বিজয়ী অথবা পরাজিত নায়ক : মঈনউদ্দিন আহমেদ জীবন ও সংগ্রাম

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

ড. তসিকুল ইসলাম রাজা:


আমার পরম সুহৃদ ও পূজনীয় ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ (১৯৩৬-২০২২) একজন সংগ্রামী ও আপসহীন মানুষ ছিলেন। তবে, খুবই হাসিখুশি বন্ধুবৎসল ও হাহা-হা প্রাণখোলা হাসির ভেতর দিয়ে তিনি সর্বদাই পথ চলেছেন।
মঈনউদ্দিন আহমেদ একজন সহজ-সরল আন্তরিক এবং সর্বমহলে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাঁর আরেকটি বড়গুণ ছিল তিনি কখনোই গায়ে পড়ে কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। তাঁর রাজকীয় চলাফেরা ছিল বেশ আনন্দদায়ক ও মনীষীতুল্য। তিনি প্রচুর পান ও চা খেতেন, সিগারেটও খেতেন মাঝে মাঝে। তবে ছাত্রদের সামনে পান খেলেও সিগারেট কখনো খেয়েছেন বলে আমার মনে পড়ে না। খেলেও আড়ালে হয়তো খেয়েছেন অর্থাৎ লোকচক্ষুর অন্তরালে হয়তো দু’চার বার সুখটান মেরেছেন। সেটার মধ্যে অবশ্যই শালীনতাবোধ ছিল। সেই শালীনতাবোধ বা মূল্যবোধ তো এখানে এখন আর চলে না। সেটি এখন বস্তাপচা মাংসের গন্ধের -দুর্গন্ধের মতোই এটি একটি ব্যাকডেটেড বিষয় বটে! বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে একেবারে অচল মাল বললেও অত্যুক্তি হবেনা। এখনতো সত্যবাবু মারা গেছে অতএব…।
সেই মূল্যবোধ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ও সজাগ মানুষ আজ সমাজের সবখানে বড়ই বিরল। সেই যুদ্ধে বিজয়ী অথবা পরাজিত নায়ক অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ। এ জন্যই কি রাজশাহী থেকে পালিয়ে তিনি ঢাকায় একরকম বস্তির জীবন, আবার কখনো বা কোন মেসে দিন যাপন করতেন? খুবই নীরবে নিভৃতে একাকী চলাফেরা করতেন। বাংলা একাডেমির লাইব্রেরি কক্ষে আবার কখনো বা বিক্রয় কেন্দ্রে দেখা হলেই খুবই কাচুমাচু বিনয় বা বিন¤্র স্বভাবে কথা বলতেন। আমরা আমাদের কুশল বিনিময় করতাম। তিনি রাজশাহীর ভাল খবরাখবর শুনে বড় চাড়িতে অথবা টিনের বড় হাড়িতে কই বা মাগুর মাছ যেমন কলবল, কলকল করে, ঠিক তিনি তেমনি নদীর স্রোতের ধাক্কায় কলবলিয়ে উঠতেন। আবার কোন খারাপ খবর শুনলে যেন মুষড়ে পড়তেন। তাঁর মুরব্বী বা শিক্ষকদের প্রতি তাঁর যে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আমরা দেখেছি তা অবশ্যই আমার জীবনে স্মরণীয় সঞ্চয় হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে দেশনন্দিত শিক্ষকবৃন্দ আবার বিশ^নন্দিত প-িত, গবেষক, শিক্ষক ও সমাজ হিতৈষী, আমাদের পরম প্রিয় অর্থাৎ প্রাণপ্রিয় প্রফেসর ড. কাজী আবদুল মান্নান স্যার সম্পর্কে খুবই বিনয়ের সঙ্গে খোঁজ খবর নিতেন। তাঁর যে সৌজন্যবোধ এবং এটিকেট বা ম্যানার ছিল অত্যন্ত উঁচু মার্গের। তাঁর আচার-আচরণ ও প্রাণখোলা ঠোঁট রাঙ্গানো লাল টকটকে উচ্ছ্বাসময় হাসি কখনো কখনো অট্টহাসিতে পরিণত হতো। আবার সে সময় তাঁর মুখের পান পাতা বা সুপারির অংশবিশেষে আমাদের জামাকাপড় নষ্ট হতোÑ সে কথা আর নাই বা বললাম।
মঈনউদ্দিন আহমেদ ১৯৩৬ সালের দিনাজপুর শহরের কসবা মহল্লায় এক বনেদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ¦ মোকাদ্দাশ উদ্দিন এবং মাতার নাম মেহেরাব জুন। তিনি দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে দিনাজপুর কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি লেখাপড়ার প্রতি যতটা আগ্রহী ছিলেন, তাঁর চেয়ে বেশি পারদর্শী ছিলেন খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা এবং সমাজসেবামূলক বিভিন্ন মহৎ কর্মে আর এসব গঠনমূলক কাজে তিনি ছিলেন সর্বদাই মশগুল। তিনি দিনাজপুর কলেজ থেকে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি.