বিচ্ছু ভূত

আপডেট: আগস্ট ১৯, ২০১৭, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

সৌর শাইন


পর্ব ৬

১৫.
রাজ্য জুড়ে প্রচার হয়ে গেল ভূতভবনে রাক্ষস ঢুকেছে। রাজভূতের এ করুণ দশার কথা শুনে প্রজারা বেশ আনন্দিত। দলে দলে সবাই ভূতভবনের দিকে যাচ্ছে। এদিকে ঋকু-ণিকু রাজভূতের বিপদ সংবাদ শুনেই ছুটে এল।
এসে দেখে সেনারা ভূতভবনের চারপাশ ঘিরে মনমরা হয়ে বসে আছে। অন্যদিকে উৎসুক প্রজারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ঋকু বলল,কি যে দুরবস্থা হাজির হলো,বুঝতে পারছি নে। ভূতরাজের কিছু হলে তো রাজভাতা পাব না, তখন আমাদের কী হবে?
ণিকু বলল,কে জানে কী হবে? আমাদের আরাম-আলসেমি সেদিন শেষ হয়ে যাবে।
সেনারা এসে ঋকুকে জানাল,ভূতভবনে রাক্ষস ঢুকেছে। এ কথা রাজভূত চিৎকার করে জানিয়েছে।
ণিকু ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল,এ্যাঁ…!…এবার কী হবে?
ঋকু সেনাদের লক্ষ্য করে ধমকে বলল,রাক্ষস-খোক্কস যাই ঢুকেছে,তোমরা ভূতরাজকে উদ্ধার করছ না কেন? এভাবে হাত-পা গুঁটিয়ে বসে রয়েছ কেন?
এক সেনা বলে উঠল, এত বড় ফটক ভেঙে ফেলা তো সম্ভব না। তাই তো আমরা কিছুই করতে পারছি না।
সে কি কথা বলছ,রাজভূত পড়েছে রাক্ষসের কবলে,আর তোমরা বলছ কিছুই করতে পারছ না।
ঠিক তখনই রাজভূতের চিৎকার শোনা গেল।
বাবা গো…মা গো..বাঁচাও,মরে গেলাম..
ঋকু চিৎকার করে ওঠল,একি! আমার বন্ধু মরে যাচ্ছে…, ওকে বাঁচাও, জলদি ফটক ভেঙে ফেলো, রাজভূতকে বাঁচাও।
সেনারা আর ঋকু-ণিকুর সাথে আর কথা বাড়াল না। ফটক নিয়ে টানাটানি শুরু করল। সেনাদের শত চেষ্টাতেও ফটক সামান্যতম নড়ল না।
ণিকু হঠাৎ বলল,ঋকু…একটা উপায় পেয়েছি।
কী উপায়?
ছাদ, ঐ যে ছাদ… ছাদে উঠে কেউ যদি ফটকটা খুলতে পারে, তবে তো রাজভূতকে বাঁচান সম্ভব!
কিন্তু,এ উঁচু ছাদে কে উঠবে?
ঋকু চিৎকার করে বলল, সেনারা ছাদে ওঠো… ছাদে ওঠে ভূতভবনের ভেতরে যাও।
ণিকু বলল, হ্যাঁ, ছাদে ওঠো, রাজভূতকে বাঁচাও।
ঋকু-ণিকুর কথা শুনেই সেনারা ছাদে ওঠার চেষ্টা শুরু করল। দেয়াল বেয়ে ওঠতে গিয়ে কয়েকজন সাথে সাথে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। ভূতভবনের আশপাশে বড় কোনো গাছও নেই যে সেনারা গাছে চড়ে ছাদে উঠবে। বিকল্প কোনো উপায়ও পাচ্ছে না। অবশেষে ওরা নিজেরাই একটা উপায় তৈরি করল। একজনের কাঁধে আরেকজন চড়ে বসল,এভাবে ওরা উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। ঋকু-ণিকু ওদের উৎসাহ ও সাহস দিচ্ছে।
ভয় পেয়ো না, উপরে ওঠো।
ওরা একের পর এক কাঁধে চড়তে চড়তে হঠাৎ হুড়মুড় করে লুটিয়ে পড়ল।
এদিকে ভূত ছানারা বাইরের পরিস্থিতি দেখার জন্য চুপি চুপি ছাদে ওঠল। সেনাদের কাণ্ড দেখে ওরা হাসতে হাসতে ক্লান্ত! ভূতভবনের আশপাশে কেউ কেউ বাবা-মাকে দেখতে পেয়ে ওরা খুশিতে হাত নাড়াল। প্রজাভূতেরা ছানাদের ছাদে দেখেতো অবাক! কারণ ওরা জানতই না, ছানাগুলোকে কারাগার থেকে ভূতভবনে নিয়ে রাখা হয়েছে। ছানাদের এখানে দেখে প্রজাদের মনে নতুন একটা আশঙ্কার জন্ম হলো। এতক্ষণ ওরা আনন্দে ছিল,কারণ শুনেছে রাজভূত রাক্ষসের কবলে পড়েছে। এখন সে রাক্ষস ভীতি প্রজাদের মনে নতুন দুশ্চিন্তা জাগিয়ে তুলল। ষিংকু ভূত বলে ওঠল,রাক্ষস নিশ্চয়ই ছানাদের উপর আক্রমণ করবে,ওদেরকে বাঁচাতে হবে।
সাথে সাথে সবাই সমস্বরে বলল, হ্যাঁ, তাই তো… আমরা এখন কী করব?
