বায়ু দূষণ : প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ

আপডেট: January 14, 2021, 12:14 am

আব্দুল মজিদ:


যে সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয় পৃথিবীর বিভিন্ন জীবজন্তুসহ মানুষকেও সাংহাতিকভাবে বিপদগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করে তার মধ্যে বায়ুদূষণ অন্যতম। কারণ বায়ু দূষণের ক্ষতিটা ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আইলা, সিডর, ভূমিকম্প ইত্যাদির মতো তাৎক্ষণিকভাবে গোচরীভুত হয়না ঠিকই কিন্তু এর তীব্রতাও কম নয়। বলা যায় স্লো পয়জনিংয়ের মতো আস্তে-ধীরে কুড়ে কুড়ে খায়। যান্ত্রিক ও নগর সভ্যতার ক্রমোন্নতির সাথে সাথে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও ইটভাটাসহ হাজারো রকমের কলকারখানার চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া এসে মিশে যায় আমাদের চারপাশে বেষ্টন করে থাকা বায়ুম-লে। আর এই বায়ুম-লকে আশ্রয় করেই বর্তমান বিশ্বসভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বলা যায় উঠছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির দীর্ঘ এই পথ বেয়ে নগর ও গ্রামীণ সভ্যতার প্রসার যতটা ঘটেছে, ঠিক ততোটাই উপেক্ষিত থেকে গেছে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে সংঘটিত এ বায়ুদূষণ। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণে বায়ু দূষণের বিষয়টি বর্তমান সময়ে মানুষের সামনে বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ WHO ( হু)’ ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক বায়ুর গুণাগুণ বিশ্লেষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক প্রকল্প গ্রহণ করে। বর্তমানে পৃথিবীর ৫০টি দেশ এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছে। বায়ুদূষণ এবং এর কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে চলছে নিরন্তর গবেষণা। গবেষণালব্ধ জ্ঞান, তথ্য, উপাত্ত ব্যবহারের মাধ্যমে আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কিত নানা বিষয়ে সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। দূষণ ও দূষক সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। যে সমস্ত পদার্থ বায়ুদূষণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে সেগুলো হলো-
কার্বনডাই-অক্সাইড : কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে তৈরি হয়;
ক্লোরোফ্লুরোকার্বন(সিএফসি)- সাধারণত রেডিয়েটার ও এয়ারকন্ডিশিং মেসিন থেকে নির্গত হয়। এটি বায়ুম-লের উপরের দিকে অবস্থিত ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করে বিধায় সূর্য থেকে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রস্মি সহজেই পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছে;
লেড বা সিসা : লেড ব্যাটারি,পেট্রোল,ডিজেল, হেয়ার ডাই, রং ইত্যাদি থেকে আসে। এটি স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে;
ওজোন : বায়ুমন্ডলের উচ্চস্তরে থাকা ওজোন গ্যাস ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিহত করে কিন্তু মাটির কাছাকাছি কলকারখানা, যানবাহন থেকে নির্গত অতিরিক্ত ওজোন গ্যাস ঠান্ডা লাগার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে নিউমোনিয়া রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে;
নাইট্রোজেন অক্সাইড : পেট্রোল,কয়লা,ডিজেল পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট যা অ্যাসিড বৃষ্টির কারণ;
এসপিএম : ধোঁয়া,ধুলো,বাস্প এবং একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে বাতাসে ভেসে থাকা কঠিন পদার্থের কণাকে এসপিএম ( সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট মেটার) বলে। এগুলোই বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এ ধরনের পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা ফুসফুসে প্রবেশ করে শরীরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ ফুসফুসের ক্ষতিসহ রক্তশূন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সালফার ডাই-অক্সাইড : মূলত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট যা অ্যাসিড বৃষ্টি ও ধোঁয়াশা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। উল্লিখিত পদার্থগুলোই বায়ুম-লকে এক বিপজ্জনক অবস্থার দিকে নিয়ে চলেছে।

ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ঘিরে থাকা যে বায়ুম-ল ‘WHO (হু) ‘ এর গবেষণা তাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। কারণ এ বায়ুস্তরই মানবজীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে প্রতি মুহূর্তে সম্পর্কিত। দূষণস্তর বা এর মাত্রা বিষয়ক গবেষণার পাশাপাশি খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে কীভাবে এ দূষণকে বিপদসীমার নীচে নামিয়ে আনা যায়। সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ নিরূপণের জন্য অ্যাসিডোমেট্রিক টাইট্রেশন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এছাড়াও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড পদ্ধতিসহ নানা রকম কাজ চলছে ‘WHO ( হু) ‘র নেতৃত্বে। পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে চাহিদার প্রেক্ষিতেই শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র যার বেশিরভাগই জনবহুল শহরাঞ্চলে। এ সমস্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর পরিত্যক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও ধোঁয়া দূষিত করে চলেছে চারপাশের জনবহুল আবাসন স্থানসমূহকে। ফলশ্রুতিতে বায়ুদূষণের মারাত্মক উপাদানগুলো আমাদের দেশের বিশেষ করে রাজধানী শহর ঢাকা এবং বাণিজ্যিক রাজধানী বলে খ্যাত চট্টগ্রাম শহরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোর বাতাসের নমুনা পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। ভারতের নাগপুরভিত্তিক একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণা কেন্দ্র বা ইনস্টিটিউট একটি বায়ুসমীক্ষা কর্মসূচি তৈরি করেছে। এ সংস্থা আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গার বায়ুস্তরের নমুনা সংগ্রহ করে বায়ু সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজনে। সংগৃহীত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এসপিএম দূষণ সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে লক্ষণীয় মাত্রায় রয়েছে। নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ অন্যান্য রাসায়নিক দূষণ ক্রমে ক্রমে বিপজ্জনক মাত্রার দিকে এগুচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানের এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো দেশে আবাসন ও বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কাজে লাগছে। আর এ সমস্ত বিষয় মাথায় রেখেই রাজশাহী মহানগরের বর্তমান নগরপিতা কর্তৃক নানা রকম পদক্ষেপ নেয়ার ফলে বাংলাদেশের মধ্যে গ্রিনসিটি ক্লিনসিটি হিসেবে রাজশাহী মহানগরী অনেক আগেই পরিচিতি লাভ করেছে বলেই বসে থাকার সুযোগ নাই। কারণ বায়ু তো কোনো নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। সুতরাং ব্যক্তিক ও সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি তথা রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশ কাল ভেদে সকলের স্বার্থেই বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন এখন খুবই জরুরি। তাই বায়ু দূষণমুক্ত রাখতে যা যা করা প্রয়োজন তা হলো-
১. বনসৃজন : অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার ওপর সবিশেষ নজর দেয়া উচিত। বাতাসে অক্সিজেন ও কার্বনডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় রাখতে বৃক্ষরাজির ভূমিকা অপরিসীম। ব্যক্তিগতভাবে সবার পক্ষে বন সৃষ্টি করা সম্ভব না হলেও অন্তত একটি দুটি গাছ রোপন করেও আমরা প্রত্যেকেই এই মহৎ কাজে অংশগ্রহণ করতে পারি;
২. অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার : জীবাস্ম জ্বালানি দহনে বাতাস বেশি দূষিত হয়। তাই এগুলির পরিবর্তে দূষণমুক্ত সৌরশক্তি, জোয়ারভাটার শক্তি,বায়ুশক্তি, পানির শক্তি প্রভৃতি ব্যবহার করা প্রয়োজন;
৩. বিশুদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার : সালফারবিহীন কয়লা ও সিসাবিহীন পেট্রোল ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সাহায্যে যানবাহন চালানো আবশ্যিক করে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়;
৪. বায়ুপরিশোধক যন্ত্র স্থাপন : বায়ুদূষণের উৎসগুলোতে বায়ুপরিশোধক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলে বায়ুদূষণের পরিমাণ হ্রাস পায়। শিল্পকারখানা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রভৃতির চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়াকে ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটরের মাধ্যমে শোধন করাসহ ক্যাটালাইটিক কনভার্টার বসিয়ে বায়ুদূষণ হ্রাস করা যায়;
৫. উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন : কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে যেমন কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব সার ও জৈব অর্থাৎ উদ্ভিজ কীটনাশক এবং শিল্পক্ষেত্রে ইটিপি স্থাপনসহ দূষণকারী কাঁচামাল ব্যবহার বন্ধ করেও বায়ুদূষণ হ্রাস করা সম্ভব;
৬. আইন প্রণয়ন : কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ দ্বারা ১৯৮১ সালে প্রণিত বায়ুদূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগ করে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে;
৭. জনসচেতনতা : সর্বশেষ তবে অকিঞ্চিৎকর নয় তো বটেই বরং বলা যায় বায়ুদূষণের উৎস বা কারণ এবং এর কুফল সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতাবোধ জাগিয়ে তুলতে পারলে বায়ুদূষণ কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব।
সুতরাং পরিশেষে যা বলতে চাই তা হলো পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কর্মপ্রবাহকে সুখময় ও সংশয়মুক্ত করতে হলে বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের দূষণ ও দূষকের ব্যাপারে আরও বেশি সজাগ ও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।
লেখক : প্রাক্তন ছাত্র ও শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।