড় করে মায়ের মন!
খুচরো আঁধার তিরতির করে নামতে নামতে এখন পুরোদস্তুর রাতের সন্ধ্যা। অন্ধকার ধেয়ে আসছে সুনামির মতো। বছরের প্রথম সন্ধ্যা! অকস্মাৎ পুব আকাশে কালবৈশাখের ঝড় দৌড়তে বেড়াতে লাগল। মুহূর্তেই দশ দিগন্ত কাঁপিয়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঘন আঁধার মায়াবি চাদর বিছিয়ে নিজের অধিকারে নিয়ে নিল গ্রামের পথ-মাঠ। রমিজা খাতুনের উঠোনেও থকথক করছে অন্ধকার। মেলা ভাঙা মানুষের ঢল পথে, হুড়োহুড়ি করে দৌড়াচ্ছে মানুষেরা। ওদিকে সিদ্দিকের ঘরের টিন খুঁটি ছিঁড়ে পাড়া বেড়াতে বেরিয়ে গেল। জব্বারের বউটা অর্ধেক শরীর ঘরে বাকি অর্ধেক বাইরে ফেলে, ‘হামারে বাঁচাও জি, হামারে বাঁচাও জি’ -বলে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। ঝড় দেখলেই মেয়েমানুষটা এমন করে। এরইমধ্যে রমিজা খাতুনের ভিতরের ঝড় বাইরের ঝড়ের চেয়ে বেশি তাণ্ডব চালাতে লাগল। ছুঁড়িটা এখনও যে ঘরে ফিরল না!

ঝড়ের বেগে বাড়িতে ঢুকেই ছালামত বলে, ‘ছুঁড়িটা আম কুড়াতে গেছে নাকি?’ রমিজা খাতুন ঢেকুর গিলে বলে, ‘হয়! ছুঁড়িটা কি হাঁর কুনু কথা শুনে।’ ছালামত বজ্রের মতো ধমকিয়ে ওঠে, ‘মাগিটা ছুঁড়িটাকে খ্যালে! কবে কুণ্ঠে বনে-বাঁদাড়ে পড়ে মরবে! হারামি মাগি কুণ্ঠেকার! আকাশে কালবুড়ি উঠ্যাছে। আইজ ছুঁড়িটাকে কাটবো, তুকেও আস্তো থুবো না। হারামি মাগি!’
ঝড়ের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল রমিজা খাতুন। হাতের কুপিটা নিভে নিভে করে একেবারে নিভেই গেল। অন্ধকারে পথ এগুচ্ছে হাত আন্দাজে। বেপরোয়া ঝড় মরিয়া হয়ে উঠেছে শরীরের কাপড় খুলে নিয়ে একেবারে দিগম্বর করে ফেলতে। দুইহাত যেন যথেষ্ট নয় মেয়ে মানুষটার। বুকের কাপড় টেনে ধরে তো পরনের কাপড় উঠে আসে হাঁটুর উপরে। অন্ধকারই এখন আবরু রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। দুই বাঁশঝাড়ের মধ্যের সরুপথে এসে রমিজা খাতুনের পা আটকে আসে। এক অদ্ভুত ভয়ে রক্ত শিরশির করে ওঠে। চিকন কণ্ঠের মিহি কান্নার আওয়াজ বাতাসে থইথই করে ভাসছে। সম্ভবত বাঁশের শুকনো পাতায় পা ফেলে মচমচ শব্দ করে কেউ একজন হাঁটছে। তিনদিন আগে করিমের ছোটবউ ফাঁস নিয়েছে। রমিজা খাতুনের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জো! রক্ত হিম হয়ে আসে। বাতাসের ঢেউয়ে ঢেউয়ে শাহিদার হি হি শব্দ কানে ঠেকলে রমিজা খাতুন বুকে থু-ফু দিয়ে আল্লারে ডেকে অস্ফুট আওয়াজ করে।
‘হাঁরে শাহিদা নাকি রে?’ রমিজা খাতুন বলে।
-হয়। হি হি হি! মা, তুই ডরিয়্যাছিস নাকি?
– তোর বাপে কাটবে আইজ! ছুঁড়ি তুই কুণ্ঠে ছিলি?
-বাপ আইস্যাছে নাকি?’
