বিজয় দিবসকে অর্থবহ করতে

আপডেট: ডিসেম্বর ১৮, ২০১৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

শভ্রারানী চন্দ


বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই আমাদের মনে পড়ে যায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক দিনটির কথা। প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে কি বছরের অন্যান্য সময়ে আমরা, বিজয়ের দিনটির কথা ভুলে থাকি? না, মোটেই তা নয়। মা সন্তানকে ভালোবাসেন কিন্তু জন্মদিন এলে বিশেষ আয়োজনে সবাই দিনটি উদযাপন করেন। এর অর্থ শুধু এই নয় যে ওই বিশেষ দিনে তিনি সন্তানকে বেশি ভালোবাসেন। বরং তার জন্মদিনটি উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে তাকে এবং তার জন্মদিনটিকে বিশেষভাবে মনে করেন, তাকে গুরুত্ব দেন। বিজয়ের স্বাদ যখন কোন মানুষ, দেশ বা জাতি পায় তখন তারা সে বিশেষ দিনটিকে নানা আয়োজনে উদ্যাপন করে এবং একইসাথে সে আনন্দ, ভালোলাগা বছরের প্রতিটি দিন নিজেদের প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে অজান্তেই উদযাপন করে। তবুও উপলক্ষ্য সামনে এলে মানুষ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। আর আমাদের দেশের বিজয়দিবস নানা আয়োজনে বর্ণাঢ্য হয়ে উঠে। মানুষের আগ্রহ, ভালোলাগা ও ভালোবাসার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয় এ দিনটি। অন্যান্য জাতীয় দিবসের মত। এ বর্ণিল আয়োজন বছরভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা পায়।
বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে বীজটি রোপিত হয়েছিল তার সফল পরিণত পায় ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। সংগ্রামের দুর্গম, দুস্তর পথ বাঙালি পাড়ি দিয়েছে তার মূল চালিকা শক্তি ছিল দেশপ্রেম। যে সর্বংসহা ধরিত্রীর বুকে আমরা জন্মেছি, যাঁর আলো-বাতাসে আমরা বেঁচে আছি, যে মাতৃরূপী জননী জন্মভূমি আমাদের অন্ন, বস্ত্রের যোগান দিচ্ছেন তাঁর প্রতি ভালোবাসা, গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাই ৭১’র বিজয়। ভালোবাসার শক্তি অসীম। যে অসীম ভালোবাসা নিয়ে বাঙালি ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারই সোনালী ফসল বিজয় দিবস। ভালোবাসা যে অপ্রতিরোধ্য তার জ্বলন্ত প্রমাণ নিরস্ত্র সাহসী বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ।
বিজয় দিবসে শুধু নানা আয়োজন, বক্তৃতা, সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়- আমাদের চেতনায়, মননে লালন ও ধারন করতে হবে অকৃত্রিম ও গভীর দেশপ্রেম। দেশকে যে ভালোবাসে সে কখনো দেশবিরোধী কোন কাজ কখনও করতে পারে না। তার দ্বারা কোন মানুষ তথা দেশের  অহিতকর কোন কাজ কখনও করা সম্ভব হবে না।
যে দেশ আমার ঠিকানা দিয়েছে, সে দেশের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। সে কৃতজ্ঞতা তাকে প্রাণিত করবে মানুষকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের ঠিকানা দিতে। গভীর শ্রদ্ধায় ভালোবাসতে হবে দেশকে, একই সাথে মানুষের ভেতরে দেশপ্রেম ও কৃতজ্ঞ থাকার বোধটি রোপিত করতে ও জাগিয়ে রাখতে হবে। বিবেককে সদা জাগ্রত রাখতে হবে। একজন বিবেকবান মানুষ কখনও কারও ক্ষতির কারণ হতে পারে না। যে বিজয় আমাদের দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ঠিকানা, মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার, অস্তিত্বের সন্ধান তাঁর প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব আছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এদেশের প্রতি আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এদেশকে সব অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে মাথা উঁচু করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। এক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এ দেশকে সব অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে মাথা উঁচু করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহার্য করা। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যোককে দায়িত্বশীল ও কর্তব্য পালনে তৎপর হতে শেখা উচিৎ। কারণ একজন ব্যক্তি আমি-র দায়িত্বহীনতা কিংবা কর্তব্য অবহেলার কারণে এদেশের অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হতে পারেন তাঁরা ধনী, শিক্ষিত, অভিজাত কিংবা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। যেই হোন না কেন আপনিও সেই একই দেশের নাগরিক। আমাদের সকলের দায়িত্বশীলতা দেশ থেকে দূর করতে পারে সব অন্যায়, ঘুষ, দুর্নীতি। সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজন নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা। সেবার বিভিন্ন খাতে সেবার মানের যে অবনতি ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে সেটা সহনীয় মাত্রায় আনতে কিংবা, নির্মূল করতে প্রত্যেকের দায়িত্বশীল আচরণ করা, নৈতিকতার সাথে সাথে প্রতিটি ক্ষেত্রে সততার চর্চার নিশ্চিত করতে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। সততা থাকলে কঠিনতম কাজটিও সফলভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হবে। ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও লাভক্ষতির হিসাব না করে গণমানুষের কথা, আপামর জনসাধারণের মঙ্গলের কথা বিবেচনায় থাকলে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি অতি তুচ্ছ হয়ে যায়। ভোগ নয়, ত্যাগের মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে হবে নিজেকে এবং অনুপ্রাণিত করতে হবে অন্যদের।
ক্ষমতার লোভ, ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত না থেকে জনকল্যাণের বিষয়টি মাথায় রেখে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে দেশের কাজে। অতন্দ্র প্রহরীর মতো জাগ্রত রাখতে হবে অন্তরকে। এ চিন্তা ও চেতনায় যাতে করে একটি মানুষও আমার কথা, কাজ বা আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বরং সাধ্যমতো যত সামান্যই হোক না কেন আমাদের দ্বারা যেন মানুষ উপকৃত হয়। আমাদের এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুন্দর প্রয়াস গড়ে তুলতে সোনার বাংলাদেশ।
বিজয়ের পরে কেটে গেছে অনেক বছর। এখনও সঠিকভাবে সনাক্ত হয়নি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা ছিলেন? এতদিনেও মূল্যায়িত হয়নি তাঁদের নিঃস্বার্থ অবদান। এ দায় আমাদের সকলের, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের নয়। এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হয়ে এসব মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অবদান রেখেছেন তাদের খুঁজে বের করে তাঁদের স্বীকৃতি ও যোগ্য সম্মান দিতে হবে। তাঁদের মহান ত্যাগ মূল্যায়ন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
শুধুমাত্র তাই নয় বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির চরম শিখরে। আমাদের দেশে আছে বিশাল সম্পদ-তরুণ সমাজ। তাদের জেগে উঠতে হবে, জাগিয়ে তুলতে হবে। নতুন নতুন ভাবনায় বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিতে তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে, হাল ধরতে হবে দেশপ্রেম, দায়িত্বশীলতা, নৈতিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে।
বিপথগামী এ তরুণ সমাজকে সঠিক পথের দিশা দিতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে, যাচ্ছে। তবুও এ অগ্রযাত্রা তখনই সার্থক হবে যখন আপামর জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ অগ্রযাত্রায় সব মানুষ যখন সামিল হবে তখনই স্বার্থক হবে সব অর্জন। উৎসবে আয়োজনে যখন সবাই অংশ নেয় দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে তখনই সেটা সার্বজনীন রূপ পায়। তেমনি দেশের অগ্রযাত্রায়-সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণরাই পারে নতুন নতুন ধারণার উদ্ভাবন করতে। দেশ থেকে সব কুপমন্ডকতা ও অপসংস্কৃতির মূলোৎপাটন করতে। অন্যের সাথে তুলনা না করে আমাদের যা আছে তাকেই শ্রেষ্ঠ সম্পদ মনে করে ভালোবেসে কাজে লাগালে অনেক শ্রেষ্ঠ সম্পদের অধিকারী দেশের চেয়েও সফল হতে পারি আমরা।
সুতরাং, বিজয়ের মাসে আমাদের অঙ্গীকার হোক যা হয়নি তাকে ভুলে গিয়ে, কি নেই তা না খুঁজে যা আছে তাকেই সম্বল করে দেশপ্রেমের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দায়িত্বশীলতা, সততা, নিষ্ঠা ও নৈতিকতার সাথে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি-বাংলাদেশ হোক স্বর্গীয় আনন্দের লীলাভূমি।