এ অনার্স এবং ১৯৫৮ সালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ছাত্র জীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির একটি চমৎকার অভ্যাস ছিল। এর ফলে, ছাত্রজীবন থেকে একটি আলাদা ব্যতিক্রমধর্মী জীবনদর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে তিনি সর্বদাই সচেষ্ট ছিলেন। এ জন্য তিনি তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কাছে সর্বদাই সমাদৃত হতেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলা অত্যন্ত জরুরি মনে করি। তা হলো, তাঁর সহপাঠী-বান্ধবী রোকেয়া বেগম এম.এ পরীক্ষায় ১ম শ্রেণি লাভের গৌরব অর্জন করেন। সে সঙ্গে তিনি পিএইচ.ডি গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। সে সময় তিনি শিক্ষক হিসেবেও রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। সবগুলো খবরই আনন্দদায়ক, গৌরবময় এবং অবশ্যই প্রশংসারও বিষয়। পরম শ্রদ্ধেয়া রোকেয়া আপা ছিলেন রাজশাহীর বিখ্যাত ‘মৃধা’ পরিবারের কৃতী সন্তান। এ পরিবারের কশির উদ্দীন মৃধা মুসলিম লীগের রাজনীতিতে বড়নেতা ছিলেন। মঈন উদ্দিন ভাই সেই কশিরউদ্দীন মৃধার প্রথম পক্ষের একমাত্র বিদুষী কন্যা রোকেয়া বেগমের সঙ্গে খুব সাড়ম্বরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের পারিবারিক জীবন খুবই আনন্দময় পরিবেশে সুখ আর শান্তিতে কানায় কানায় ভরে গেছে। কিন্তু আজও প্রশ্ন থেকে যায়Ñ কেন অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ পরম শ্রদ্ধেয়া স্বর্গীয় আপা রোকেয়া বেগমের বিশ^বিদ্যালয় থেকে চাকরি ছাড়িয়ে নিলেন এবং পিএইচ.ডি গবেষণা কর্মটিও বন্ধ করে দিলেন। কেন যে তিনি এমন কাজটি করলেন আজও কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলেনি। এ বিষয়টি আমাদের তথ্যানুসান্ধানী তরুণ গবেষকদের কাছে এখনো নানা প্রশ্নের উদ্ভব হয়। কিন্তু কেউই সঠিক কারণ এখনো জানাতে পারেন না। সেজন্যই আমাদের মনের মধ্যে একটি বড় জিজ্ঞাসা চিহ্ন থেকে যায়।
রোকেয়া আপা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী এবং আমাদের দেশে এখনো মধ্যযুগ অথবা প্রাচীন বাংলা নিয়ে তেমন কোনো কাজ হয়নি। সেখানে রোকেয়া আপার সোনালী কলমের ছোঁয়ায় আমরা অবশ্যই তাঁর কাছ থেকে পিএইচ.ডি থিসিসসহ আরো গ্রন্থ-প্রবন্ধ উপহার পেতাম। এরফলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস শুদ্ধ ও সমৃদ্ধ হতো। সেখান থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।
এ দিকে মঈনউদ্দিন আহমদ ১৯৬১ সালে রাজশাহী সিটি কলেজে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে উপাধ্যক্ষ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি ছাত্র জীবনেই দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন। পরবর্তী পর্যায়ে ষাটের দশকে রাজশাহী সিটি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্স খোলা হয়েছে এবং পঠন-পাঠনের দিক থেকে কলেজে শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। তৎকালীন একজন স্বনামখ্যাত ও অত্যন্ত দক্ষ অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক এস এম আবদুল লতিফ। তিনি একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, লেখক, সাহিত্য-সংস্কৃতি সাধক এবং সমাজহিতৈষী হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেছেন। তিনি সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত কলেজের উন্নয়ন, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছেন। অধ্যক্ষ এসএম আবদুল লতিফ, উপাধ্যক্ষ শামসুল হক কোরায়শী এবং উপাধ্যক্ষ মঈনউদ্দিন আহমেদ প্রমুখের প্রচেষ্টায় তাঁরা রাজশাহী সিটি কলেজকে সমগ্র উত্তরবঙ্গের মধ্যে সব দিক থেকে একটি শ্রেষ্ঠ কলেজে পরিণত করেন। অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ নিয়মিত সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ, কলেজের গ্রন্থাগারকে সমৃদ্ধকরণসহ যাবতীয় খেলাধুলায় রাজশাহী সিটি কলেজ আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