-আইস্যাছে।
– মা, হামার কথা পুঁচ করলে তুই কহিছ, সইয়ের বাড়ি গেছিল।
-মিনসেটা দা লিয়্যা বইস্যা আছে খিড়কিতে! ছুঁড়ি
তুই পিছনে হামার সোঁতে সাপের মতন প্যাঁচিয়ে থাকবি।
শাহিদা হি হি করে হাসল।
-তুই বেটা ছাইল্যা হতি পারলি না!
শাহিদা ফের হি হি করে হাসল।
-তুই মরলে হামি বাঁচবো! হা[-জ্বালানি কুণ্ঠেকার!
ঝড় থেমে গেল। বাঁশ ঝাড়ের ভিতর থেকে শিরশির শব্দ করে বাতাস আসছে। ঢিপঢিপ-করা বুক সামলে রমিজা খাতুন বাতাসে কান রাখে, চিকন কণ্ঠের কান্না শোনার চেষ্টা করে। ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে যেন ক্রন্দনরত এক যুবতীর পা ফেলার শব্দ। সরুপথটায় বৃষ্টিধোয়া অন্ধকার টলমল করছে। অন্ধকার নাড়িয়ে হি হি করে হেসে উঠে শাহিদা বলে, ‘মাগে, হামার গাটা কি আম গাছ হইয়া গ্যালো নাকি।’
ছুুঁড়ির কথার ভ্যাস শুনছো! রমিজা খাতুন পায়ে পায়ে এগোয়।
-হ্যাঁগে মা, আসলিই কহিছি! তুই দ্যাখ, হামার বুকে আমের গুটি হইয়্যাছে।
রমিজা খাতুনের হাত টেনে বুকের জমিনে সদ্য জাগা ফাঁপা বেলুনের মতো টগবগে স্তনজোড়ায় ঠেকায়। কারেন্টে শক খেয়ে হাত যেন হামলে উঠল। হামলে উঠল রমিজা খাতুনের ভয়ার্ত বুক ও শরীর।

এরপর হতে মেয়ে খালি হিহি করে হাসে। বাঁধভাঙা সেই হাসি রমিজা খাতুনের ভিতরে বারুদের মতো দাউদাউ করে জ্বলে। সর্বনাশের আলামত চোখের মণিজোড়ায়! দেমাগে মেয়েটা যাকে-তাকে ধমকায়। শাসায়। একটু আড়াল পেলেই কামিজ উঁচিয়ে বুক দেখে! সুযোগ পেলেই দেয় দৌড়! এক অদ্ভুত মোহে পেয়েছে! শরীরই তার সবচেয়ে বড় আশ্চর্য! বারেবারে ফিরে ফিরে শরীর দেখে। কতগুলো উদ্ভট উপসর্গ মেয়েটার শরীর জুড়ে দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে।
রমিজা খাতুন ভাবে, ভারি বিপদে পড়া গেল! ছুঁড়ি তো মুখে চুনকালি দিয়ে ছাড়বে! ধমকে-ধামকে কাজ হচ্ছে না। শাহিদা হিহি করে বিরতিহীন হাসি দিতে দিতে বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণীর মতো পালায়! রমিজা খাতুনের বুক থেকে গলা পর্যন্ত শুকিয়ে খটখটে হয়ে আসে ভয়ে! হাসির লক্ষণ মন্দা!
ফাল্গুন মাসে মেয়েটা আর ঘরে থাকতেই চায় না। বসন্তের দুরন্ত বাতাসে ফড়ফড় করে উড়ে পাতলা ছিপছিপে শাহিদা। চুল আউলা করে হিহি করে হাসে, যাকে তাকে দেখলেই হিহি করে ওঠে। বনে-বাঁদাড়ে, পথে-মাঠে যেখানে-সেখানে দৌড়ে বেড়ায়। গুটি আমের মতো স্তন জোড়াকে আড়াল করবার জন্য ধনুকের মতো সামান্য বাঁকা হয়ে দৌড়ায়। আড়াল তো হয় না বরং বেশি করে শিকারি ঘুঘুর মতো অসংখ্য চোখ ডেকে আনে ও দুটো। রাস্তার ধারের লা-ওয়ারিশ আম গাছের মতো যার সামনেই পড়ছে সে-ই একটা করে ঢিল ছুঁড়ছে গুটি আমে।
কফিলুদ্দি মাতব্বরের সামনে পড়লেই বলবে, ‘হাঁরে শাহিদা, চল হামারগে বাড়ি। তোর নানি কহিছে য্যাতে!’
