বিচারহীনতা

আপডেট: জানুয়ারি ৩০, ২০২০, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তার নিরপেক্ষ বিচার হবে-এটাই একটা দেশের স্বাভাবিক রীতির হওয়া উচিৎ। ব্যতিক্রম হলে বুঝতে হবে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি- আইনের জটিলতা আছে। কোথাও কোনো অন্যায় হলে তার প্রতিকার পাবার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত। বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে জনসাধারণ যে কোনো অন্যায়ের বিচার পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
আয়তনের তুলনায় এদেশে লোকসংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। ফলে বিশৃঙ্খলাও বেশি। এ বিশৃঙ্খলার কারণ শুধু জনসংখ্যাধিক্য তা-ই নয়Ñ প্রকৃতিগতভাবেই আমরা খানিকটা উদাসীন নিয়ম-কানুন বা আইন-শৃংঙ্খলার প্রতি। নিয়ম রক্ষা করার চেয়ে নিয়ম ভাঙ্গাতে আমরা বেশি সিদ্ধহস্ত-যার নজির পর্বতপ্রমাণ। প্রতিনিয়ত আমাদের চারিদিকে ঘটছে নানা অরাজকতা। খুন, গুম. ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সড়ক দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন, মিথ্যাচার, গুজবসহ নানা অনৈতিক কাজ সংঘটিত হচ্ছে অহরহ আমাদের চারিপাশে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিকার পান না ভুক্তভোগী। প্রতিকার পাবার চেষ্ট করলেও অনেকক্ষেত্রে ভিকটিম নানা হয়রানির শিকার হন। আর যদি সে আর্থিক কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল হয় তাহলে তো কথাই নেই। যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিতে যায় কোনো ভিকটিম তাহলে যারা আর্থিক বা সামাজিক বিচারে দুর্বল তাদের মামলা গ্রহণ করেন না তাঁরা। যদি গ্রাম্য সালিশে যায় তাহলে গ্রামের মোড়লরা মাতব্বররা দুর্বলদের ভয় দেখিয়ে বা শাসিয়ে বিষয়গুলো মিটিয়ে নিতে প্ররোচিত করেন। নতুবা সামান্য টাকা পয়সার বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে দেয়। কখনো কখনো থানা মামলা নিলেও প্রভাবশালীদের হুমকি-ধামকি আসতে থাকে মামলা তুলে নেবার জন্য। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে ভিকটিম মামলা তুলে নিতে বাধ্যও হন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকেনা। বিচার না হওয়ার ফলে অপরাধীর দৌরাত্ম আরো বাড়তে থাকে। একইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে সমাজে নানা অপরাধ।
অপরাধ প্রবণতা বাড়ার আর একটা কারণ হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ভিকটিম আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। শুধু তাই নয়, কোনো মামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ মারাও যান। ফলতঃ অনেক মামলা আপনা-আপনিই থেমে যায়। বিচার হয় না অপরাধীর। বিচারহীনতাও নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দেয়।
আমাদের বিচার ব্যবস্থায় নানা দুর্বলতা আছে। যে কারণে বিচার পেতে দেরি হয়। বিলম্বে বিচারের কারণে অনেক ভিকটিম বারংবার ভাবেন মামলা করার আগে। অনেকে নীরবে নিজ ক্ষতি স্বীকার করে নেন। তবুও মামলা থেকে দূরে থাকেন। একটা সময় এমনও হয়েছিল খুনিদের রক্ষা করার নামে ইনডেমনিটি আইন পাশ করা হয়-এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে তাদের পুরস্কৃত করা হয়। জাতি সে সব কথা ভুলে যায় নি। স্বাধীনতা বিরোধী এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নানাভাবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদে আসীন করা হয়। বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাশালী দেখিয়ে। খুনিদের যখন পুরস্কৃত করা হয়- নানা অপরাধ তখন আরো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
ইতিহাস পর্যালোচনা কররে দেখা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার টার্গেট হয়েছেন। স্রষ্টার অসীম কৃপায় তিনি সুস্থ আছেন। বেঁচে আছেন। জাতি ভুলে যায়নি ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের বোমা হামলার কথা। তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার এ বোমা হামলার বিচার তো করেই নি বরং এ ঘটনার সাথে যুক্ত নানা-আলামত নষ্ট করবার মতো ঘৃণ্য কাজের সাথে যুক্ত ছিলো।
১৯৮৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি শেখ হাসিনার চট্রগ্রামের লালদীঘির মাঠে জনসভা করার কথা ছিল। ওই দিন লালদীঘির ২০০ গজ দূরে কোতোয়ালি থানার মোড়ে পৌঁছালে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড়ে দাঁড়ানো পুলিশ শেখ হাসিনার ট্রাক লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ও টিয়ার শেল ছুঁড়তে থাকে-লক্ষ্য শেখ হাসিনা। সে ঘটনারও বিচার হয়নি তখন। সুদীর্ঘ ৩২ বছর পর ওই ঘটনার বিচার হয়। ওই ঘটনায় মারা যায় ২৪ জন নানা পর্যায়ের মানুষ।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিচার হয়নি। বিচার হওয়া তো দূরের কথা তখন বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র হয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়। এ হত্যাকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৭ জন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় বড় ঘটনার বিচার হতেই ৩২-৩৫ বছর লাগে। সেখানে সাধারণ মানুষের বিচার পাবার আশা দুরাশা মাত্র। বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি আমাদের রয়েছে তার প্রতিকার করা সম্ভব না হলে বাঙালির যে গৌরবোজ্জ্বল অর্জন তা ম্লান হয়ে যাবে। জাতির ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে বিচার ব্যবস্থার দিকে আইন মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি দেওয়া উচিৎ। আইনের যে সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি আছে সেগুলোর আশু সংশোধন প্রয়োজন। অনেক আইন আছে যেগুলো মান্ধাতা আমলের। সেগুলো সময়োপযোগী করা, বোধগম্য হয় সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। আইনের জটিল দিকগুলো পরিহার করে সহজ ভাষায় আইন প্রণয়ন করা উচিৎ। দীর্ঘসূত্রিতা বর্জন করে যতদূর সম্ভব স্বল্প সময়ে যাতে মামলার নিষ্পত্তি হয় সেদিকেও আইন বিভাগের নজর দেওয়া উচিৎ। সর্বোপরি যাতে মামলাগুলো সঠিক পথে পরিচালিত হয় সে বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিৎ। মানুষ যাতে মামলায় জড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে না যায় সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি থেকে বেরোতে আইনের সংস্কারের সাথে সাথে সকলের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দরকার। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সুবিচার পাক।