উপাধ্যক্ষ মঈন উদ্দিন আহমেদ রাজশাহী সিটি কলেজ সরকারি হলে তিনি বদলি হন এবং ১৯৯৩ সালে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তার পর বলা যায়, তিনি প্রায় ত্রিশ বছর রাজশাহী-ঢাকা-দিনাজপুর করেছেন। ঢাকায় তিনি খুবই কষ্ট করেছেন। ছাত্রদের সঙ্গে মেসে থাকতেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে যেভাবে জীবন-যাপন করা দরকার তা তিনি করেননি। তিনি কিছুটা গায়ের জোরে এবং কিছুটা মনের জোরে কাজ করেছেন। আমি ঢাকা গেলেই প্রথমেই বাংলা একাডেমি তারপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, নজরুল ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, পাঠক সমাবেশ, আজিজ সুপার মার্কেট এবং বাংলা বাজার চষে বেড়াতাম- এখন কিছুটা বয়স হয়েছে। চলাফেরা খুবই সীমিত। সাথে লোকছাড়া চলাফেরা করতে পারি না। তারপরও মনের জোরেই পথ চলি। কিন্তু মঈন উদ্দিন আহমেদ ভাই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাসপথেও ভালই চলাফেরা করতেন। আমার কথা বলতে বলতে একটু অন্য ট্রাকে চলে গিয়েছিলাম।
আবার মঈন উদ্দিন ভাইকে নিয়ে বেশি কথা বলা দরকার। কেননা তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। আর কখনো ফিরে আসবেনও না। তবে, তিনি ছিলেন একরোখা মেজাজী মানুষ। যা বলবেন, তাই করবেন। বেশ কিছুদিন পূর্বে দিনাজপুর শহরের বাড়িতে পৈত্রিক জমি-জিরাত, বাড়িঘর ইত্যাদি নিয়ে ভাই-বোনদের সাথে বণ্টননামার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আলাপ-আলোচনায় তিনি তখনই সিদ্ধান্ত দেন, যা- আমি চলে যাচ্ছি। আমার আর কোন ভাগ-টাগ দরকার নেই। আমার বিষয়-সম্পত্তি বাড়িঘর তোদের মধ্যে দিয়ে দিলাম। সেই মুহূর্তেই ঢাকা গমন এবং কষ্টের ও সংগ্রামের জীবন তিনি নিজে কাঁধে নিত্যসঙ্গী করে নিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত লাইব্রেরিতে কাজ করতেন, পড়াশুনা করতেন এবং জ্ঞানচর্চার মধ্যদিয়ে অবসর জীবনকে তিনি আনন্দদায়ক ও গৌরবময় করে তুলেছিলেন। শেষ জীবনে বৃদ্ধ বয়সে অনেকেই দেখি টাকা পয়সা ও জমি-জিরাত, বাড়ি-ঘরের প্রতি বেশ লোভ থাকে। কিন্তু ব্যতিক্রম উপাধ্যক্ষ মঈনউদ্দিন আহমেদ। সাংসারিক বুদ্ধিতে তিনি খুবই অগোছালো এবং অমনোযোগী ছিলেন। তাঁর নিজের সন্তান না থাকার বিষয়টিকে তিনি খুবই অবহেলার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর সমগ্র জীবনে ত্যাগই বেশি। ভোগ নেই বললেই চলে। তবে, তার লেখাপড়া ও পা-িত্যের কথা সর্বজনবিদিত। তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্রদের বা ছাত্রীদের খুবই ¯েœহ ও ভালবাসতেন। বিশেষ করে অধ্যাপক, কবি ও সংস্কৃতি সাধক রুহুল আমিন প্রামাণিক ভাইকে খুবই ভালবাসতেন। ঢাকায় দেখা হলে প্রথমেই তাঁর কথা জিজ্ঞেস করতেন।
অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদের ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির অভ্যেস ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে অধ্যাপনার জীবনে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। আবার অবসর জীবনে লেখালেখির কাজটি যতœ ও আগ্রহ সহকারে করেছেন।্ তিনি যে সব বই লিখেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বইয়ের তালিকা এখানে উল্লেখ করা হলো :
০১. যাত্রার যাত্রা (১৯৮৫), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা, ০২. প্রাচীর: অনুবাদ, ০৩. ছোট রাজকন্যা: অনুবাদ, ০৪. পেঁচার ডাক: ভৌতিক গল্প, ০৫. জিসকা: মেরি কার লিং ও ০৬. উপন্যাস: অনুবাদ (আহমেদ পাবলিশিং হাউস)।