শাহিদা হি হি করে হাসবে তখন।
ইউনুছ কবিরাজের সামনে পড়লেই মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিতে দিতে বলবে, ‘যা ছুঁড়ি তোকে হাওয়া বাতাসে ধরবে না।’ বাবরি চুলের ভাঁজে ভাঁজে শিরশির করে ওঠে কবিরাজের।
শাহিদা হি হি হাসে তখন।
মুদির দোকানের সামনে দাঁড়ালে দোকানি হাসান বলে, ‘হাঁজি শাহিদা, জ্যানা ম্যানা কিছু-মিছু খাব্যা নাকি!’
শাহিদা হি হি করে হাসে।
কলেজের ছোঁকরারা চিলের মতো ছোঁ মেরে কী করে মোরগছানাকে ধরা যায় সেই ধান্ধায় শিকারি বিড়ালের মতো ওঁৎ পেতে থাকে। আড়াল পেলেই বলে, ‘হাঁরে শাহিদা, হামি তোকে! বুঝিসনি! হামি তোকে! বুঝিসনি নাকি!’
ছুরির ফলার মতো চকচকে হাসি দিয়ে ছোঁকরাদের কলিজা দু’ফালা করে দৌড় দিবে শাহিদা।
‘দারণ ফাল্গুন মাস ছুঁড়িটারে খাইল! ছুঁড়িটা মরলো জে! কিছুতেই ঘরে থাকছে না। মিনসেটা কুনদিন জে ছুঁড়িটাকে কাটবে! কিছু কহিছে না। খালি দেখিছে!’ ঘরে সন্ধ্যা বাতি দিতে দিতে বিলাপ করে রমিজা খাতুন। প্রায়ই সন্ধ্যা ঘন হয়ে গাঢ় অন্ধকার নামে উঠোনে, শাহিদা তখন পাড়া ছাড়ে। বাতাসে হি হি শব্দ শুনলে দৌড়ে সামনের রাস্তাটায় দাঁড়ায় রমিজা খাতুন। শাহিদা কাছে আসলে চাপা কণ্ঠে বলে, ‘হাড়-জ্বলুনি পোড়ামুখি! তুই নাঙের বাড়ি থুইয়্যা আইছাছিস ক্যানে? থাকতে পারলি না?’ শাহিদা হিহি করে হেসে ওঠে। সে লজ্জা পায়।
অবশেষে একদিন শাহিদার বাপ ছালামত সত্যিই ক্ষেপেছে। ভূতের মতন ছায়া দূর হতে উঠোন হুগলাচ্ছে দেখে পাক খেয়ে ওঠে রমিজা খাতুনের বত্রিশ নাড়ি! ঠাণ্ডা মানুষ-ক্ষেপলে খুন-খারাবি কি ছাই! শাহিদাকে আঁচলে ঢেকে দুহাতে পিঠে চেপে পা টিপে টিপে উঠোনে পা ফেলতেই চোর ধরার মতো এক লাফে দুই হাতে দুই মেয়েমানুষের চুল ধরে টেনে উঠোনের মধ্যিখানে আছড়ে ফেলে ছালামত। রমিজা খাতুন পা প্যাঁচিয়ে ধরে- ‘হাঁজি শাহিদার বাপ! হামার একটা মাইয়া।’
ছালামত বুনোজন্তুর মতো অস্ফুট আওয়াজ তুলে প্রাণপণে পা ঝাড়ে। মেয়েমানুষটা জনমের শক্তি দিয়ে বুকের পাঁজর দিয়ে পুরুষের পা দুটো বেঁধে ফেলেছে। নড়তে না পেরে উপুড় হয়ে দড়াম দড়াম করে পিঠে-পেটে কিল-ঘুষি-লাথি ননস্টপ চালিয়ে যায়- ‘খানকি মাগি! হারামি মাইয়া ছাইল্যা কুণ্ঠেকার! এত কইর‌্যা কহিনু ছুঁড়িটার পায়ে দড়ি দে। তোর লাইগ্যা ছুঁড়িটা মরবে বনে-বাঁদাড়ে।’ খুব বেশি পিটাতে পারল না ছালামত। নিজের শরীর কাঁপছে।