ষিংকু বলল,চলো,ফটক ভেঙে ছানাদের উদ্ধার করি।
প্রজারা সবাই হৈ হৈ করে প্রধান ফটক ধরে ধাক্কা ও টানাটানি শুরু করল। এদিকে সেনারা কাঁধে চড়ে বার বার ছাদের ওঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেছে।
ঋকু সেনাদের উদ্দেশ্যে বলল, এভাবে চুপ করে বসে থেক না, তড়িধড়ি হাত লাগাও, দেখো, বিপদের দিনে রাজভূতকে বাঁচানোর জন্য প্রজারা পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে।
ছাদ থেকে বিচ্ছুভূতেরা ফটক টানাটানির দৃশ্য দেখছিল। অবশেষে ওরা নিজেরাই ফটক খুলে দিলো। আর হুড়মুড় করে সবাই ভূতভবনে প্রবেশ করল।

১৬.
প্রজারা ভূতভবন থেকে বিচ্ছুভূতদের মুক্ত করে বাসায় নিয়ে গেল। তখন ঘৃণায় কেউ রাজভূতের দিকে তাকিয়েও দেখল না। প্রজারা চলে যাবার পর সেনারা রাজভূত, রাগবিনয়, সেনাপ্রধান ও গোয়েন্দাপ্রধানকে উদ্ধার করল। রশির ফাঁদ থেকে মুক্ত হয়ে রাজভূত যেন দ্বিতীয়বার জীবন ফিরে পেল। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, রাক্ষস কি এখনো আছে?
ঋকু অভয় দিয়ে বলল, না, রাক্ষস-খোক্কস যা ছিল সবই তো সেই সকালেই পালিয়ে গেছে।
রাগবিনয় প্রায় কেঁদে কেঁদে বলল,সে কি যন্ত্রণা আর অত্যাচার বলে বোঝান যাবে না। তোমরা উদ্ধার না করলে হয়তো মরেই যেতাম।
ণিকু বলে ওঠল,আমরা আর কি উদ্ধার করলাম? উদ্ধার তো করেছে প্রজারা।
ঋকু বলল,ভূতরাজের বিপদের দিনে প্রজারা পাশে না দাঁড়ালে কিযে হত।
রাজভূত ও রাগবিনয় দুজনেই অবাক। রাজভূত বলল, তোমরা সত্যি বলছ?
সেনারা বলল,মিথ্যে বলব কেন? গত কয়েকটা দিন ধরে শত টানাটানি করেও ফটক খুলতে পারিনি। আর প্রজারা এসে এক ধাক্কায় খুলে ফেলল। তাই তো আপনাদের উদ্ধার করতে পারলাম।
ঋকু বলল, আসলে প্রজারা নিঃসন্দেহে রাজভূতের কল্যাণ কামনা করে।
রাগবিনয় বলল, আমার কাছে ব্যাপারটা কেমন ঘোলাটে লাগছে।
রাজভূত ধমকে বলল, তোমার কাছে সবই ঘোলাটে লাগবে। কেবল তোমার বুদ্ধিতে প্রজাদের বিরুদ্ধে এত কঠোর হয়েছি। এখন দেখলে তো প্রজারা আমাকে কত বিশ্বাস করে। নিজেকে তো খুব চালাক মনে করো, পারলে না রাক্ষসের হাত থেকে নিজে নিজে উদ্ধার হতে।
রাগবিনয় বলল,আপনি এমনভাবে রেগে যাচ্ছেন কেন?