এছাড়াও তার অনেকগুলো প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলো এক সঙ্গে সংগ্রহ করা খুবই দরকার।
তিনি ‘যাত্রার যাত্রা’-একটি বই লিখেই খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন। এই বইটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে অক্টোবর ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের ‘শুভেচ্ছা’ লিখেছেন তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক প্রখ্যাত প-িত ও গবেষক প্রফেসর ড.আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন :
জনাব মঈন উদ্দিন আহমেদ বেশ কিছু কাল যাবত বাংলাদেশের লোকনাট্য বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা ও সমলোচনা করছেন। যাত্রার যাত্রা বইটি তাঁর ঐকান্তিক গবেষণার ফসল। ‘যাত্রাপালা’ বা ‘যাত্রাগান’ অতি সুপ্রচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের লোকসমাজের মনোরঞ্জন করে আসছে। যদিও ইউরোপীয় আঙ্গিক ও মঞ্চসজ্জায় উপস্থাপিত থিয়েটার নাগরিক ও গ্রামীণ মানুষের গভীরেও সম্প্রতি শিকড় গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছে তবুও লোকবন্ধনের প্রসঙ্গ উঠলে যাত্রার কথাই প্রথমে আসবে। (‘যাত্রার যাত্রা’ গ্রন্থের শুভেচ্ছা অংশ থেকে সংগৃহীত)।
স্বনামখ্যাত প-িত ও গবেষক এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী প্রফেসর ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এ গ্রন্থ সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আরো বলেন :
আধুনিক থিয়েটারের পাশাপাশি যাত্রার প্রাধান্য এমন কী শহর অঞ্চলেরও সকল রসিক জনেরই চোখে পড়েছে। যদিও যাত্রার আঙ্গিকে অনেক রদবদল হয়েছে, মেনে নিতে হচ্ছে, অনেক সাম্প্রতিক চটক ও জেল্লা, শুধুই টিকে থাকার জন্য যোগ করতে হয়েছে বিসদৃশ নানা গান, তবুও এর মৌল কাঠামো এখনও অটুট। আগে অধিকাংশ যাত্রা-পালার বিষয়বস্তু বা কাহিনী অতীত ইতিহাস থেকে আহরণ করতে হতো। বর্তমানে যাত্রা-আঙ্গিকের পালাসমূহের মধ্যে আধুনিক জীবনের সাম্প্রতিক কাহিনীও অন্তর্ভুক্ত হবার ফলে এর একটা জনপ্রিয়তা সম্প্রসারণের পথে। (যাত্রার যাত্রা গ্রন্থের শুভেচ্ছা অংশ থেকে সংগৃহীত)
এবারে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক মহোদয় ড.আবু হেনা মোস্তফা কামাল ‘যাত্রার যাত্রা’ গ্রন্থের লেখক স্বনামখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্য-সংস্কৃতি সাধক এবং বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে অল্প কথায় চমৎকার মন্তব্য বা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন :
‘মঈনউদ্দিন আহমেদ আমাদের যাত্রাগানে অতীত থেকে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত বিস্তারিত বিশ্লেষণের দ্বারা এ ব্যাপারে তার গভীর অধ্যয়ন, চর্চা ও অভিনিবেশের পরিচয় দিয়েছেন।’ (‘যাত্রার যাত্রা’ গ্রন্থের ‘শুভেচ্ছা’ অংশ থেকে সংগৃহীত)
এছাড়াও তিনি ‘যাত্রার যাত্রা’ গ্রন্থের লেখক সম্পর্কে যথাযথ পা-িত্যপূর্ণ মতামতের মাধ্যমে লেখকের প্রতিভার মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেছেন,
তিনি উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রকার লোকনাট্য, পালাগান ও অভিনয় করার আলোচনার সাথে সাথে আমাদের যাত্রাগানেরও তুলনামূলক সুখপাঠ্য ইতিহাস রচনা করেছেন। নাট্যরসিক পাঠক সাধারণ যাঁরা মাধ্যমটি সম্বন্ধে উৎসাহী লেখকের এই বইটি পড়ে উপকৃত হবেন বলে আমার বিশ^াস। তাছাড়া বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নাট্য আন্দোলনের যে সব কর্মী ও উদ্যোক্তা আমাদের জাতীয় অভিনয় কলা সম্বন্ধে সম্যক অভিহিত হতে চান তাদের জন্যও বইটি অপরিহার্য্য মনে করি। (‘যাত্রার যাত্রা’ গ্রন্থের ‘শুভেচ্ছা’ অংশ থেকে সংগৃহীত) অক্টোবর ১৯৮৫।