দুপুর রাত পর্যন্ত ছালামতের পা ধরে বসে থাকে রমিজা খাতুন। অঝোরে কেঁদে আকুল মিনতি জানায়, ‘হাঁজি, তুমি এত বড় সর্বনাশ করো না! দুধের শিশু!’ ছালামত খেপা কুকুরের মতো খেউ করে ওঠে, ‘মাইয়া ছাইল্যা ফের দুধের শিশু কী? হামি যুত সদরুদ্দিনের ব্যাটা হয়্যাছি তাহিলে কাল দিনে দিনে তুর মাইয়া বাড়ি থাইক্যা বাইর করছি দেখবি; তারপরে পেটে দানা পানি দিবো। তুই বেশি বাঁধাবাঁধি করলে তোকেও বাড়ি থাইকা বাইর করবো। হামাকে চিনিছ না তো। আমি সদরুদ্দিনের ব্যাটা। আমার বাপ চারটো বিয়্যা কইর‌্যাছে।’
রমিজা খাতুন মুখে কুলুপ এঁটে নিল।
এই খবরে রাতেই আসার কথা রহিম ঘটকের। বৃষ্টির রাতে ঘর থেকে বেরুতে পারেনি। একদিকে মসজিদে ফজরের আযান চলছে, অন্যদিকে ছালামতের উঠোনে দাঁড়িয়ে সমস্বরে হাঁকডাক ছাড়ছে রহিম ঘটক, ‘ছদুর ব্যাটা এখনো ঘুমাও!’ লাল চোখ টানতে টানতে ছালামত ঘর থেকে বের হয়- ‘হাঁজি তুমি কেমন ঘটক, দেইখবো। বেলায় বেলায় মাইয়া বিহ্যা দিবো। পাইরবা কি? কত টাকা চাহো?’
রহিম ঘটক চড়ক নাচন নাচতে নাচতে বলে, ‘তুমি বাড়ি থাইকবা! রহিম ঘটকের কেরামতি দেইখবা!’
বিছানায় হামলে পড়ে বুক চাপড়ায় রমিজা খাতুন- ‘গিধনির চোখ পইড়াছে! এইবার নিস্তার নাই। মিনসেটা ক্ষেপেছে! হায় আল্লা রে হামি কী করি রে!’
রহিম ঘটক তার কেরামতির প্রমাণস্বরূপ দুপুর হতে না হতেই ত্রিশ-বত্রিশ বছরের এক তাগড়া পালোয়ান সাইজের মহিষ রঙের এক পুষ্টপুরুষ নিয়ে উপস্থিত। যেন আফ্রিকার জঙ্গল থেকে এই মাত্র আমদানিকৃত। বিতিকিচ্ছি চেহারা। এত কালো মানুষ হয় নাকি! মুখে বহু শরিকের জমির মতো অসংখ্য আইল পড়েছে। কালো শক্ত শরীরের মাংসের ভাঁজে ভাঁজে দৈত্যের শক্তি দৌড়ে বেড়চ্ছে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক দেখেই রমিজা খাতুন আঁতকে ওঠে।
এরইমধ্যে প্রথম দফা পাড়া দাপিয়ে হি হি করে বাড়িতে ঢুকতে গিয়েই শাহিদা ভূত দেখার মতো চমকাল! ভূতের মতো বিদঘুটে মানুষটাকে দেখে ওর ভিতরে ভীষণ কৌতূহল জাগল। চোখের কাছে মুখ নিয়ে ভাল করে দেখে নিল, কোন জাতের প্রাণী! একদৌড়ে রমিজা খাতুনের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, ‘মাগে, ভূইষের মতো মানুষ!’ শাহিদার মাথা লাশের মতো বুকে ঠেঁসে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে রমিজা খাতুন। পিছনে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে ছালামত। তীব্র আক্রোশে রমিজা খাতুন গর্জন করে ওঠে, ‘ভূইষের মতো ব্যাটাছ্যালার সোঁতেৃ! হামার বেটি বাঁচবে না! হামার বেটির কতটুক্ শইরল? হামার বেটির এক টুকুন শইরল!’