রেগে যাব না তো কী করব? আমার বিপদের দিন তোমার মুখে হাসি ফুটবে,আর আমি তোমাকে কেবল ভালবাসব?
রাক্ষসটা আমাকে কাতুকুতু দিচ্ছিল,তাই তো হাসি পেয়েছে।
এমন বিপদের দিনেও তোমার হাসি পায় আমার জানা ছিল না। তুমি আমার সামনে থেকে দূর হও। তোমার মুখ আমি দেখতে চাই না।
রাগবিনয় রাজভূতের আচরণে মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো। তবে মুখ ফুটে কিছুই বলল না। ভূতভবন থেকে বিদায় নিয়ে দূরের একটি গাছে গিয়ে বাস শুরু করল। নিজেকে নিয়ে একা একা রাগবিনয় বেশ কিছুদিন ভাবল।
হঠাৎ একদিন রাগবিনয় ভূতভবনে এসে হাজির হলো। রাগবিনয়কে দেখেই রাজভূত খুশি ও আনন্দিত। বলল,রাগের মাথায় তোমাকে ভীষণ বকেছি। দুঃখিত…
রাগবিনয় বলল, একটা বিশেষ কারণে এসেছি।
কী কারণ?
প্রজারা বাচ্চাভূতদের মুক্ত করে নিয়ে গেছে,ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়।
হ্যাঁ,জানি। আমি সেনাপ্রধান-গোয়েন্দাপ্রধানের সাথে পরামর্শ করেছি। প্রজারা আমার জীবন বাঁচিয়েছে, তাই ওদেরকে আর ক্ষেপাতে চাই না। বাচ্চা ভূতেরা ওদের বাবা-মার কাছেই থাকুক।
রাগবিনয় বলল,প্রজারা আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না,তার কী গ্যারান্টি আছে? যখন জানতে পারবে আপনি খোঁড়া অযোগ্য তখন কি ওরা আপনাকে মানবে? র¤পুভূতের মতো কেউ না কেউ আপনার উপর আক্রমণ করবে।
রাগবিনয়ের কথা শুনে রাজভূত অসহায় চোখে তাকাল। এখন কী উপায় হবে?
উপায় তো একটা করতেই হবে,অন্যথায় এ রাজ্য শাসন কিছুতেই টিকবে না।
আমি না হয়, প্রজাদের সামনে আর যাবই না। তাহলে ওরা জানতেই পারবে না, আমি খোঁড়া। তুমি আমার পাশে থেকো,প্রজাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ হুকুম-নির্দেশ,এসব ব্যাপারে তুমি সজাগ থাকবে। আমি সেনা ও গোয়েন্দা বিভাগের দিকে নজর রাখব। বিদ্রোহ করার কোন সুযোগই কেউ পাবে না।
রাগবিনয় বলল, হ্যাঁ, সঠিক কথা বলেছেন।
রাগবিনয় অনেক ভেবে-চিন্তে বলল, বিদ্রোহ দমন করার জন্য বাচ্চা ভূতদের নতুন কৌশলে ফাঁদে বন্দি করতে হবে। এ ফাঁদ হবে একেবারে অন্যরকমভাবে।
রাজভূত জিজ্ঞেস করল,কিসের ফাঁদ তৈরি করবে?