‘যাত্রার যাত্রা’ গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ তাঁর আত্মকথায় চুম্বকসার নিপুণ বর্ণনায় বলেছেন :
‘অভিনয় রীতি-নীতি ও আঙ্গিক উপকরণের ভিত্তিতে নাট্য সাহিত্যকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়- যাত্রা এবং নাটক। ইউরোপীয় সাহিত্যের থিয়েটার বা ড়্রামার সঙ্গে অপেরা বা মিরাকেল প্লের যে পার্থক্য তেমনি বাংলায় যাত্রা ও নাটকের বিভেদ কল্পনা করা যায়। তবে পার্থক্য আলোচনার আগে ‘যাত্রা’ শব্দ’ উৎপত্তি ও ইতিহাস আলোচনা করা বাঞ্ছনীয়। যাত্রা আমাদের দেশের প্রাচীন সম্পদ। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে এর আনন্দ রস যুগ-যুগ ধরে আছড়িয়ে পড়ছে। যাত্রাকে আসলে লোক সাহিত্যের শাখা বলা যেতে পারে। যদিও প-িতগণ এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।’
অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ যে সব গ্রন্থ ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রবন্ধ রচনা করেছেন; সেগুলো এক সঙ্গে সংগ্রহ করা দরকার। তারপর যথারীতি একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ব্যাপারে তাঁর নিকট আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিনি ছিলেন একজন নীরব জ্ঞানসাধক। অধ্যাপনা ছাড়াও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়, খেলাধুলা এবং সমাজসেবামূলক নানা কর্মকা-ের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিলেন। মেধাবী আড্ডায়ও তিনি ছিলেন বেশ চৌকস। তিনি আমাদের রাজশাহী লেখক পরিষদ (১৯৮০) এর অন্যতম উপদেষ্টা এবং তিনি সর্বদাই আমাদের সবরকম সাহায্য-সহযোগিতা ও সৎ পরামর্শ দিতেন। এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট কবি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে ‘রাজশাহী লেখক পরিষদ’ রাজশাহীতে অনেক কাজ করেছে। সাপ্তহিক, পাক্ষিক ও মাসব্যাপী বইমেলা, আলোচনা সেমিনার এবং গুণিজন সংবর্ধনাসহ পত্র-পত্রিকা প্রকাশনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী শক্তিকে এগিয়ে নিতে এ সংগঠন অনুকরণীয় ও দৃষ্টান্তসম্পন্ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। এ সব বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।
অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ রাজশাহীতে যখন রাজশাহী সিটি কলেজে বাংলার অধ্যাপক সে সময় তিনি ‘আড্ডাবাজ মানুষ’ হিসেবে সর্বমহলে খ্যাতি ও সুনামের অধিকারী হন। প্রখ্যাত ফোকলোর বিশারদ ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার অন্যতম পথিকৃত এবং বাংলাদেশে মার্কসসীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোয় ফোকলোর চর্চার ক্ষেত্রেও অবশ্যই প্রধান কারিগর হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল হাফিজকে কেন্দ্র করে রাজশাহী শহরের গ্রেটার রোড সংলগ্ন বিশিষ্ট কবি আব্দুর রশীদ খানের আইডিয়াল প্রিন্টিং প্রেসে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ দিকে চমৎকার একটি আড্ডা হতো। সেখানে নিয়মিত আড্ডায় অংশগ্রহণ করতেন অধ্যাপক মইনউদ্দিন আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান গামা (কবি, গীতিকার ও অনুবাদক) কবি ওবায়দুর রাহমান, কবি জুলফিকার মতিন, কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক, কবি শেখ আতাউর রহমান, সেলিনা হোসেন, ফরহাদ খান, সিকান্দার আবু জাফর, মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম প্রমুখ। পরবর্তী পর্যায়ে