ছালামতের ইচ্ছামত সব ঘটে গেল। শাহিদাকে বেলায় বেলায় বাড়ি ছাড়তে হল। তারপর পেটে ভাত দিল ছালামত।
সন্ধ্যা নামতেই শাহিদার মন আনচান করে ঘরে ফিরতে। ছোট্ট ছাগলছানার মতোই দৌড়ে পালাবার পথ খোঁজে! ঝড়ে পথ হারানো পাখির ন্যায় ডানা ঝাপটায়। অবোধ বালিকা জানে না, কতদূর সে এসেছে? কতদূর এলে ফিরে যাওয়া যায় না? এখান থেকে ফেরার পথ কোনটা? কী অপরাধে ওকে এইখানে নির্বাসনে পাঠানো হল? কি ই বা করবে সে এই ভিন্ বাড়ি! ওরা কারা? পথ আগাতে মা কি আসবে না? বেলা যে পড়ে গেল। রাত যে হয়ে এলো! বালিকার জিজ্ঞাসু চোখে এখন শুধুই অন্ধকার ঢেউ খেলে বেড়াচ্ছে।
অন্ধকার নামে ঘর-দোর-উঠোনে। লাল শাড়িতে পুতুলের মতো জড়ানো-প্যাঁচানো শাহিদাকে পাঁজাকোলা করে দক্ষিণের ঘরে রেখে আসা হল। চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট চিত্তে মাকে ডাকে শাহিদা। টিমটিম করে কুপি জ্বলছে। মহিষের মতো মানুষটাকে ঘরে ঢুকতে দেখে মুখ আলুপোড়ার মতো কালচে হয়ে গেল ভয়ে। সাপাট বন্ধ হল দরজা। লাল মাড়ি বের করে হাসি দিতে দিতে মহিষকে এগোতে দেখে শাহিদা বিকট শব্দে চিৎকার দিতে চাইল! ততক্ষণে ঘরে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঘরের কুপিটা নিভে গেল। মহিষের মতো কালো মানুষটাকে চোখে দেখছে না শাহিদা। টানা টানা নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছে। শব্দটি একটু একটু করে ওর দিকেই এগুচ্ছে। এবার নিঃশ্বাসের গরম বাতাস শাহিদার নিঃশ্বাসে ঢুকে পড়ছে। অন্ধকারে এগিয়ে আসা একটা হাত শরীরে পড়তেই শিউরে উঠল। মা কি তবে আসল! বুক ঠেলে অভিমানী কান্নায় ভেঙে পড়ল শাহিদা- ‘মাগে, হাঁকে লিহে যা, হামি কুনোদিন পাড়ায় যাবো না।’ অন্ধকারে ঝুঁকে আসে মায়ের বুকে মাথা রাখতে। লোহার মতো শক্ত হাত দিয়ে দৈত্যের মতো শক্তিতে শাহিদার শরীর প্যাঁচিয়ে ধরে অন্ধকারের মানুষটা। ডাকু শিয়ালের মুখে পড়া মুরগির মতো বালিকা ডানা ঝাপটায় কিন্তু নড়তে পারে না। গুটি আমের মতো নব উত্থিত বুকের স্তন যুগলে ডাকু শিয়াল প্রথমে হিংস্র দাঁতে কামড় বসায়! শাহিদা ‘মাগে’ বলে কঁকিয়ে ওঠে। মুহূর্তেই মানুষটা সর্বশরীর চাপিয়ে দিল বালিকার সাড়ে চার ফুট শরীরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গরু জবাই করার লম্বা ধারালো ছুরির মতো একটা শক্ত লম্বা ছুরি শাহিদার দুই উরুর মাঝখানে ঢুকাতে সমানে পোছ চালাতে লাগল। গলায় ছুরি চালানো গরুর মতোই অস্ফুট আওয়াজ তুলে দপ করে জ্বলে উঠা উনুনের আগুনের মতো একবারই মরণ চিৎকার দিয়ে শান্ত হয়ে গেল শাহিদা।
বহু চেষ্টাতেও ছুরি প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে ঘরের বাইরে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো গর্জন করে উঠল মহিষটা।
পরদিন শাহিদাকে ভ্যানে করে বাপের উঠোনে ফেলে গেল। মাজা ভাঙা বিড়ালের মতো দেহটাকে উঠোনেই হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে নির্বাক রমিজা খাতুনের কোলে এসে মাথা ফেলল-‘মাগে!’
