বিএনপি নেতা মাইনুলের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি

আপডেট: নভেম্বর ১৮, ২০১৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



নিজ বাড়িতে জেলা বিএনপির সহসভাপতি খন্দকার মাইনুল ইসলাম (৫৯) মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, এমন দাবিতে অনড় রয়েছে তার পরিবার। তবে ঘটনাস্থলের আলামত ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ধরণ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে একমত হতে পারছে না পুলিশ।
এদিকে বিষয়টি নিশ্চিত হতে বুধবার রাতে নিহত মাইনুল ইসলামের ছেলে হেদায়েদুল ইসলাম (২৮), শ্যালক শাহীন আলম (৪০) ও বাড়ির এক কর্মচারিকে আটক করে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে। নগরীর বোয়ালিয়া থানায় রেখে গতকাল বিকেল পর্যন্ত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বিকেলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেয়া হয়। গতকাল বাদ জোহর নগরীর শাহ মথদুম ঈদগাহ মাঠে নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল, অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা, সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র শরিফুল ইসলাম বাবু, ওয়ার্কার্স পার্টির মহানগর সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু, বিএনপি নেতা আসলাম সরকার, নয় নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান বাবলু প্রমুখ। এরপর মাইনুল ইসলামকে নগরীর হেতমখাঁ গোরস্থানে দাফন করা হয়।
বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহাদত হোসেন খান বলেন, মাইনুল ইসলাম আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি জানা যাবে। নিহত ব্যক্তির ছেলেসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যগুলোও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়া পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোন মামলা করা হয় নি।
নগরীর হোসনীগঞ্জ এলাকায় ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনের দোতলা বাড়িটিই খন্দকার মাইনুল ইসলামের পৈত্রিক বাড়ি। বাড়িটিতে তিনি শুধু তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। সড়ক থেকে বাড়ির ভবন প্রায় ১০০ গজ দূরে। পুরো সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাড়ির সামনে দৃষ্টিনন্দন নানা গাছ ও ফুলের বাগান। বাড়ির বাইরে এক কোণে বসার জন্য একটি ঘর রয়েছে। ওই ঘরেই গুলিবিদ্ধ হন মাইনুল ইসলাম।
রাজশাহী ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শরীফুল ইসলাম জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বুধবার বেলা ২টা ১০ মিনিটে অচেতন অবস্থায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে করে মাইনুল ইসলামকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তার ইসিজি করে চিকিৎসক ঘোষণা দেন, হাসপাতালে পৌঁছার আগেই তিনি মারা গেছেন।
পরে মাইনুল ইসলামের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক এনামুল হক বলেন, মাথার বাম দিকে ৫-৬ মিলিমিটার ও ডান দিকে ১০-১২ মিলিমিটার ছিদ্র হয়েছে। এতে মনে হয়েছে, মাথার বাম দিক দিয়ে গুলি ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মাইনুল ইসলাম বাঁ-হাতি না হলে নিজের পক্ষে এভাবে গুলি করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ঘটনার পর পুলিশ, র‌্যাব ও সিআইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে নানা আলামত সংগ্রহ করেন। সেসব আলামত বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, মাইনুল ইসলাম আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, সিআইডির এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, মাইনুল ইসলাম যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, সেখানকার রক্তের দাগ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছিল। বাড়ির কলাপসিবল গেটের পাশে ফুলগাছের টবের আড়ালে পড়ে ছিল মাইনুল ইসলামের নাইনএমএম পিস্তলটি। বাড়ির পশ্চিম দেয়ালের পাশে একটি পানির ট্যাপ আছে। সেখানে রক্তাক্ত কোনো জিনিস ধোয়ার আলামত মিলেছে। জায়গাটি লাল হয়ে ছিল। তার পাশেই পড়ে ফুলের টবের আড়ালে পড়ে ছিল এক জোড়া স্যান্ডেল। তাতেও ছিল রক্তের দাগ। ঘটনাস্থলের পাশে একটি মাইক্রোবাস ছিল। একটি গুলি গাড়িটিতেও বিদ্ধ হয়েছে। জানালার নিচের একটু অংশে গাড়িটির দরজাও ফুটো হয়ে গেছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থলে তিনটি গুলির খোসা পাওয়া গেলেও মাইনুল ইসলামের শরীরে একটি গুলি লেগেছে। মাইনুল ইসলামের মৃত্যুতে তার পরিবারের সদস্যদের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। তারা দাবি করেছেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটানোর জন্য একটি গুলিই যথেষ্ট। তাছাড়া কোনো গুলি গাড়িতে গিয়েও বিদ্ধ হওয়ার কথা না। আর রক্ত ধুয়ে আলামত মুছে ফেলার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
গতকাল দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ গাড়িটি এখনও ঘটনাস্থলে আছে। মাইনুল ইসলামের বড় ভাই খন্দকার শহীদুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তিনটি প্রকল্পের কাজ করছিলেন  মাইনুল ইসলাম। সম্প্রতি পাউবো সে প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। এতে তিনি প্রচুর পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। প্রচুর টাকা ঋণ ছিল ব্যাংকে। এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে তার বাড়িসহ সম্পত্তি নিলামের নোটিশ দেয়া হয়। এসব নিয়ে তিনি প্রচ- মানসিক চাপে ছিলেন। আর এ কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
তবে মাইনুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ বলছেন, মাইনুল ইসলাম ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল প্রকৃতির মানুষ। তিনি রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচলক ও রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়া তিনি মহানগর বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি জেলা বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। এসব পদে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো মানসিক শক্তিও তার ছিল। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, এমন কথা মানতে পারছেন না তারা।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বলেন, মাইনুল ইসলামের মৃত্যু নিয়ে বড় ধরনের রহস্য দেখা দিয়েছে ঠিকই। তবে রহস্য উন্মোচন হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত, মাইনুল ইসলামের পিস্তলের পরীক্ষার ফরেনসিক প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই বলা যাবে, এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