ট্রেনিং ক্যা¤প নতুন উদ্যমে চালু করতে হবে। এছাড়া রাজ্যে শিক্ষা প্রচারের নামে স্কুল চালু করতে হবে। ওদের স্কুলে আসা বাধ্যতামূলক। সেখানে বাচ্চা ভূতদের নজরে রাখতে সুবিধা হবে, কেউ বিদ্রোহ করার চেষ্টা করলেই বাচ্চা ভূতদের বন্দি ও হত্যা করার হুমকি দেয়া হবে। শিক্ষা প্রদান প্রক্রিয়া হবে ভিন্ন রকম,বাচ্চা ভূতের মানসিকতা বিরূপভাবে তৈরি করে তুলতে হবে। মানুষের বিরুদ্ধে ভূতদের কাজে লাগাতে হবে, তাহলে ওরা বিদ্রোহ কথা চিন্তাই করবে না, বরং মানুষের ক্ষতি করে বেড়াবে।
রাজভূত বলে উঠল, চমৎকার পরিকল্পনা তো। খুব দ্রুত কার্যক্রম শুরু করো।
রাগবিনয়ের প্রতি খুশি হয়ে রাজভূত তাকে ভূতভবনে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানাল। কিন্তু রাগবিনয় তাতে রাজি নয়। অবশেষে রাজভূত একটি চমৎকার খেজুর গাছে রাগবিনয়কে থাকার ব্যবস্থা করে দিলো। নিজের নতুন একটি ঠিকানা পেয়ে রাগবিনয় মনে মনে খুশিই হলো।
কিছুদিন পরেই রাগবিনয় প্রজাদের উদ্দেশ্যে শিক্ষা কার্যক্রম ও স্কুল খোলার কথা জানাল। সেখানে বাচ্চা ভূতদের পাঠিয়ে দেবার নির্দেশ দিল। প্রজাদের অভয় দিয়ে বলল, বাচ্চা ভূতদের আর কখনো বন্দি করা হবে না। রাজভূতের কথা মতো ট্রেনিং নিলে ও বাচ্চাভূতদের স্কুলে পাঠালে কাউকে কোনো প্রকার শাস্তি দেয়া হবে না।
আরো বলল, অতিশীঘ্রই স্কুলের জন্য একজন পণ্ডিত ভূত নিয়োগ দেয়া হবে। পণ্ডিত ভূতের কাছ থেকে বাচ্চা ভূতেরা বিদ্যা অর্জন করবে।
বাচ্চা ভূতদের বন্দি করা হবে না শুনে প্রজারা স্বস্তি পেল। রাজভূতের নির্দেশ মেনে রাগবিনয়ের প্রস্তাবে সায় দিল।
রাগবিনয় নিজের একটি নতুন পরিচয় তৈরি করল। রাজসেনাসহ সবাইকে নির্দেশ দিল তাকে পণ্ডিত ভূত বলে সম্বোধন করার জন্য। কিছুদিন পর ছদ্মবেশ ধারণ করে পণ্ডিত ভূত সেজে প্রজাদের সামনে হাজির হলো।
পণ্ডিত ভূত প্রজাদের বলল,মানুষের সমাজের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য ভূতদেরও শিক্ষিত হতে হবে। রাজভূতের আদেশে আমি ব্রহ্মদেশ থেকে এসেছি। শিক্ষার উপর আমার রয়েছে উচ্চতর ট্রেনিং ও ডিগ্রি। এখন রাজ্যের সব বাচ্চা ভূতদের সে ট্রেনিং ও শিক্ষা দেয়া হবে।
শান্তিকামী প্রজারা খুশি মনে পণ্ডিতভূতের আদেশ ও নির্দেশ মেনে নিল।

১৭.
বিচ্ছুভূতেরা মুক্ত হয়ে বেশ আনন্দে আছে। প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর ওরা একসাথে জড়ো হয়। সবাই মিলে বিচ্ছুভূত ফ্রেন্ডস কমিটি নামে একটি বন্ধু সংঘ তৈরি করেছে। সুযোগ পেলেই ওরা গল্প-গুজুবে মেতে ওঠে। রাজভূতের শাস্তি ও রাগবিনয়ের কাতুকুতুর গল্পটা ওরা প্রায়ই বলতে থাকে।
রাগবিনয়ের স্কুল খোলার পর থেকে বাবা-মার নির্দেশ মতো ওদের স্কুলে যেতে হয়। কত ধরনের ক্লাস করতে হয়। প্রতিরাতেই ক্লাস শুরু হয় নদীর পাড়ে বটগাছের নিচে। তবে বিচ্ছুরা এ স্কুল খোলার ব্যাপারটা ঠিক ভালভাবে নেয়নি। সবার মনে কেমন সন্দেহ। রাগবিনয়কে ওরা মোটেও পছন্দ করে না। সুযোগ পেলেই ওরা স্কুল ফাঁকি দিতে চায়।
এভাবে ওদের দিন কেটে যাচ্ছে। প্রতিদিনই ওরা মাথা খাটিয়ে নতুন নতুন কৌশল তৈরি করে। সেভাবেই পণ্ডিত ভূতকে নানাভাবে জব্দ করা হয়।
বিচ্ছুভূত ফ্রেন্ডস কমিটির প্রধান সদস্য সাত জন। এছাড়া সহযোগী সদস্য অনেক রয়েছে। ওদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ, ওরা সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য সর্বদাই প্রস্তুত।
[সমাপ্ত]