নিথর পাথরের মতো চোখ করে ছালামত চেয়ে রইল মাজাভাঙা শাহিদার দিকে! চোখ ভারী হয়ে আসে।
পরিচিত উঠোনে ধীরে ধীরে রাত নেমে আসলে ভয়ে কুঁকড়েমুকড়ে আসে শাহিদা, ‘মাগে, হাঁর সোঁতে থাকবি!’ রমিজা খাতুন সোহাগে হাত বুলায়! শাহিদা নিশ্চিন্তে চোখ বুঁজে!
অন্ধকারে চোখ পেতে ছালামত বসে রইল উঠোনে। বাড়ির সামনের ডোবাটা হতে থেকে থেকে শিয়াল ডেকে উঠছে। চৈতি ভামিনীর ঘরের কুপিটা বাতাসে নিভে আর জ্বলে। একটা অপরাধ চিন্তা এসে পাঁজর ভেঙে দিচ্ছে ছালামতের। জেদে পড়ে নিজের আত্মজাকে এভাবে মরণের পথে ঠেলে দিল! নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলে অবোধ পশুর মতো গোঙিয়ে ওঠে বাতাস পাবার জন্য। বড় চোটে বড় নীরব! রমিজা খাতুন বুকের দুটো সুউচ্চ টিলার মধ্যিখানে ছালামতের মুখ ফেলে নিশ্চিত নিরাপত্তার উত্তাপ ছড়াতে ছড়াতে বলে, ‘কাঁদছো কেনে শাহিদার বাপ? হামার বুক ফাইটা যাইচে! একটা মাইয়া হামার!’ ছালামত শান্ত দৈববাণীর মতো উচ্চারণ করে, ‘চৈতি ভামিনীর চোহে নিদ নাই! নিদ নাই চৈতি ভামিনীর চোহে! নিদ নাই! ক্যানে জানিস শাহিদার মা? জানিস ক্যানে? ও তো মানুষ লয়! ও তো ডাইনি! নিজে গলা টিপে মাইর‌্যাছে নিজের মাইয়াকে!’ বিল থেকে হঠাৎ ঠাণ্ডা হাওয়া উঠে আসছে। ছালামতের বুক আকুলি-বিকুলি করে ওঠে সেই হাওয়া নিতে!
অকস্মাৎ নিস্তেজ রাত কাঁপিয়ে ঘুম থেকে শাহিদা চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘মাগে!’
রমিজা খাতুন এক লাফে হুমড়ি খেয়ে পড়ে শাহিদার উপরে, ‘মারে! হ্যাঁরে মা শাহিদা!’
‘ভূইষ! ভূইষ! ভূইষ!’ শাহিদা বিড়বিড় করে। রমিজা খাতুন হায় হায় করে ওঠে, ‘কী হোইল আল্লা!’
শাহিদার চোখের পাতা সামান্য ফাঁক, সোজা হয়ে মৃতবৎ পড়ে আছে। রমিজা খাতুন আঁচলে মুখ মুছে। উপুড় হয়ে শুয়ে মেয়েকে কলিজার ভিতরে প প্রবেশ করিয়ে বলে, ‘মা, তোর কী হয়্যাছে?’
রমিজা খাতুনের কলিজা ফাটিয়ে শাহিদা চেঁচিয়ে উঠল, ‘মাগে! হামাক বাঁচা! মাগে হামাকে বাঁচা! ভূইষ! ভূইষ! ভূইষ!’
ছালামত এগিয়ে আসে— ‘মারে, হাঁকে মাপ কইরা দে! হামি তোকে মাইরা ফেলেছি!’
‘মাগে হামার প্যাট ফাইটা গেছে! মাগে হামার প্যাট কাট্যা ফেলছে! মাগে হামার প্যাটে ছুরি ঢুকাইছে! ও মাগে! ও মাগে! ও মাগে!’ শাহিদা চরম নীরব হয়ে মাথা ফেলে দিল।