তাঁরা প্রত্যেকে সমাজজীবনে বা রাষ্ট্রীয় জীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। মেধাবী ও কৃতী কতিপয় মানুষ এই আড্ডার মাধমেই স্বকীয় চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে প্রতিভাবান মানুষ হিসেবে লেখালেখির জগতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। পরম শ্রদ্ধেয়া আপা কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন আজ সমগ্র দেশের সীমারেখা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও খ্যাতি ও সুনামের অধিকারী হয়েছেন। তিনি অধ্যাপক আব্দুল হাফিজের তত্ত্বাবধানে ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম পর্যায়ে রাজশাহীর জীবনে ব্যতিক্রমধর্মী লেখক হিসেবে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। যা আমাদের সামনে উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
১৯৮০ সালের দিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প-িত ও গবেষক ড.কাজী আবদুল মান্নান স্যারের নেতৃত্বে স্বনামখ্যাত ধ্বনিবিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-১৯৬৯) সাহিত্য-সংস্কৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এ সংসদ কর্তৃক সারাদেশে বিশেষত রাজশাহীর বাইরে, চট্রগ্রামে, কুমিল্লা, দিনাজপুর, খুলনা প্রভৃতি স্থানে আবদুল হাই সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আলোচ্য লেখক সম্প্রতি প্রয়াত অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ প্রত্যেকটি সম্মেলনেই যথারীতি অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁর সেই অবদানের কথা আজ বারবার আমরা বিন¤্রচিত্তে স্মরণ করছি। তাঁর আগ্রহ ও চমৎকার সান্নিধ্যসুখ আমাদের জীবনে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
তিনি খেলাধুলার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি নিয়মিত রাজশাহী স্টেডিয়ামে যাতায়াত করেছেন। বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একজন তরুণের মতোই তাঁর চলাফেরা ও বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরই ¯েœহধন্য আপন শ্যালক প্রফেসর খোদা বখশ্ মৃধা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রীড়াবিদ ও খেলাধুলার বিষয়ে ধারা ভাষ্যকার হিসেবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। যাহোক, অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ জীবনের গূঢ়রহস্য উম্মোচনের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্মের মহিমা আবিষ্কারে সর্বদাই সজাগ ও সচেষ্ট ছিলেন। তিনি যে কোন সমস্যার সমাধানে তড়িৎ সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম ছিলেন এবং তাঁর কর্মপ্রয়াস ছিল অত্যন্ত গঠনমূলক ও সৃজনশীল। আর এ জন্যই আমরা তাঁর কাছে অশেষ ঋণে আবদ্ধ।
পরিশেষে বলবো, অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমদ (মঈন-আমেদ) একজন বড় মাপের ও বড় মনের মানুষ ছিলেন। তাঁর চিন্তা-চেতনার মধ্যে কোনো ফাঁশ বা ফাঁকি ছিলনা। ভাষা আন্দোলনে তিনি দিনাজপুরে ভাষা সংগ্রামী হিসেবে ছাত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করেছেন। আবার পুরো ষাটের দশকে ১৯৬৬ তে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা, ছাত্রদের ২১ দফা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সত্তর সালে সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে জনমত সৃষ্টিতে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো সেই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে একাত্তরের ৭ই মার্চ ১০ লক্ষাধিক জনতার সামনে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের পতাকা উড়ানো এবং প্রকারান্তরে বাংলাদেশ ভূখ-ের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঐতিহাসিক ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের ভাষণে তিনি বজ্রকন্ঠে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সেই বিভীষিকাময় ভয়াবহ গভীর রাতে তিনি পাকিস্তানি সামারিক জান্তাদের বাঙালিদের হত্যার প্রতিবাদে ওয়ারলেসের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে’ নামক নতুন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা হয়। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা একাত্তরের ২৬শে মার্চ চট্রগ্রামসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ জন্যই ২৬শে মার্চ আমরা ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে সাড়ম্বরে উদযাপন করে থাকি।
উল্লেখ্য, আমরা আবার একটু পেছনের দিকে চোখ ফেরালেই দেখবো ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহীতে প্রথম শহিদ হন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রের রিডার প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা এবং একই দিনে শহিদ হন রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র মো. নূরুল ইসলাম। ছাত্র-শিক্ষকের সম্মিলিত রক্তের ধারায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের আসন এই প্রথম টলটলায়মান হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর রাজশাহীতে প্রথম আগমনের পর তিনি বিশেষভাবে শহিদ ড. শামসুজ্জোহা ও শহিদ নুরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেন। রাজশাহী সিটি কলেজের বাংলার শিক্ষক অধ্যাপক মঈন উদ্দিনআহমেদ সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
বঙ্গবন্ধুর সেই ১৯৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণে এবং ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণায় তিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শক্রর মোকাবেলা করতে হবে। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন আর কেউ আমাদের দাবায়া রাখতে পারবে না।’ বঙ্গবন্ধু মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে সমগ্র বাঙালি জাতিকে অর্থাৎ সাড়ে সাতকোটি মানুষকে ‘তুমি’ সম্বোধন করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এমন কোন দৃষ্টান্ত আছে কী-না তা আমাদের জানা নেই। মাত্র ৫৫ বছরের সংগ্রামী জীবনে ১২/১৩ বছর তো সামরিক জান্তাদের জেলখানায় কঠিন কষ্ট ও অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। সেই সংগ্রামী গণমানুষের নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষ সেদিন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমেদ। তিনি তাঁর স্ত্রী রোকেয়া আপাকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথা সর্বজনবিদিত। সে সময় অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ, ওবায়দুর রাহমান, তাঁর অনুজ মুজিবর রহমানসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্ট করে ভারতের মাটিতে পা রাখেন। অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আহমদের স্ত্রী রোকেয়া আপা প্রথম পর্যায়ে মজু ভাইদের গ্রামের বাড়ি পুলিন্দায় কিছুদিন ছিলেন। আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক মইন উদ্দিন আহমেদ দিনাজপুরে বিগত ১৮ই জুলাই ২০২২ তারিখে ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। (ইন্নালিল্লাহি…)।
আমরা তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি বারবার প্রণতি জানাই।
লেখক: কবি, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক